• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
  • ই-পেপার

অভিজ্ঞতা ছাড়া শিল্প হয় না : শ্রাবণী প্রামানিক

মানবকণ্ঠ
জলজীবন ও শ্রাবণী প্রামানিক - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • হাসনাত কাদীর
  • ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:২১,  আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৩৪

শ্রাবণী প্রামানিকের কলম ক্ষুরধার। মন আর মস্তিষ্কের মিশেলে তাঁর সাহিত্য পায় অনন্যতা। ইতোমধ্যে তিনি জয় করেছেন পাঠক হৃদয়। জলজীবন-এর এ লেখক কথা বলেছেন মানবকণ্ঠের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হাসনাত কাদীর

লেখালেখির শুরু কীভাবে? 

শ্রাবণী প্রামানিক : লেখার আগে পড়ার শুরু। হাতের কাছে যা পেয়েছি তা-ই পড়েছি। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে সুকুমার সমগ্র, ঠাকুমার ঝুলি, ছোটদের রামায়ন, মহাভারত বাবা কিনে দিয়েছিলেন। তারপর ক্লাস থ্রি'তে পাই ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী এবং কন্যাকে পিতার চিঠি। এ দুটোও বাবার কিনে দেওয়া ছিল। এই বই দুটো আমি যে কতবার পড়েছি সেটা হিসাবহীন। বই পড়ার নেশা আমার তখন থেকে। আমাদের বাড়িতে পুরানো বড় বড় ট্রাঙ্ক ছিল পুরানো বইয়ে ঠাসা। সেখানে আমার দাদুর মেডিকেল কলেজের বই যেমন ছিল তেমন হোমিওপ্যাথি বা মোটা মোটা কবিরাজি বইও ছিল। সেগুলোর পৃষ্ঠা উল্টে শুধু ছবি খুঁজতাম। ছিল নিজের সই করা বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায় আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই। আমি ক্লাস ফাইভেই সেসব হাজারবার পড়েছি। আবার ঠাকুমার ভান্ডার থেকে দেব-দেবীর পাঁচালী দুপুরবেলা চুরি করে বারান্দায় বসে লুকিয়ে পড়েছি। কারণ, তিনি আমাকে সেসব ধরতে দিতেন না। আরেকটা ট্রাঙ্কে ছিলো ছোট মামার সংগ্রহের অজস্র পাক্ষিক এবং মাসিক পত্রিকা। আর উপন্যাস। আমি সেসবও পড়তাম। নেশাগ্রস্তের মতো পড়তাম। ক্লাস সিক্স- এক বান্ধবীর ব্যাগে বুদ্ধদেব গুহ'র 'বাবলি' দেখলাম। একদিনেই সেটা সাবার।

বাবার বদলির চাকরি। তার সাথে আমি, আমরাও ঘুরতাম। যেখানেই গিয়েছি আগে বইয়ের সন্ধান করেছি। কারো বাড়ির বুকশেলফ থাকলে সেটার একটা বইও আমি বাদ রাখিনি। ক্লাস সেভেনে শরৎচন্দ্র সমগ্র পড়েছি। এমনও হয়েছে বাজারে বইয়ের দোকানের মালিক/কর্মচারী আমার বই পড়ার আগ্রহ দেখে তাদের নতুন বই আমাকে পাঁচ টাকার বিনিময়ে পড়তে দিতেন। সময় দুইদিন। দুইদিন পরে আমিও ঠিক সেরকমই ফেরত দিয়ে আরেকটা নিতাম। বই না পড়লে আমার পাগল পাগল লাগত। পড়ার সাথে দেখার শুরু। দেখেছি প্রকৃতি এবং মানুষ। মানুষ দেখতে দেখতে জেনেছি, মানুষ নিজেকে অন্যের সামনে যেভাবে উপস্থাপন করে মানুষের ভেতরের মানুষটা বা তার সত্তাটা সবসময় ঠিক তেমন নয়। অমিলই রয়েছে বেশি। এখানে আমার মানুষকে প্রকৃতির মতো মনে হয়। যদি বলি, একটি গাছের যে নিজস্ব কষ্ট থাকে বা গাছও কিছু বলতে চায়; সেটা আমরা ক'জন শুনি বা শোনার চেষ্টা করি? আমি চেষ্টা করেছি বা এখনও করি মানুষ বা প্রকৃতির সেই আত্মকথন পড়তে বা বুঝতে। আমি প্রতিনিয়ত মানুষ দেখি। হা-করে দেখি। একটা সময়ে এসে নিজের মনে মনে নিজের সাথে কথা বলা শুরু হয়। এবং সেই সময়টা আমার বই পড়া কমতে থাকে। তবে তখনও সারারাত জেগে বই পড়েছি। নিজের সাথে বলা কথাগুলো আমি লিখতে শুরু করি। লিখতে শুরু করি সেই সব গল্পগুলো যা একজন মানুষ তার ভেতরে চাপা দিয়ে রাখে। 

এবার বইমেলায় আপনার প্রকাশিত বই। 

শ্রাবণী প্রামানিক : এবার আমার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের নাম 'জলজীবন'। এগারোটি ছোটগল্পে সাজানো হয়েছে জলজীবন। প্রকাশ করছে ভাষাচিত্র।

শিল্পের মধ্যে জীবন থাকে, জীবনের অভিজ্ঞতা থাকে- আপনার কী রকম? 

