সমকালকে সুফলা সময় হিসেবে দেখছি : মোহাম্মদ জসিম

মানবকণ্ঠ
'তামাশামণ্ডপ'র লেখক মোহাম্মদ জসিম - ছবি : সংগৃহীত।

poisha bazar

  • হাসনাত কাদীর
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:২৩,  আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:৫৮

সমকালের শক্তিমান তরুণ লেখক মোহাম্মদ জসিম। তাঁর স্বতন্ত্র চিন্তা ও দর্শন ইতোমধ্যে পাঠকসমাজে তাকে আলাদা আসন দিয়েছে। 'তামাশামণ্ডপ'র এই লেখক কথা বলেছেন মানবকণ্ঠের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসনাত কাদীর

লেখালেখি শুরুর গল্প শুনতে চাই।

মোহাম্মদ জসিম : জীবনে প্রথম যে গল্পের বই পড়ি তার নাম ছিল 'আজব দেশের রূপকথা'। গল্পগুলো আমার শিশুমনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সম্ভবত তাখনই মনে মনে সাহিত্যের প্রতি একটি প্রগাঢ় টান তৈরি হয়েছিলো। যদিও আমার বাড়িতে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ ছিল না। পড়তে পড়তেই একসময় লিখতে বসেছিলাম, তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র। তখন শুধুমাত্র ছড়াই লিখতাম। এবং সেই সময়েই একে একে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের দিকপাল লেখকদের লেখার সাথে পরিচয়।

প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে, রহস্যপত্রিকার মার্চ সংখ্যায়। সিরিয়াসলি সাহিত্যে প্রবেশ করা ২০০৬ সালে, জাতীয় কবিতা পরিষদ বরিশাল শাখার সাহিত্য পত্রিকা 'কবি ও কবিতা'র মাধ্যমে। কবি হেনরী স্বপন সম্পাদিত দৈনিক পরিবর্তনের সাহিত্য পাতায় নিয়মিত লেখার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় একটু আধটু পরিচিতি। এই তো... তারপর থেকে একে একে অসংখ্য লিটলম্যাগ, দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন ম্যাগে লিখেছি।

এবার বইমেলায় আপনার প্রকাশিত বই।

মোহাম্মদ জসিম : এবছর পরিবার পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে অণুগল্পের বই 'তামাশামণ্ডপ'। আর ঘোড়াউত্রা প্রকাশনী থেকে দেড় ফর্মার নীরিক্ষাধর্মী কবিতার বই 'কোলাহল চিহ্নিত' আসছে।

শিল্পের মধ্যে জীবন থাকে, জীবনের অভিজ্ঞতা থাকে- আপনার কী রকম?

মোহাম্মদ জসিম : শিল্প তো জীবনকে আশ্রয় করেই বেড়ে ওঠে, তাই না? জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, যাপনাভিজ্ঞতা শিল্পীর বোধের জগতে আলোড়ন তোলে বলেই তিনি নিজের এবং অন্যদের কথাগুলো বলার প্রয়াস পান। শিল্প যেখানে সময় ও সমাজের দর্পণ, সেখানে মানুষই মুখ্য, মানুষের জীবনই প্রধান বীজতলা।
আমার ক্ষেত্রেও তাই। চারদিকে যা শুনছি যা দেখছি তারই টুকরো-টাকরা তুলে এনে শিল্পের প্রসাধনে রাঙিয়ে পাঠকের সামনে হাজির করছি। ব্যক্তিগত দুঃখ-শোক, আনন্দের সাথে সাথে পরিপার্শ্বের অন্যান্যদের অভিজ্ঞতা থেকেই আমার শিল্পবোধ জারিত হচ্ছে।

কেন লেখেন?

