• মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০
  • ই-পেপার
12 12 12 12
দিন ঘন্টা  মিনিট  সেকেন্ড 

গল্প

সেই পিশাচী

সাইফুল ইসলাম জুয়েল

মানবকণ্ঠ
সেই পিশাচী - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ২১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৩২,  আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৫৯

শেষ পর্যন্ত মাহমুদের কথাই সত্যি হলো।

স্টেশন রোড পেরিয়ে মোটামুটি মাইল খানেক আসার পরেই গাড়িটা ঘ্রত ঘ্রত করে কতক্ষণ কেঁপে-টেপে গেল থেমে। স্টেশন পাড় হয়ে কিছুটা পরেই গাড়ির চাকার নিচে যে কিছু একটা পড়েছিল, তা অবশ্য টের পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন গুরুত্ব দিইনি। মাহমুদ বলেছিল, অন্যদের ক্ষেত্রেও নাকি তেমনটাই ঘটে। কিন্তু তা কারোর পক্ষেই সন্দেহ করার মতো কিচ্ছু নয়। তারা নির্ভাবনায় সম্মুখপানে গাড়ি চালিয়ে যান। স্টেশনের কাছাকাছি সিএনজি স্টেশন হতে গাড়িতে তেল ভরা হয়। পেটে দানাপানির টান পড়লে তাও মিটানো যায় স্টেশনের দু’পাশের দোকান-পাট থেকেই। তারপর ড্রাইভার নির্ভাবনায় চলতে থাকেন পথ।

কিন্তু তার মধ্য থেকেই কিছু গাড়িকে এই ঘটমটে রোগে ধরে। নির্জন-সুনশান পথে এসে বিগড়ে যায় সেটি। কোনো কথা না শুনে সটান থেমে যায়। এখানকার পরিবেশটাও বেশ বিদঘুটে। কেমন যেন ভয়াল ভয়াল। মনে হয়, কেউ বুঝি হঠাৎই ভূতুড়ে রাজ্যে ঢুকে পড়েছে!

আমার ক্ষেত্রেও ঘটনা তেমনটাই ঘটলো। গাড়ি থামার পর ভয়ার্ত চোখে-মুখে চারিদিকে তাকালাম। কিচ্ছুটি নেই। নিকশ কালো অন্ধকার গ্রাস করে রেখেছে জায়গাটাকে। কেবল কিছু অদ্ভুতুড়ে শব্দ ভেসে আসছে কানেÑ বুনো পেঁচার ডাক, সাপের খপ্পড়ে পড়া ব্যাঙের খড়গ খড়গ, নিশাচর কুকুরের ঘেউ ঘেউ কিংবা আরো জটিলতর কিছু...

ভাগ্যিস, মাহমুদ বলেছিস। তাই বিশ্বাস না হলেও মনে মনে এক ধরনের প্রস্তুতি ছিল। গাড়ি থেমে যাওয়ায় পরবর্তী ঘটনার জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করতে লাগলাম। হালকা হালকা তুষারপাত হচ্ছে। হঠাৎ করেই যেন শীত বেড়ে গেছে। এতক্ষণ ধরে গাড়ি স্ট্যার্ট দেয়ার জন্য বারবার চেষ্টার ফলে শরীর গেছে ঘেমে। এভাবে কতক্ষণ কাটাতে হবে কে জানে। মাহমুদের কথা মতো যদি কিছু না ঘটে তাহলেও আরেক সমস্যা। গাড়িতে সারারাত এভাবেই বসে থাকতে হবে। শেষে দিনের আলো ফুটলে আবারো চেষ্টা করে দেখতে হবে। আর যদি কিছু ঘটে...?

বেশি কিছু ভাবতে পারলাম না। বুকের ভেতরে কে যেন হাতুড়ি পেটা করতে লাগল। সত্যিই কি সেই পিশাচীর কবলে পড়তে যাচ্ছি আমি? সেই পিশাচীÑ যে কিনা এভাবেই প্রতি রাতে তার শিকারকে নিজের ডেরায় নিয়ে যায়? স্টেশনে কোনো গাড়িকে (নাকি শিকারকে?) টার্গেট করে সে। স্টেশন পাড় হতেই গাড়িতে হালকা হুল-ফোটার মতো কিছু একটা হয়। আরও কিছু দূর আসার পর গাড়ির খিটমিটে ভাব শুরু হয়। মৃগী রোগীর মতো সে তাপরাতে তাপরাতে থেমে যায়। তারপর...?

