লেখক পরিচিতি

বাংলা সাহিত্যের আব্দুর রউফ চৌধুরী

লিটন আব্বাস

মানবকণ্ঠ
বাংলা সাহিত্যের আব্দুর রউফ চৌধুরী - মানবকণ্ঠ

  • ০৭ মার্চ ২০২০, ১৩:২১,  আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২০, ১৩:২৮

এই দ্রোহী কথাশিল্পীর ত্রিনয়নে ধরা পড়েছে অনেক অনাবাদী সাহিত্যের জমিন, বলতে গেলে সাহিত্যের সকল শাখায় সমানে কলম চালিয়েছেন। কোনো প্রকার কল্প-কৌটিল্য, অবান্তর কিংবা অবাস্তব বিষয়ের ওপর মেদী সাহিত্য তিনি রচনা করেননি। দূর প্রবাসে বসেও স্বভূমির মানুষ তার রাজনীতি, অর্থনীতি, অভাব, যন্ত্রণাক্লেশ জীবন, অন্যায়-অনাচার-অস্বচ্ছতা এবং সব বৈষম্যের বায়বীয় সমস্যার উৎস থেকে টেনে বের করেছেন শব্দশিল্পের অবারিত সুশাসনে। কোনো প্রকার আপস না ব্যক্তিজীবনে, না কলমজীবন করেছেন। সমকালে অনেকটাই আড়ালে থেকে কালচেতনার গভীর দায়িত্ববোধের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে গেছেন এই অমর কথাশিল্পী যাঁকে নিয়ে জনপ্রিয় সময়কে বলতে গেলে আলোচনা করতে দেখা যায় না।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আব্দুর রউফ চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯৬) আধুনিকোত্তর বাংলা সাহিত্যের দ্রোহী কথাসাহিত্যিক। তিনি সনিষ্ঠায় ও মনস্বিতায় অতুলনীয়, তাঁর সাহিত্য চর্চা ও পাঠের মধ্য দিয়ে একজন বাঙালি ক্রমাগত চেতনা ও মননে জাগরিত হয়ে উঠতে পারে। বস্তুত তিনি ছিলেন বাংলা-সাহিত্য জগতে দ্রোহী কথাসাহিত্যের নির্মিতি ও মর্মাংশে এক শুদ্ধ আধুনিকোত্তরক। যুগাত্মক জটিল চেতনাপ্রবাহী আঙ্গিকে তিনি ছিলেন চূড়াবিহারী এবং বিয়ষ-বস্তু-ঘটনাও অতিশয় কালচৈতন্যবাহী ও বিস্ময়সূচক অথচ অনন্য সাধারণ, স্বতন্ত্র সৃজনশীলতায় ঋদ্ধ এই দ্রোহী কথাশিল্পী কেন যেন বাংলাদেশের সাহিত্য আলোচনায় অতিঅল্প উচ্চারিত, ক্ষীণ তোলপাড় তোলা আর তাঁর অবিনাশী সাহিত্য সম্ভারও কম পঠিত। সম্ভবত এই সময়কালের চতুর্দিকব্যাপী যে অবক্ষয় এই তার প্রমাণ।

তাই তাঁর সৃজনশীলতা, শিল্পশৈলী ও কালচেতনার প্রতি ঐকান্তিকতা এবং অভিনিবেশ গড়ে তোলার জন্য ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পৌঁছে দেবো তোমারই দ্রোহী শব্দাবলি’র অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে ২০১৮ সালে দেওয়ান আতিকুর রহমানের প্রচ্ছদে ছয়শত আটচল্লিশ পৃষ্ঠার বৃহৎ কলেবরে ‘আব্দুর রউফ চৌধুরী/রচনাসমগ্র’ প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। এতে পাঠকমাত্রই উজ্জীবিত ও আরো অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠবেন এমনটাই প্রত্যাশা করেন প্রকাশক। শুধু তাই নয়, সত্যিকার অর্থে পাঠকও পাঠ করবার মতো পাবে এক ওজস্বল গ্রন্থ। গ্রন্থে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ৪৬৪ পাতা অর্থাৎ ২৯ ফর্মার অখণ্ড বৃহৎ উপন্যাস ‘নতুন দিগন্ত’ এবং ‘৭১-এর কবিতা ও কবিতাগুচ্ছও’ স্থান পেয়েছে।

মাটির তিলক-রেখাকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তি বলে গণ্য করব এবং মাটির খুব কাছাকাছি থাকার বাসনায় তৃতীয়বারের মতো বাসা বাঁধব এখানেই।...। [নাসিমের স্বগতোক্তি, উপন্যাস : নতুন দিগন্ত]

