যারা বই পড়ে না তারা পেছনের সারির মানুষ : শামস সাইদ

মানবকণ্ঠ
সাহিত্যিক শামস সাইদ - ছবি : হাসনাত কাদীর।

poisha bazar

  • হাসনাত কাদীর
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৭:০৩,  আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৭:১৬

রাজনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সচেতন তরুণ কথাশিল্পী শামস সাইদ। গণমানুষের গল্পে তিনি বাংলাকে আঁকতে পারঙ্গম। মানুষের অধিকার ও কান্না-হাসি তাঁর কলমে ফুটে ওঠে গভীর মমতায়। অমর একুশে বইমেলায় তাঁর 'সেইসব সন্ধ্যা' নামে জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস এসেছে। এছাড়া কিশোরদের জন্য মেলায় তাঁর বই 'মুজিবের গল্প শোন'র প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব; কিশোর উপন্যাস 'দুষ্টু ছেলেদের কবলে ক্ষ্যাপা নিতাই', 'শুভসংঘ' ও 'ফজল মাস্টারের স্কুল' পাওয়া যাচ্ছে।

তরুণ শামস সাইদের প্রকাশিত উপন্যাস 'ধানমন্ডি ৩২ নম্বর', 'ধানমন্ডি ৩২ নম্বর গণঅভ্যুত্থান পর্ব', 'ক্রুশবিদ্ধ কলম', 'দুঃখগুলো হাওয়ায় ভাসিয়ে দিও' ইতোমধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। কিশোর উপন্যাস 'অরমার গল্প', 'কানাই দ্যা গ্রেট', 'পাঁচ পাগলের কাণ্ড', 'রেজা স্যারের চার গোয়েন্দা', 'রেজা স্যারের গোয়েন্দা স্কুল' জয় করেছে শিশুকিশোর হৃদয়। 'বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনা' ও 'ছোটদের বঙ্গবন্ধু' গ্রন্থ দুটিরও রচয়িতা তিনি।

কর্মমুখর ও তারুণ্যদীপ্ত শামস সাইদ কথা বলেছেন মানবকণ্ঠের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হাসনাত কাদীর


লেখালেখির শুরু কীভাবে?

শামস সাইদ : শুরুটা খুব আয়োজন করে হয়নি। হঠাৎ করেই মনে হলো একটা কিছু লিখব। সেই শুরু। তখন আমার মাথায় অনেক গল্প ছিল। কল্পনা ছিল আরো বেশি। শৈশব থেকেই আমি গল্প খুঁজতাম। গল্প শুনতাম। সেসব আমার ভেতরে বাসা বেঁধে গল্পের একটা জগৎ তৈরি করেছিল। কিন্তু লেখা শুরুর আগের দিনও ভাবিনি গল্প লিখব। শুরুর পরে একটা আনন্দদায়ক উত্তেজনা আমাকে আচ্ছন্ন করল। সেই থেকে গল্পের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ঘুরি।

মেলায় আপনার একাধিক বই আসছে। বইগুলো কেন পড়ব?

শামস সাইদ : চমৎকার প্রশ্ন। কেন পড়বেন? এখন মুঠোর মধ্যে পৃথিবী। বিশ্বসাহিত্যের সেরা লেখাগুলো পড়েই সময় পাওয়া দুষ্কর। তবু আমাকে না পড়ে বাঙালির উপায় নেই। কারণ, আমি বাংলায় লিখি। এই জনপদের হৃদয় খুঁড়ে আমি তাদের গল্প বলি। অতীত, ভবিষ্যৎ আর শেকড়ের আয়নায় নিজেকে দেখতে চাইলে আমাকে পড়তে হবে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মতো ঐতিহাসিক পটভূমির বিশাল কলেবরের সিরিয়াস উপন্যাস লিখেছেন। আবার একই সময়ে শিশুকিশোরদের জন্য গল্প লিখছেন।

শামস সাইদ : এটা সম্ভব হয়েছে কারণ, আমার ভেতর শিশুসুলভ সরল কিন্তু সিরিয়াস একজন মানুষ বাস করে। আমি যখন শিশুকিশোরদের জন্য লিখি তখন আমিও শিশু হয়ে যাই। ফলে তা পড়ে পাঠক আনন্দিত হন। আমার একটা কিশোর উপন্যাস ছাপা হয়েছিল কিশোর ভূবনে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার সেই উপন্যাস পড়ে মুগ্ধ হয়ে আমাকে ফোন করলেন। বললেন- 'শামস, তোমার সব লেখা আমি পড়তে চাই।' বিষয়টি একইসঙ্গে আমাকে অবাক, আনন্দিত এবং অনুপ্রাণিত করেছিল।