শ্রাবণী প্রামানিক : হ্যাঁ। শিল্প জীবন বিছিন্ন নয় বরং জীবনেরই কথা বলে। ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। দূরে কিছু ঘর-বাড়ি। সেদিকের রাস্তায় হাঁটছে কলসি কাঁখে এক যুবতী। এই হলো ক্যানভাস। নিঃসন্দেহে এই ছবিটি একটি শিল্প। এই ছবির উপজীব্য বিষয় বা চরিত্র— মানুষ, প্রকৃতি, ঘর-বাড়ি এবং নৌকা। এই সবগুলো বিষয়েই জীবন বা প্রাণ আছে। নৌকা আর ঘর জড় বস্তু? না। সেগুলোর জন্ম যেমন প্রাণ থেকে আবার এগুলো ব্যবহারও হয় প্রাণের জন্য।

আরো পড়তে ক্লিক করুন- কবিরা দুঃখের রাজপুত্র: পলিয়ার ওয়াহিদ

যারা বই পড়ে না তারা পেছনের সারির মানুষ : শামস সাইদ

ঘাটে বাঁধা নৌকার ধরণ দেখে বোঝা যায় নৌকা কখন ছাড়বে বা আদ্যোও ছাড়বে কি না! বা যুবতীর চলার গতি-ই বলে দেয় কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে কি না? এই বোঝার বোধই অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা ছাড়া সৃষ্টি বা শিল্প হয় না বা সম্ভব না। আমি লিখি মানুষের গল্পকথা। তাতে আসলে জীবনই আঁকা।

কেন লেখেন? 

শ্রাবণী প্রামানিক : কোনো এক বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মানুষ আন্দোলনের প্রয়োজন বোধ করে। আন্দোলনের মাধ্যমে তার দাবি জানায়। আমার ভেতরে যখন কোনো কারণে আন্দোলন সৃষ্টি হয়; কোনো বোধ আমাকে উজ্জীবিত করে তখন আমি সে বিষয়ে লিখি।

সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? 

শ্রাবণী প্রামানিক : আমার মনে হয়, সমকালীন সাহিত্যতে জীবন ঘনিষ্ঠতার অভাব রয়েছে। অনেকখানি শব্দ আর বাক্যের গোলকধাঁধায় আটকে আছে কি? কন্টেন্ট জীবনকে স্পর্শ না করলে হয়তো স্থানিক একটা তাপ অনুভব করা যায়, কিন্তু সামগ্রিক অর্থে ওই তাপটা ঠিক ছড়ায় না। বোধ করি, সমকালীন সাহিত্যে সারল্য প্রায় অনুপস্থিত।

লেখকের স্বাধীনতা বলতে আপনি কী মনে করেন? 

শ্রাবণী প্রামানিক : লেখকের স্বাধীনতা মূলত— লেখকের চিন্তার স্বাধীনতা। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, লেখকের চিন্তা যেন সামাজিক অবক্ষয়ের পথে ধাবিত না হয়। এবং লেখক তাঁর সুচিন্তিত মতামত প্রকাশে কোনোভাবেই সমাজ বা রাষ্ট্র দ্বারা বাধাগ্রস্ত না হয়।

আপনার প্রিয় ৩টি বইয়ের নাম বলুন, কেন? 

শ্রাবণী প্রামানিক : প্রিয় বা পছন্দের বইয়ের সংখ্যার অনেক বেশি। তারমধ্যে থেকে ৩টির নাম বলা বেশ অস্বস্তিকর। তবে কিছু বই আছে যা আমি বহুবার পাঠ করেছি। পাঠ করেছি অবশ্যপাঠ্য কোনো বইয়ের মতো গুরুত্ব দিয়ে, প্রেমপত্রের মতো যত্ন নিয়ে। সেখান থেকে ৩টি বইয়ের নাম বলছি— মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, সমরেশ মজুমদারের পার্থিব, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাছের মানুষ।

পৃথিবীর বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ভাষা বাংলা। অথচ এ ভাষার অনেক শক্তিমান লেখকই অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারেন না। কেন?

শ্রাবণী প্রামানিক : যে কনটেন্টগুলো বাংলা ভাষায় নির্মাণ হয়, তার ব্রান্ডিংয়ের বড় অভাব আছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বই নিয়ে যে প্রচারণা হয়, আমাদের দেশে তার যথেষ্ট অভাব আছে। বিখ্যাত একটি বইয়ের নাম হয়তো আমরা জানি বহু বছর পর! সেটা প্রচারণার অভাব ছাড়া আর কী? আরেকটি বিষয় প্রকট— আমাদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা কম। এবং ক্রমশ তা আরো কমছে।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।  

শ্রাবণী প্রামানিক : আপনাকেও ধন্যবাদ জানাই।

(সাক্ষাৎকারটি ফেসবুক ইনবক্সে নেয়া। সকল প্রশ্নের উত্তর লেখকের লিখিতভাবে দেয়া।)

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...