তিনটি খণ্ডে বিভক্ত নতুন দিগন্ত উপন্যাসে অনেক চরিত্রের মধ্যে নায়ক চরিত্র নাসিম তার মূল লক্ষ্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাকে কেন্দ্র করে যে আখ্যান মঞ্জুরিত হয়ে উঠেছে, সেখানে জুলফি আলি ভুট্টোও একটি প্রধান চরিত্র। আপাত প্রতিনায়ক নাসিমই এখানে নায়ক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ কাহিনীর মধ্যে একটি জাতির জাগরণের পরোক্ষ ইতিহাস মুদ্রিত হয়েছে আবার তারই সঙ্গে আছে ব্যক্তির অন্তর্গত অজস্র টানাপোড়েন। ভুট্টোর ব্যাভিচার পরিষ্কার রূপায়িত যেমন, তেমনি দ্বিতীয় খণ্ডের অনেকখানি ব্যয়িত হয়েছে ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদার সঙ্গে নাসিমের সম্পর্কের বর্তমান ও অতীত চারণায়। ভুট্টো ও নাসিম, দুজনরেই রাজনৈতিক জীবনকে-যে ব্যক্তিজীবন অনেকখানি প্রভাবিত করেছে, তা দেখিয়েছেন লেখক। প্রধান দুটো চরিত্র নাসিমও ও ভুট্টো, এ ছাড়াও, অনেক চরিত্র: আন্নী, বেনফরত, নূর মোহম্মদ, আব্দুল্লা খুরো, ফারুক, পারভেজ, যতীন চক্রবর্ত্তী, মতিন, অন্তার, জমাদারনি, লাল-ফিতেওয়ালিনী, মায়া, নাসিমা, আফরোজা, মখসুদ, নাহিদা, সালেহা, সুরাইয়া, মিস মরিয়ম, নজর মোহাম্মদ খান, আকরাম, খোদেজা, নবাবজাদা, খুরশেদ আহমেদ পাতৌদি, হেদায়েতুল্লা, মালতী, সাজেদা বেগম, গাফফার, খলকু খান, জামসেদ, আসলাম, রোকসানা, আজমান আলি, হায়দার জংগ, সুরতজান, নীলুফা, সারওয়ার, খসরু খান, নিয়ামতুল্লা, আইয়ুব খান, খোদাদাদ খান, ভিকারুননেসা, বিলকিস আহমদ, নাদিম শাহ প্রমুখ। প্রধান-অপ্রধান এই চরিত্রগুলো জীবনতরঙ্গে উৎক্ষিপ্ত যেন। এই চরিত্রগুলো আবার সমাজের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। চরিত্র নির্মাণে লেখকের প্রধান একটি হাতিয়ার সংলাপ। করাচির মুখ্য পটভূমিতে যে উপন্যাস, স্বাভাবিকভাবেই তার সংলাপের ভাষা হতে পারে উর্দু। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত উপন্যাসে তো এ ভাষা অবিকল ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

উপন্যাসে বাঙালি নাসিমের প্রবেশের পরে প্রথমেই প্রসঙ্গটা এসেছে, লাহোরের অদূরে ওয়াগারের সীমান্তরক্ষী পাকিস্তানি এক সেপাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নাসিমের। সেপাই নাসিমকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুছি কোন হু?’ জবাবে নাসিম বলল, ‘মে পাকিস্তানি হ্যায়।’

এই নাসিম ক্রমে উর্দুভাষা অনেকখানি আয়ত্ত করে। লেখক সংলাপের প্রয়োজনে উর্দু প্রয়োগ করেছেন। প্রথম দুটি খণ্ডই নানা জটিলতা ও নাটকীয়তায় ভরপুর। পুরো উপন্যাসের মূল সুর দেশ ও জাতির সাধারণ সমাজকে ঘিরে, বিশেষ করে যুবশক্তিকে বিভ্রান্ত ও বিপদাপন্ন পথ থেকে উদ্ধার করতে হবে, তাদের রক্ষা করতে হবে আর তাদের রক্ষা করতে হলে অসুন্দর, অসত্যের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে বিপ্লবের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বস্তুত উপন্যাসের নায়ক নাসিমের সমগ্র চিন্তা ও প্রতিজ্ঞার সারোৎসার প্রতিভাত হয়েছে নানা অনুচ্ছেদে। উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ যেমন লেখকের দেশজতা-ইতিহাসচেতনাকে উদ্ভাসিত করে, তেমনি বর্ণনার মধ্যে এ রকম কথা ছড়িয়ে দেয়ার মধ্যে লেখকের উদ্দেশ্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’-এর ভূমিকায় আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন: ২০০৩ সালে যখন ‘পাঠক সমাবেশে’র বিজু সাহেব আমাকে ‘পরদেশে পরবাসী’ (পাঠক সমাবেশ সংস্করণ, ২০০৩) বই-এর প্রেসকপি হাতের দিলেন, তখন আমার মনে এই প্রশ্নই প্রথম জেগে উঠেছিল। এই ব্যাপ্তি উপন্যাসটির পৃষ্ঠা সংখ্যার চেয়ে বেশি। সুনিবদ্ধ কাহিনী, অগণন চরিত্র, উজ্জীবিত সংলাপ, স্বগত সংলাপ, স্মৃতি, ইতিহাস, বিশ্লেষণ, বর্ণনা, সবকিছু ছাপিয়ে যায় লেখকের জীবনবেদ। বিশাল পৃষ্ঠাবহরে তিন খণ্ডের বৃহৎ উপন্যাস ‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’র সঙ্গে তিনফর্মায় ’৭১-এর কবিতা ও কবিতা গুচ্ছ’ও ঠাঁই পেয়েছে। তাঁর কবিতায় ব্যাপৃত মুক্তিযুদ্ধ।

