গল্প

ফা ফা ফাইজুর

মানবকণ্ঠ
অলংকরণ - নিসা মাহজাবীন।

poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১১:০১

স্কুলের সামনে মাঠ। মাঠের পরে পুকুর। পুকুরের পরে পাড়। তারপর সবুজ ধানক্ষেত। সেই পাড়ে বসে শুকনো পাতা ছেঁড়ে আবীর। পুরো টিফিন পিরিয়ড সে পাতা ছিঁড়ে জমা করে। টিফিন শেষের ঘণ্টা দিলে উঠে দাঁড়ায়। গুঁড়ো পাতা হাতের তালুতে নিয়ে ফুঁ দেয়। ছড়িয়ে পড়ে তা ধানক্ষেতে। তারপর প্যান্টে হাত মুছে ক্লাসে চলে যায়।

এই ছবিটা এখন প্রতিদিনের। আবীর গ্রামের হাইস্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। বন্ধুরা টিফিনের ঘণ্টা দিলে ছুটে মাঠে চলে যায়। তারপর কেউ কেউ ব্যাটবল নিয়ে খেলে, কেউ কেউ মোরগ লড়াই খেলে। আবীর একসময় খুব ভালো মোরগ লড়াই খেলত। খুব কৌশলী। শক্তির লড়াই এড়িয়ে চলত। কৌশলের লড়াই করত। শেষ পর্যন্ত ফার্স্ট, সেকেন্ড হতো কিন্তু এখন সে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। পাতা ছেঁড়ার খেলা খেলে।

আসলে বন্ধুদের সঙ্গে আবীরের বড় দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। তাই সে একা একা থাকে। বন্ধুরাই তাকে খেলায় নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এতে খুব কষ্ট পেয়েছিল আবীর। তবে এখন আর কষ্ট মনে হয় না। পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে সবুজ ধানক্ষেত দেখার মজাই আলাদা।

বন্ধুরা ক্লাসে অনেক দুষ্টুমি করে। এই যেমন বাদাম খেয়ে খোসাগুলো ঠোঙ্গায় ভরে মেয়েদের বেঞ্চে রেখে আসা, ব্ল্যাকবোর্ডে বাংলা স্যারের টাক মাথার ছবি আঁকা। স্যারের বেত লুকিয়ে রাখা। জঙ্গল থেকে বিছুটি পাতা এনে স্যারের চেয়ারে রেখে দেয়া। এসব দুষ্টুমি করে মুখে কুলুপ এঁটে সবাই বসে থাকত। শুধু পারত না আবীর। সে নতুন ভর্তি হয়েছে এই স্কুলে। মুখে কুলুপ আঁটে না তার। স্যার এসে জিজ্ঞেস করতেই বলে ফেলে আবীর।

-ব্ল্যাকবোর্ডে কে লিখল এটা?

-স্যার নয়ন লিখেছে।

অমনি সবাই আবীরের দিকে কটমট করে তাকায়?। স্যার চলে গেলে সবাই আবীরকে চ্যাংদোলা করে শাস্তি দেয় কিন্তু আবীর যে মিথ্যা বলতে শেখেনি। কেউ মিথ্যা বললে খুব রাগ হয় আবীরের। এভাবেই বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় আবীরের। এখন ওদের মাঝখানে একটি পুকুর। একপাশে বন্ধুরা খেলে, আরেক পাশে বসে শুকনো পাতা ছেঁড়ে আবীর।

একদিন দুপুরের ঘটনা। আবীরের মনটা কেন যেন ছটফট করছে। পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে উঠে দাঁড়ায়, আবার বসে পড়ে। সেই পুকুর পাড়ে। হঠাৎ সে ধরতে পারে ছটফটানির কারণ। মনে পড়ে যায়, তার ব্যাগে একটা বাইনোকুলার আছে। গতকালই ছোট মামা এনেছে ওটা। আজ সে দূরের গাছপালা দেখবে বলে স্কুলে এনেছে অথচ এতক্ষণ মনেই ছিল না।