প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় পত্রিকায় চাকরি করতেন। হুট করে চাকরি ছেড়ে লেখালেখিতে সার্বক্ষণিক হলেন। অথচ লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

শামস সাইদ : লেখালেখি পার্টটাইম হয় না। এটা শৌখিন কোনো বিষয় না। এখানে দীর্ঘ সময়, শ্রম ও মনোযোগ দিতে হয়। অন্য একটা চাকরি করে সেটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। হ্যাঁ, পেশা হিসেবে লেখালেখি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ভালোবাসা ও আনন্দের জন্য এটুকু ঝুঁকি নেওয়া যায়। তরুণরা সে ঝুঁকি নিচ্ছেন। এবং আপনি জানেন, অনেকেই এখন ফুল টাইম লেখক হিসেবে কাজ করছেন।

পৃথিবীর বৃহত্তর জনগোষ্ঠির ভাষা বাংলা। অথচ এ ভাষার অনেক শক্তিমান লেখকই অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারেন না। কেন?

শামস সাইদ : কারণ, বাঙালি সাহিত্য চর্চায় যত উৎকৃষ্ট, ব্যবসায় তত অনভিজ্ঞ। বই লেখা এক ব্যাপার আর বিক্রি অন্য ব্যাপার। এখানে পেশাদার প্রকাশকের তীব্র সঙ্কট আছে। বইয়ের মার্কেটিং ট্র্যাডিশন গড়ে ওঠে নাই। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে নাই যারা পাঠককে ভালো বইগুলো সম্পর্কে জানাবে। পড়তে আগ্রহী করে তুলবে।

একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, বই এখনও বাংলাভাষার মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় না। চা-বিড়ি না খেলে চলে না। বই না পড়লে চলে। বই পড়ার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্কুলে দুয়েকটা প্রবন্ধ পড়ানো হয়। সেখানে অনেক নীতিকথা বিদ্যমান এবং মুখস্ত করানো হয়- যে জাতি যত বেশি বই পড়ে সে জাতি তত বেশি উন্নত। কিন্তু ৯০ ভাগের বেশি মানুষ এ কথা বিশ্বাস করেন না। তারা মনে করেন, যে জাতির কাছে যত বেশি টাকা আছে সেই জাতি তত বেশি উন্নত। খোলা চোখে দেখলে সেইটা কিন্তু ঠিক। আর বাকি যারা বই পড়েন তারা যে খুব বুঝেশুনে পড়েন তেমন না। সময় কাটান। অনেকটা ফ্যাশনও আছে। তাই বই পড়ানোর শিক্ষা নীতিশিক্ষামূলক অবস্থানেই রয়ে গেছে। কার্যক্ষেত্রে এর প্রয়োগ নেই। মানুষ এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন নাই। তাই বই পড়ার আহ্বান ব্যর্থ হয়েছে।

এত কিছুর পরেও আমি বিশ্বাস করি, বই পড়ার গুরুত্ব বুঝতে পারলে মানুষ বই কিনবে। কিন্তু কোন বইটি কিনবে? যে বই সম্পর্কে মানুষ কোনো না কোনোভাবে জানে। তাই মার্কেটিং গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের প্রোপার মার্কেটিং করতে পারলে, বই পড়া শুধু বিলাসিতা নয় তা বুঝাতে পারলে মানুষ বই কিনবে। যেহেতু তা হচ্ছে না। তাই ক্রেতা কম। ফলে বই লিখে অর্থনৈতিকভাবে আগেও লড়াই করেছেন লেখক। এখনও লড়াই করছেন। তবে শুধু লেখক লড়াই করলে অর্থনৈতিক সফলতা আসবে না। লেখক ঠিক লেখাটাও লিখতে পারবেন না।। সময় এসেছে এখন বইয়ের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে লড়াইয়ের। যারা বই পড়ে না তারা পেছনের সারির মানুষ- এই কথা সমাজের সকলকে বুঝতে হবে।

এখন কী লিখছেন? সামনে কী বই আসছে?

শামস সাইদ : 'সেইসব সন্ধ্যা' নামে জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস এসেছে। এছাড়া কিশোরদের জন্য 'মুজিবের গল্প শোন'র প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব; কিশোর উপন্যাস 'দুষ্টু ছেলেদের কবলে ক্ষ্যাপা নিতাই', 'শুভসংঘ' ও 'ফজল মাস্টারের স্কুল' পাওয়া যাচ্ছে। আমি সারা বছরই লিখি। এখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর উপন্যাসের ৩য় খন্ড লিখছি। আর একটা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস 'আমি একাত্তর দেখিনি' নিয়ে কাজ করছি। মেলার পরে 'তিন নারী' নামে একটি উপন্যাস প্রকাশ পাবে।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শামস সাইদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads