গল্প

ভোরজাগা পাখি

অরুণ কুমার বিশ্বাস

মানবকণ্ঠ
ভোরজাগা পাখি - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:১৮

নিত্য খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে যান রফিক সাহেব। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট তখন ফাঁকা, ভিড়ভাট্টা একদম নেই। নরম কেডস পায়ে হাঁটতে ভালোই লাগে তার। একটু পা চালিয়ে জোরকদমে হাঁটলে বুকে ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাপটা মারে, কপাল ভালো থাকলে দু’এক টুকরো পাখির ডাকও শোনা যায়।

আজ অবশ্য একটু বেশিই আগে বেরিয়ে পড়েছেন রফিক। বয়স হয়েছে তো, তাই ঘড়ির কাঁটা ঠিক ঠাহর হয়নি। পাঁচটাকেই ছ’টা মনে করে জুতোপায়ে বেরিয়ে এসেছেন। পুরো তাজমহল রোড এক চক্কর মেরে হাঁপিয়ে ওঠেন ষাটোর্ধ্ব রফিক। নির্জন রাস্তায় ছেলেটাকে দেখে থমকে দাঁড়ান তিনি। এতটুকু ছেলে কী যেন মাথায় করে যাচ্ছে!

এখনও তো ওর ঘুমোবার কথা, তারপর ঘুম ভাঙলে নাশতা খেয়ে বইপত্র নিয়ে স্কুলে যাবে। কিন্তু তার বদলে শীতের সকালে পাতলা হাফশার্ট গায়ে মোট বইছে! বুকের বাঁ দিকটাতে সহসাই খানিক চাপবোধ করেন রফিক সাহেব। কী মায়াবী দেখতে ছেলেটা!

আরেকটু কাছে এলে রফিক দেখতে পান ওর মাথায় পাহাড় সমান খবরের কাগজ। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ও ভোরজাগা পাখি। খবর-বালক। সাত-সকালে ওর পৌঁছে দেয়া পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে সায়েবরা কফি খেতে খেতে হয়তো বলবেন, হুম! দেশটা রসাতলে গেল। একটাও পজিটিভ নিউজ নেই!
কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়লেন সদ্য অবসরে যাওয়া ছাপোষা মানুষ রফিকুল ইসলাম। মিষ্টি করে শুধালেন, তোমার নাম কী বলো তো! সাতসকালে এত এত পত্রিকা কোত্থেকে আনলে!

আমি রাতুল। নিত্য খবরের কাগজ বয়ে নিয়ে এখানে আসি। মালিক পত্রিকা বাছাই করে নানান জায়গায় পাঠায়। সকাল ৮টা বাজলে আমার কাজ শেষ। দুই ঘণ্টা কাজ করে আমি ত্রিশ টাকা পাই।

টাকা দিয়ে কী করবে শুনি?

মায়ের ওষুধ, আর ভাইয়ার স্কুলের বেতন। রাতুল বলল। ওর কথায় কোনো জড়তা বা আপসোস নেই। যেন এই বেশ আছে মাত্র ত্রিশ টাকার বদলে খাবরের কাগজের মোট বয়ে। মা ও ভাইয়ের জন্য সকালের আয়েশি ঘুমটুকু ছেড়ে দিতে কোনো কষ্ট হয় না ওর।

কী জানি কী ভেবে হঠাৎ একটা বোকার মতো প্রশ্ন করে বসলেন রফিক। গলার মাফলারটা কানেমুখে ভালোমতো জড়িয়ে নিয়ে বললেন, আচ্ছা রাতুল, পাতলা ফিনফিনে হাফশার্ট পরে আছো। শীত লাগে না তোমার। এতগুলো কাগজ বয়ে নিয়ে এসেছো, কষ্ট হয় না!

হয় তো! কাগজের মোট নিয়ে রাস্তায় নামলে তখন আর শীত লাগে না। জোরে হাঁটলে গরম লাগে। আর কষ্ট হলে মা-ভাইয়ের কথা মনে করি। ব্যস, শীত কোথায় পালিয়ে যায়! রাতুলের ঠোঁটে কাশফুলের মতো নিষ্পাপ হাসি।

ওর হাসি দেখে রফিক সাহেবও হাসেন। কোনো কারণ ছাড়াই। ছাত্রজীবন থেকেই মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে ভাববার সেই ভালমানুষিটুকু এখনও তিনি জিইয়ে রেখেছেন। রাতুলকে দেখে কেন জানি চোখের কোলটা একটু ভিজে উঠল। অথচ তার এখন ধুমসে হাঁটার কথা। অন্তত মিনিট পঞ্চাশেক না হাঁটলে সুগার কমবে না। বাসায় ফিরলে ছেলে-ছেলের বউ তিরস্কার করবে। বৃদ্ধ বাবাকে ওষুধ কিনে খাওয়ানোর মতো সঙ্গতি নাকি ওদের নেই। তাই কম খেয়ে রোজ জোরপায়ে হাঁটো। হেঁটে ওষুধের ওপর চাপ কমাও।