এক দৌড়ে সে ক্লাসরুমে চলে যায়। গিয়ে ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে দেয় কিন্তু এ কী! বাইনোকুলার নেই তো। কে নিল! চারপাশে তাকায় আবীর। ক্লাসের এক কোণে ফাইজুর নামের এক ছেলে বসে আছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। সামনের বেঞ্চে রাখা তার ব্যাগটা বুকের সঙ্গে সেঁটে রেখেছে। দেখেই সন্দেহ হলো আবীরের।

-ফাইজুর, আমার বাইনোকুলার দেখেছো তুমি?

-না দেখিনি তো।

এইটুকু বলেই সে পড়ায় ডুবে যায়।

-তুমি তো রুমে ছিলে। আমার ব্যাগে কে হাত দিল, তোমার তো জানার কথা।

কোনো কথা না বলে বই আরো চোখের কাছে ধরে পড়তে থাকে। সন্দেহ আরো বেড়ে যায় আবীরের।

-এই যে ফাইজুর, কথা বলছ না কেন?

-আমি নেইনি।

-খোদার কসম?

-খোদার কসম।

-আর যদি মিথ্যা বলো তুমি?

-সত্যি বলছি আমি নেইনি। আমার কথা যদি মিথ্যা হয়, আমার জিভ যেন খসে পড়ে।

-ছিঃ অমন কথা বলতে হয় না।

এরমধ্যে টিফিন শেষের ঘণ্টা বেজে ওঠে। হুড়মুড় করে সবাই ক্লাসে ঢুকে পড়ে। একটু পরেই সমাজ স্যার আসেন। আবীর তার বাইনোকুলার চুরি যাওয়ার কথা স্যারকে বলে দিল। স্যার একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, এই তুমি নিয়েছো? সবাই একে একে জবাব দিল, না স্যার, আমি নেইনি।

এরপর স্যার ব্যাগ সার্চ করা শুরু করলেন। আবীর খেয়াল করল, ফাইজুর খুব অস্থির হয়ে গেছে। নড়াচড়া করছে আর ঘামছে।

চারজনের ব্যাগ খুঁজে বাইনোকুলার পাওয়া গেল না। এবার ফাইজুরের পালা। চোখে তার জল জমে গেছে। একটু পরেই কেঁদে ফেলবে। চোখের জল দেখে আবীরের মনটা হাহাকার করে উঠল। ক্লাসভর্তি ছাত্রছাত্রীদের সামনে অপমানিত হতে যাচ্ছে ফাইজুর। মানতে পারছে না আবীর। কান্না পাচ্ছে তারও। একটা মিথ্যা কথা বলে স্যারকে কি থামাবে আবীর? কিন্তু সে তো মিথ্যা বলতে পারে না।

স্যার ফাইজুরের ব্যাগে হাত দিল। আবীর কাঁপছে, ফাইজুর তো স্যারের পা ধরার জন্য ঝুঁকে গেল কিন্তু একি! তার ব্যাগে এ রকম কিছুই পেলেন না স্যার। ফাইজুরের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আবীরের চোখে বিস্ময়। অযথা সন্দেহ করেছে বলে লজ্জাও পেল সে।

এরপর একে একে সবার ব্যাগ খোঁজা হলো। পাওয়া গেল না। অবশেষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবীরের ব্যাগেই মিলল বাইনোকুলার।

স্যার চেয়ারে গিয়ে বসলেন। এরপর বললেন- ছিঃ আবীর, নিজের ব্যাগেই তোমার বাইনোকুলার রেখে বন্ধুদের অপমান করলে? এটা তোমার কাছ থেকে আশা করিনি।
স্যারের বকা খেয়ে অপমানে কেঁদে ফেলল আবীর। কিছুই তার মাথায় আসছে না। কীভাবে বাইনোকুলার তার ব্যাগে এলো?