ভারতবর্ষ বিভাজনের পরবর্তী সময় প্রবাহে বাংলাদেশের সচেতন কবি-সাহিত্যিকরা দ্বিধান্বিত হলেও তিনি ছিলেন পাকিস্তানবাদী জীবনভাবনা ও মূল্যবোধের বিপরীতে; পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন তিনি সর্বক্ষেত্রে। তাঁর বিশাল সৃষ্টিজগতে (গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যাঙ্গনে) পাকিস্তানের প্রতি বিক্ষোভের অভিব্যক্তি। ষোলোআনা তাঁর জীবন ও ভাবনাজুড়ে ছিল বাঙালি মূল্যবোধ। তাঁর কবিতায় সবচেয়ে বড় বিষয়, তিনি দেশকে, দেশের আত্মাকে ভালোবেসেছিলেন। এসব কবিতায় আছে বারুদের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, রক্তের গন্ধ আর মুক্তির গন্ধ।
বাংলায় জানু পেতে বসেছে পাক-শয়তান এবার
অস্ত্রাঘাতে ধ্বংস করে দিতে চায় নিখিল-অখিল বঙ্গ
স্বচ্ছ যৌবনধারী বাঙালি কী শূন্য হাতে নিশ্চুপে
আঙুল চুষবে, সেই ক্ষয়স্বপ্নে থাক তোরা বিভোর
[’-থাক তোরা বিভোর]

এই শিল্পীর প্রথম প্রকাশিত (পত্রিকা ও সাময়িকীতে) একসঙ্গে রচনা প্রবন্ধ ও কবিতা। তিনি ক্রমে আধুনিকোত্তর বা সমকালীন বাংলা সাহিত্যের দ্রোহী কথাসাহিত্যিক হিসেবে স্বধর্মে স্থিত হন। বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় তিনি জ্যোতিষ্কের মতো বিচরণ করেন। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষণা, সম্পাদনা-বাংলা সাহিত্যের যে শাখাতেই হাত দিয়েছেন, ফলেছে সেখানে স্বর্ণফসল। তাঁর সাহিত্যজীবনে ত্রিশের চেয়ে বেশি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। পাণ্ডুলিপি-পত্র-পত্রিকা-সাময়িকীতে এখনো ছড়িয়ে আছে তাঁর অগ্রন্থিত অনেক রচনা। শত প্রতিকূলতা, আর্থিক বিপর্যয়, চাকরিগত অনিশ্চয়তা এবং বৈরী পরিবেশ-প্রতিবেশ অতিক্রম করে আধুনিকোত্তর বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারায় তিনি এক জ্যোতির্ময় প্রতিষ্ঠান।

সব অসত্য, অন্যায়, অবিচার দূর করতে চেয়েছে বলেই রউফ চৌধুরী আজ দ্রোহী এবং তাঁর এ দ্রোহ অনন্যমাত্রায় পৌঁছে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। রউফ চৌধুরীর সাহিত্যভাবনা, চেতনাপ্রবাহ ও জীবনদর্শন আর চিত্রকল্প-উপমা-রূপক-প্রতীক নির্মাণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা-ক্ষোভ-অবিশ্বাস-অস্থিরতায় বন্দি জীবনের স্রোত প্রকাশিত। তাই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলাফল হয়ে ওঠেনি, তা রূপান্তরিত হয়েছে বাঙালির জাতীয় জীবন ও মানসপটভূমির সমগ্রতায়। এটি পরিণত হয়েছে জাগৃতি, নির্মাণ এবং সৃজনকল্পনার রক্তিম ও সুদূরপ্রসারী সূচনাভূমিতে, এই তত্ত্ব যুগপৎভাবে একজন রউফকে শিল্পী ও শ্রমিকের সমান্তর মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। এই গুণী ও মহৎ মানুষের সৃজনকর্ম সম্পর্কে যত কম অপঠিত থাকবে ততই অমঙ্গল সাহিত্যের জন্য।

মানবকণ্ঠ/জেএস



poisha bazar