হঠাৎ যেন তুষারপাতের ভেতর দিয়ে আমার ডান দিকে একটি সুরম্য অট্টালিকা উদয় হলো। তুষারের সাদা পর্দায় এতক্ষণ আড়াল হয়ে ছিল প্রাসাদটা। আমার গাড়ির স্ট্যাটার্টে অনিচ্ছুক ঘ্রত ঘ্রত আওয়াজ শুনেই বুঝি হঠাৎ বাড়ির সামনের দিকের কয়েকটা ঘরের আলো জ্বলে উঠল। তারপর খুট করে খুলে গেল সদর দরজা।

ধীরে ধীরে সে দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো এক পরী! পরীই তো? সত্যিই, মেয়েটিকে পরী ছাড়া এই মুহূর্তে অন্য কিছু মনে হচ্ছে না আমার। রূপ-যৌবন যেন উছলে পড়ছে তার। সাদা সালোয়ার কামিজ পরা। কোমর সমান দীর্ঘ চুল। মুখে টকটকে লাল লিপস্টিক। সত্যিই কি লিপিস্টক, নাকি রক্ত?

আমার চোখের পল পড়ছে না। ঘোরের মধ্যেই টের পেলাম, বালিকা কখন জানি আমার গাড়ির কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। গাড়ির দরজায় নক করছে সে। কাচ নামিয়ে তার দিকে তাকালাম।

‘ভীষণ সমস্যায় পড়েছি। গাড়িটা বিগড়ে গেছে। সাহায্য দরকার, আপনি যদি...’ এক নাগাড়ে কথাগুলো বললাম। অথচ, আমি জানি, এ কোনো যেন তেন নারী নয়। ভয়ঙ্কর এক পিশাচী সে। আমাকে সাহায্যের কথা বলে তার ডেরায় নিয়ে যাবে। তারপর চুষে চুষে খাবে আমার তরতাজা রক্ত...
আর, সত্যিই কি আমি কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম তাকে? নাকি আমার মুখ দিয়েই বলিয়ে নিয়েছে সে!
আমার কথা শুনে মুচকি করে একটু হেসে মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল তার মুখ থেকে। সুরেলা কণ্ঠে বলল, ‘আসুন!’
আমার মনে হলো, এই কণ্ঠে কিছু শোনার জন্যই বুঝি জন্ম হয়েছে আমার। আমি এই কণ্ঠে কিছু শুনে শুনেই জীবন পাড় করে দিতে পারব।

২. আলমারি থেকে একসেট পোশাক বের করে আমার হাতে দিয়ে বাথরুম দেখিয়ে দিলো। ‘আপনি প্লিজ মনে জড়তা রাখবেন না। এখন ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ততক্ষণে রাতের খাবারটা রেডি করছি।’
কথা শুনে মনে হলো আমি তার কত দিনের চেনা! না, জড়তা রেখে কী লাভ? একদিক দিয়ে ভালোই হলো। আমি যে রাতে খাইনি সেটা আর তাকে আগ বাড়িয়ে বলতে হলো না। কিন্তু আমার জন্য কী রান্না করবে সে? নাকি নিজের আহারের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে সে? বাড়িতে কি সে একাই? নাকি আরো কেউ আছে?
সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে গোছলে মগ্ন হলাম। হালকা শীতের মধ্যে মৃদু গরম পানিতে গোছল করতে বেশ আরামই লাগছে। হঠাৎ লাল লাল কিছু দেখে চমকে উঠলাম। পানি নয়, এ যে রক্ত! আর্তচিৎকার করতে গিয়েও চেপে গেলাম।
একটি অতি পরিচিত গান ভেসে এলো কানে। পরিবেশটা আর ভয়ার্ত লাগছে না। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, কোথায় রক্ত! সব যে আমার মনেরই ভুল।
বালিকার বোধ হয় গান শোনার বেশ শখ। আগেই খেয়াল করেছি, রুমের মধ্যে অতি দামি দামি সব সাউন্ডবক্স রয়েছে। এবার কাজের মধ্যেই সে গান শুনছে। আরো ভালো লাগছ, গায়ক আমার খুবই কাছের একজন মানুষ। আবারো গোছলে মনোনিবেশ করলাম।