চোখ লাল করে বাসায় ফিরল আবীর। সেদিন রাতে ঘুমুতে পারল না সে। সারা রাত এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে দিল। ভোররাতে একটু ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ শোরগোলে ঘুম ভেঙ্গে গেল আবীরের। সকালের কড়া রোদে চোখ খোলা দায়। আলতো চোখ মেলেই বুঝতে পারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাড়ির সবাই বলাবলি করছে। ওপাড়ার ফাইজুরের কথা বলা নাকি বন্ধ হয়ে গেছে।

ফাইজুর তো আবীরের বন্ধু। এক দৌড়ে ওপাড়ায় চলে যায় আবীর। গিয়ে দেখে ফাইজুরদের বাড়ির সামনে বিশাল জটলা। ভেতরে ঢুকে যায় আবীর। তাকে দেখেই এগিয়ে আসে ফাইজুর। মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না। শুধু ‘ফা ফা’ শব্দ করে ফাইজুর। আর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।

আবীর ওর হাত ধরে জিজ্ঞেস করে- কী হয়েছে বন্ধু তোমার?

- ফা ফা।

-শুধু ফা ফা করছ কেন? কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে?

এরপর ফাইজুর হা করে আবীরকে দেখায়।

আবীর দেখে, ফাইজুরের মুখে জিহ্বা নেই। ফাঁকা মুখের ভেতরে শুধু আলজিহ্বা দেখা যাচ্ছে। একটু একটু নড়ছে সেটা।

আবীরের হঠাৎ মনে পড়ে যায়, কাল বাইনোকুলারের কথা জানতে চাইলে ফাইজুর বলেছিল, সে নেয়নি। আর সে মিথ্যা বললে জিহ্বা যেন খসে পড়ে। তাহলে কি ফাইজুরই বাইনোকুলার নিয়েছিল? কিন্তু তার ব্যাগে তো ওটা পাওয়া যায়নি। তাহলে জিহ্বা কেন খসে পড়ল? আর খসে পড়েই বা তা কোথায় গেল?

ফাইজুরের মা ফাইজুরকে খেতে ডাকে। ফা ফা করতে করতে সেদিকে যায় ফাইজুর। এদিকে বাইরে হইচই বেড়ে যায়। আবীর বাইরে চলে আসে। বাড়ির পাশের একটা ড্রেনে এক টুকরো মাংস দেখে হইচই করতে থাকে লোকজন। এই তো জিভ, এই তো ফাইজুরের জিভ!

আবীর এগিয়ে গিয়ে দেখে, ঘটনা সত্য। একটা জিহ্বা পড়ে আছে। শিমুল ফুলের মতো।

আবীর খুব কাছে গিয়ে বসে পড়ে। জিহ্বার পেটে আরেক জিহ্বা বেরিয়ে আসে। ক্ষীণ কণ্ঠে কথা বলে ওঠে জিহ্বার মুখ।

-আমি ফাইজুরের জিহ্বা। একটা সত্য কথা বলি। কাল তোমার বাইনোকুলার ফাইজুর নিয়েছিল কিন্তু মিথ্যা কথা বলেছে সে।

-কিন্তু বাইনোকুলার তো তার ব্যাগে পাওয়া যায়নি।

-বিষয়টা ফাইজুরও জানে না। কীভাবে তার ব্যাগ থেকে ওটা চলে গেছে। সে এক বিরাট রহস্য।

আবীরের মাথায় এসব কিছুই ঢুকছে না। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। সবাই দৌড়ে এর ওর বাড়িতে ঢুকে পড়ে। আবীর শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।

বৃষ্টির পানিতে ড্রেন উপচে জল গড়িয়ে যায়। নতুন পানি পেয়ে পেয়ে লাফিয়ে উঠে জিহ্বা। এরপর মাছের মতো তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে ছুটে চলে ফাইজুরের জিহ্বা।

আবীর সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তার গা ভিজিয়ে ঝুম বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি যেন আর থামতেই চায় না।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads






Loading...