মোহাম্মদ জসিম : বড্ড কঠিন প্রশ্ন। সত্যি বলতে, অন্যকিছু করার যোগ্যতা নেই বলেই হয়তো লেখালেখি করি। সময় ও সমাজভাবনা, ব্যক্তিগত যাপনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া ক্লেদ ও কুসুম, এইসব প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই বোধহয় লেখালেখিতে আসা। শৈশব থেকেই একটু একলা থাকার অভ্যাস। চারদিকের হৈ চৈ থেকে নিজেকে আড়াল করে নিজের সাথে নিজের কথা বলার একটা বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই অক্ষরযাপন। এইসব লেখালেখি রাষ্ট্র কিংবা পৃথিবীকে আমূল বদলে দেবে, এমন গালভরা যুক্তি আমার নেই। তবে দায় আছে। সেই দায় থেকেই নিজেকে খুঁড়তে ভালোলাগে...

সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মোহাম্মদ জসিম : সমকালীন সাহিত্য নিয়ে অনেককেই দেখতে পাই হতাশার কথা বলছেন। ভালো কবিতা হচ্ছে না, উপন্যাস হচ্ছে না, প্রবন্ধের নামে যা তা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার এমন মনে হয় না। প্রচুর ভালো লেখা পাচ্ছি, পড়ছি। সমস্যা হচ্ছে মিডিয়াবাজ অনেক লেখক, কবি ভালো না লিখেও প্রচারের আলোয় থাকছেন, ক্রেষ্ট-পুরস্কার গলায় ঝুলিয়ে হাঁটছেন। এদেরকে পড়েই অনেকে সিদ্ধান্তে চলে আসছেন ভালো লেখা হচ্ছে না। অপরদিকে ভালো যিনি লিখছেন তার খোঁজ হয়তো নানা কারণে আমরা পাচ্ছি না। আমার তো মনে হয় গত দুই দশকে অসংখ্য ভালো লেখক এসেছেন, বিচিত্র চিন্তার সাথে ব্যতিক্রমি প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তারপর দলবাজি তো আছেই। নিজ সার্কেলের বাইরের কেউ ভালো লিখছেন, খুন কবুল তবু এটা স্বীকার করতে নারাজ। আমি আমার সমকালকে একটি সুফলা সময় হিসেবেই দেখছি।

লেখকের স্বাধীনতা বলতে আপনি কী মনে করেন?

মোহাম্মদ জসিম : একজন লেখক দুই ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করতে চান আসলে। একটা চিন্তার স্বাধীনতা, অন্যটি প্রকাশের। তো, চিন্তার স্বাধীনতাটি সব লেখকই ভোগ করে থাকেন। তার চিন্তাকে বাঁধাগ্রস্থ করার উপায় তো নেই। কিন্তু প্রকাশের স্বাধীনতাটি এখনকার সময়ে ভোগ করা একটু কঠিন বৈকি।

এই যে প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলছি, এরও নানা ডাইমেনশন রয়েছে। আপনি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু বলবেন তো প্রশাসন চোখ রাঙাবে, ধর্মীয় অন্ধত্ব গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যাবেন তো ধর্মান্ধরা তেড়ে আসবে। সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে, প্রচলিত প্রথা-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিন্তা করলে লাঠিসোটা নিয়ে হাজির হবে অনেকেই। এটা যে শুধু আমাদের দেশেই হচ্ছে তা নয়, পৃথিবীব্যাপীই হচ্ছে। তসলিমা নাসরিন, হুমায়ুন আজাদরা যেমন ভিন্ন চিন্তার জন্য সমাজের রোষানলে পড়েছেন, তেমনি সালমান রুশদীরাও পড়েছেন।

আরো পড়তে ক্লিক করুন : অভিজ্ঞতা ছাড়া শিল্প হয় না : শ্রাবণী প্রামানিক

কবিরা দুঃখের রাজপুত্র: পলিয়ার ওয়াহিদ

যারা বই পড়ে না তারা পেছনের সারির মানুষ : শামস সাইদ

লেখকের লেখার, বলার, প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য যদি সময় ও সমাজের দর্পণ হয় তাহলে লেখককে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে দিতে হবে, নইলে সময় থমকে থাকবে, সমাজে পরিবর্তন আসবে না। অথচ ভিন্ন মতাবলম্বী লেখকদের স্বাধীনতা নানাভাবে খর্ব করা হচ্ছে।

আপনার প্রিয় ৩টি বইয়ের নাম বলুন, কেন?