রাতুল মনমরা বৃদ্ধ লোকটিকে দেখে বলল, দাদু, নিন না একটা পেপার। পড়ে দেখেন, কতো কী খবর আছে! দেশে নাকি গরিব মানুষ আর নাই। গরিবি হাল এখন কেবল জাদুঘরে খুঁজলে পাওয়া যায়। দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। এই দেখেন, ছবিতে কত মানুষ রঙ-বেরঙের পোশাক পরে হাসছে!
কিন্তু তুমি তো এখানে নেই রাতুল! আমিও না। পত্রিকার ছবি দেখিয়ে খুক খুক করে কেশে বললেন বয়সের ভারে নুইয়েপড়া রফিকুল ইসলাম। তাকে দেখতে তখন বড্ড অসহায় লাগে।

তা নেই, তবু দেশের মানুষ তো ভালো আছে। রাতুল হাসে। ওর হাসিটা খুব চেনা চেনা লাগে রফিকের। বয়স হয়েছে তো, তাই চট করে মনে করতে পারেন না।

তুমি পত্রিকা পড়তে পার? তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না? আবারও বেকুবের মতো প্রশ্ন। প্রশ্নটা করেই নিজের বোকামো বুঝতে পারেন রফিকুল ইসলাম। ততক্ষণে তীর ছুটে বেরিয়ে গেছে। জবাব দিয়ে ফেলেছে রাতুল।

রাতুল বলল, ইচ্ছা তো করেই। তিন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছি। তারপর বাপটা আমাদের ফেলে কোথায় পালিয়ে গেল, আর আমরা বছিলার বস্তিতে মার সঙ্গে পড়ে রইলাম। আমি পড়ি না বলেই ছোটভাই পড়তে পারছে। কেউ না কেউ তো বাদ যাবেই, তাই না দাদু!

কথাটা খুব মনে ধরল রফিকের। কেউ কেউ বাদ পড়ে যায়, ‘নাই’ হয়ে যায়। একটা সংসারের সবাই কি আর সমান দরকারি! এই যেমন তিনি নিজে- পরিবারের কেউ আর খুব কদর করে না তাকে। অথচ এক সময় তিনি সংসারের জোয়াল কাঁধে ছুটতেন। কিন্তু এখন বাদের খাতায়। ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’।

আজ আর হাঁটতে ভালো লাগছে না রফিক সাহেবের। রাতুল পত্রিকা ভাঁজ করছে, তিনি দাঁড়িয়ে দেখছেন। মাত্র ত্রিশ টাকার সুখ সে ছড়িয়ে দেয় মা আর ভাইয়ের মাঝে। নিজে খবর পড়ে না, খুব যে বোঝে তাও নয়। অথচ ছোট্ট ছেলেটি কত মানুষের চায়ের কাপে নিত্য ঝড় তোলার সুযোগ করে দেয়।
সময় গড়ায়, এবার যেতে হবে। বেশি দেরি করলে নাশতার টেবিল তো তার জন্য অপেক্ষা করবে না। তিনি বললেন, আচ্ছা রাতুল, কত দিন তুমি এমন খবরের কাগজ বইবে?

রাতুল কিছু বলে না। মানে উত্তর জানা নেই ওর। শুধু ফেকাসে হাসলো। মেদুর কিন্তু অমলিন আর নিষ্পাপ। হাসিটা বড্ড পরিচিত তার। আদরের নাতি অবনি। রাতুলের মতোই বয়স। বা একটু বেশি। দু’জনের চেহারা ও হাসিতে ভীষণ মিল। এমন হয় কখনও!

পকেট হাতড়ে দশ টাকার একটা নোট বের করলেন রফিকুল। অনেক দিন ধরে নোটটা পকেটে কেতরে পড়ে আছে। টাকাটা তার স্ত্রী রেহানা দিয়েছেন। হাঁটতে হাঁটতে যদি কখনও মাথা ঘোরে, তখন যেন জলদি কিছু চিনি কিনে খান। নইলে রক্তে চিনি কমে গিয়ে ক্ষতি হয়ে যাবে।

নাও রাতুল, টাকাটা রাখো।

কেন, আপনি আমাকে টাকা দিচ্ছেন যে? এটা আমার পাওনা নয়।

ভেবে নাও তুমি আমার নাতি। তোমার মতো আমার একজন বন্ধু আছে। অবনি। তুমি যেমন হাসো, অবনিও খুশি হলে এভাবেই হাসে। গালে টোল ফেলে। খুব ভালো লাগে আমার।

রফিকুলের কথা শুনে খুব খুশি হয় রাতুল। কিন্তু টাকাটা সে নেয় না। কারণ এটা ওর পাওয়া নয়। তিনি কষ্ট পাবেন তাই সে বলল, আপনি বরং আমাকে একটা ছড়ার বই কিনে দিয়েন। আজ নয়, আবার যদি দেখা হয়, তখন।

দশটাকা এমন কিছু নয়। আবার অনেক কিছু। রাতুলের কথা শুনে রফিকুলের চোখে জল আসে। এখন তিনি বড্ড অদরকারি। কেউ আর তার কাছে কিছু চায় না। রাতুল চাইলো। মানে তিনি এখনো ফুরিয়ে যাননি। অন্তত এই রাতজাগা পাখির কাছে তার কিছু দাম আছে।

রফিক ঠিক করলেন, আরো দুটো টাকা জমিয়ে রাতুলের জন্য তিনি একটা ছড়ার বই কিনবেন। ছবি আর ছড়া, মজার মজার পড়া! আহা, খবরের বোঝা নিয়ে ভোরজাগা পাখি!

মানবকণ্ঠ/জেএস





ads






Loading...