প্রবন্ধ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নারী চরিত্র ও চিরায়ত ভালোবাসা

কামাল আহমেদ

মানবকণ্ঠ
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নারী চরিত্র ও চিরায়ত ভালোবাসা - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২২ জানুয়ারি ২০২০, ১৩:৩৭

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম-শতকের শেষদশক ও পরবর্তী শতকের প্রথম দশকের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় তাঁর স্বচক্ষে দেখা ও উপলব্ধি করা রক্ষণশীলতা, শ্রেণিসংঘাত, ধর্মাশ্রয়ী কুপ্রথা, প্রথানুগ্যতা, পুরুষশাসিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে চিরায়ত ভালোবাসা কাতর নারী মনের বিক্ষুব্ধ ও সংঘাত সংকুল অপ্রকাশিত দ্বন্দ্বের স্বরূপ প্রকাশে সচেষ্ট শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নিরন্তর যুদ্ধ ঘোষণা কেবল নারীর মনকেই প্রলুব্ধ করেনি।

প্রথাবিরুদ্ধ, সহানুভূতিশীল ও প্রেমাশ্রয়ী হাজারো পুরুষ হৃদয়কেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। পক্ষান্তরে সেখানে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে প্রগতিশীলতাকে উস্কে দিয়েছিল। উথাল-পাথাল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের মতো সামাজিক প্রচলিত শাসনকারার ভেতকে এলোমেলো করেছিল।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই যুদ্ধ সশস্ত্র নয়; ছিল কথাসাহিত্যে। রেঙ্গুনে অবস্থানকালে এ যুদ্ধে নিজের শারীরিক ও মানসিক উপস্থিতি তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন এক মিস্ত্রির মেয়ে শান্তিদেবীকে বিয়ে করে। শান্তিদেবীর বাবা এক মদ্যপায়ী পথভ্রষ্ট বুড়োর সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলে শান্তিদেবীর এ পরিস্থিতির পরিত্রাণের বিনীত অনুরোধেই তিনি স্বেচ্ছায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্য শান্তিদেবী বেশিদিন বেঁচে থাকেননি, স্বপুত্রক প্লেগ রোগে মারা যান।

বাংলা কথাসাহিত্যে ‘অমর কথাশিল্পী’, ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’, ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ ইত্যাদি বহু উপাধিতে অভিষিক্ত ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটানা প্রায় পঁচিশ বছরের (১৯১৩-১৯৩৮) সৃষ্টি সাধনার বিশাল সম্পদ সম্ভারে তার উপন্যাসের গুরুত্ব সর্বাধিক। এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অসংখ্য অবহেলিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, নারী মনের চিরায়ত ভালোবাসায় পোড় খাওয়া, ধর্মাশ্রয়ী সামাজিক দণ্ডের আগুনে জ্বলা নারী চরিত্র। তিনি সাধারণ মেয়ের আটপৌরে রোম্যান্টিক ঠাঁসবুনা কাহিনী নির্ভর সরল ভাব বিভোর ভাষাকে পুঁজি করে নিরন্তর লিখে গেছেন প্রেমবিভোর নারীর সুখ-দুঃখের গল্প। লেখনীতে পতিতা, বিধবা, বৈষ্ণবী, সতী, অরক্ষণীয়া সে যেমনটাই হোক না কেন, শরৎচন্দ্র তন্ময় থাকতেন তাদের প্রেমের অনাস্বাদিত বিরহে ও বঞ্চনায়।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাস বা গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে অধিক লেখক, সহানুভূতি পাওয়া প্রায় সবই নারী চরিত্র।

এদের উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে, রাজলক্ষ্মী, অভয়া, অচলা, সাবিত্রী, ভারতী, বিন্দুবাসিনী, হেমাঙ্গিনী, শৈলজা, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, কাত্যায়নী, বিজলী, কিরণময়ী, সবিতা, পিয়ারী, রমা, মাধবী, হেমনলিনী, কমললতা, অন্নদা দিদি, বিরাজ, বিজয়া, ষোড়শী প্রমুখ। সংক্ষিপ্ত পরিসরে অল্প ক’টি চরিত্রের আলোচনাই সম্ভব। এসব চরিত্র অপরাপর চরিত্রের ভিড়েও নিজস্ব প্রবণতা বা ব্যক্তিস্বতন্ত্র বজায় রেখে আজো পাঠক মনে স্থায়ীভাবে আসন করে নিয়েছে। তাদের চরিত্রবৈশিষ্ট্য, অবয়ব, আদর্শিক নানাদিক, একজন প্রেমময়ী নারী হিসেবে স্ব স্ব প্রেমেরদাবী বনাম প্রথাগত, ধর্মাগত সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে তাদের অবস্থানের কিছু দিক আলোচ্য।

নারীর সতীত্ব কী পদার্থ, ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের অন্নদা দিদিকে না পড়লে অজানাই থেকে যাবে। কাহিনীতে স্বামীর প্রতি অন্নদা এতটাই একনিষ্ঠ যে খুনি ও ছদ্মবেশী স্বামীর জন্যই সে কুলত্যাগিনী হয় এবং সে কুল-কলঙ্ক বয়ে নিয়ে চলে। আর, অন্নদা দিদিকে দেখেই শ্রীকান্ত নারীর কলঙ্কে সহজে বিশ্বাস করত না। ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসে বিরাজকে স্বামীর কাছ থেকে ভয়ানক যাতনা, গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছিল। ঘটনাচক্রে বিরাজ গৃহত্যাগ করেছিল ঠিকই কিন্তু তার সতীত্বের অবমাননা করেনি। কিন্তু তাকে জীবন পণ করে সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়েছিল ঠিকই। ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে ষোড়শীকে মর্মান্তিকভাবে পরীক্ষা দিতে হয় সতীত্বের। সতীত্বের বিপরীতে বিধিবিরুদ্ধ যৌনতার ফলাফলও কিছু চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে।

‘শেষের পরিচয়’ এর সবিতা প্রথমে বিবাহ করে ব্রজবাবুকে, সবিতা এই ব্রজবাবুকে ছেড়ে বারো বছর রমণীবাবুর শয্যাসঙ্গিনী হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে যে, এই গণিকাজীবনের অবসান জরুরি। তাই বিমলবাবুর ভালোবাসায় তার এ জীবনের সমাপ্তি ঘটায়। এই নারী চরিত্রের মধ্যে আদিম যৌন প্রবৃত্তির প্রকাশ পেয়েছে; যা মানবচরিত্রে কখনো সুপ্ততা ভেঙে ঘটনার আকস্মিকতায় অবচেতনেই জেগে ওঠে। (চলবে)

মানবকণ্ঠ/জেএস

 




Loading...
ads






Loading...