মোহাম্মদ জসিম : বুদ্ধদেব গুহর 'মাধুকরী'- বিশাল ক্যানভাসে অসংখ্য জীবন আর গভীর জীবনবোধের জন্য প্রিয় একটি বই। জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে'- আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনপদের জীবনধারা নিয়ে এত গভীর ও জীবন্ত চিত্রপট খুব কম লেখকের লেখায় মেলে। তাছাড়া আমার দাদা ছিলেন একজন পুঁথিপড়ুয়া, এজন্যও এই উপন্যাসটির প্রতি আলাদা টান অনুভব করি। ফজল হাসান অনুদিত 'গুলজারের নির্বাচিত ছোটগল্প'- অসাধারণ প্রতিটি গল্পের জন্য এই বইটি আমার ভীষণ প্রিয়।

পৃথিবীর বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ভাষা বাংলা। অথচ এ ভাষার অনেক শক্তিমান লেখকই অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারেন না। কেন?

মোহাম্মদ জসিম : এই বিষয়টি আমাকেও খুব ভাবায়। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে ২০ লাখ মানুষও কি বই পড়ে না? অথবা সংখ্যাটি যদি আরো কমিয়ে আনি! অথচ দেখুন একজন লেখকের বই ছাপতে হচ্ছে ৩০০ বা ৪০০ কপি, তাও সব বিক্রি হচ্ছে না। কারো কারো যদিও হাজার-দু'হাজার বইও চলছে। এমন লেখকের সংখ্যা খুবই কম। পৃথিবীর বৃহত্তম ভাষার একজন লেখকের এই অবস্থা অভাবনীয়। তাহলে আমরা কি পাঠকের মন-মানসিকতা, মেধা ও অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে লিখতে পারছি না, নাকি প্রচারের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণ এর পিছনে দায়ী- এসব ভাবার সময় এসেছে। প্রত্যেক লেখকই যে যার মতো বইয়ের প্রচারণা চালাচ্ছেন, প্রকাশকগনও চেষ্টা করছেন বিক্রি বাড়াতে। বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় তরুণ লেখকদের। নিজের টাকায় বই করতে হয় বেশিরভাগ তরুণ লেখককে। ওসব দিকে যাচ্ছি না, আলোচনা দীর্ঘ হবে তাতে।

এদেশের কবি-লেখককে আগে পেটের ধান্ধা করতে হয়, তারপর অবসরে লেখালেখি। লেখাকে প্রফেশন হিসেবে নেয়ার সুযোগ এদেশে নেই। বেশিরভাগ দৈনিক এবং অনলাইন পত্রিকা লেখকসম্মানী দেয় না। ছোটকাগজ নিজেই চলে কর্যের টাকায়, সম্মানী দেয়ার সামর্থ নেই তাদের। বরং লেখক কপিটি কিনে নেয়াটা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত। যেখানে বেশিরভাগ প্রকাশক লেখকের বই বেচে খরচ তুলতে হিমশিম খান, পত্রিকাওয়ালারা পয়সা দেন না... সেখানে লেখালেখি শুধুই অর্থমূল্যহীন সম্মানের বিষয় ছাড়া কিছু নয়। এদেশের শক্তিমান এবং খ্যাতিমান লেখককেও পেট চালাতে নির্ভর করতে হয় অন্য কোনো পেশার ওপর। লেখালেখি একটি পার্ট টাইম জব। তাই আর্থিক দৈন্যতা নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে ছায়ার মতো লেখককে সঙ্গ দিচ্ছে।

আর বৃহত্তম ভাষা হলে কি হবে! বিশ্বমানের অনেক লেখা আমাদের থাকা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের কাছে পৌছুতে পারছি না, অনুবাদ না হওয়ার কারণে। বিশ্বসাহিত্যে আমাদের কন্ট্রিবিউশনের মাত্রাটি অত্যন্ত নিচের দিকেই মনে হয়।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ জসিম : আপনাকেও আন্তিরক ধন্যবাদ।

(সাক্ষাৎকারটি ফেসবুক ইনবক্সে নেয়া। সকল প্রশ্নের উত্তর লেখকের লিখিতভাবে দেয়া।)

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...