৩. খাওয়া-দাওয়ার পর দু’জনে পোলো খেললাম। আমার মতো বিপদে বুঝি প্রতিদিনই কেউ না কেউ পড়ে। সে কারণেই এ বাড়িতে ফ্রিজে খাবার রেডি করা থাকে। খাবার গরম করতে বেশি সময় লাগেনি। অবশ্য খেতেও বেশি সময় লাগেনি আমার। রহস্য বালিকা ‘স্যরি, আমি আগেই খেয়ে ফেলেছি’ বলে আমার সঙ্গে বসে থাকলেও কিছুই খেলো না। তাহলে কি এ আমাদের ন্যায় এসব খাবার দাবার খায় না? নরমাংস খেয়েই চলে তার উদরপূর্তি?
খেলার ফাঁকে কাচের গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে আমার দিকে এগিয়ে দিলো। নিজের হাতেও একটি গ্লাসে নিলো কিঞ্চিৎ। কিন্তু খেতে দেখলাম না। গান বাজছে। একই গায়কের গাওয়া বিভিন্ন গান। মনে হয় এই গানগুলো তার জীবনের সঙ্গে বিশেষ যায়... অথবা আজ কারো কথা মনে পড়ছে, যার সঙ্গে গানের কথাগুলো মিলে যাচ্ছে... আমি বাথরুমে থাকা অবস্থাতেই এ কাপড় পাল্টেছে। এখন পরে আছে নীল শাড়ি। নীল শাড়ি আমারও পছন্দের। মাঝে-মধ্যে শাড়ি সরে তার শরীরের বিশেষ বিশেষ অংশ দেখা যাচ্ছে। আমার বিশেষ আকর্ষণ কাড়তে সক্ষম হলো তা। বালিকা তা খেয়াল করে মুচকি করে হাসলোও বার কয়েক।

ওয়াইন মুখ অবদি নিয়েও তা গিলতে ভয় হচ্ছে। এ ওয়াইনে কিছু মেশানো নেই তো? আমাকে অজ্ঞান করে, তারপর...। শেষপর্যন্ত বালিকার অপরূপ রূপশ্রীর কাছে সমস্ত সন্দেহ জলাঞ্জলি দিয়ে ঢোক করে গিলে ফেললাম পুরোটা। বালিকা আমার কাছে এসে আরো একটু ঢেলে দিলো। শরীর থেকে চিত্তাকর্ষক পারফিউমের ঘ্রাণ এসে নাসারন্ধ্রে আঘাত হানলো। মুহূর্তেই ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম।

গান থেমে গেছে। বালিকা গিয়ে আবারও প্লে করল। তারপর আমার দিকে আসতে লাগলো। হঠাৎ যেনো তার চোখ দুটো জ্বল জ্বল করতে দেখলাম। নাকি ভুল দেখলাম? হ্যাঁ, বোধহয় ভুলই দেখেছি। এমন নিষ্পাপ বালিকা অতোটা ভয়ঙ্কর হয় কী করে? ওই তো ওর চোখে-মুখে প্রেম খেলা করছে। বালিকা যেনো ফিসফিসিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে গভীর আবেগী কণ্ঠে বলছে, ‘এই মায়াজাল ছিন্ন করে কেউ কখনো যেতে পারে না। তুমিও পারবে না। আমার ভালোবাসার বাহুডোরে চিরদিনের জন্য বেধে ফেলবো তোমায়...।’

বালিকা ধীরে ধীরে কাছাকাছি চলে আসছে। আমার ঠোঁট কাঁপছে, ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে ইচ্ছে করছে, খুউব। হঠাৎ বন্ধু মাহমুদের কথা খেয়াল হলো। স্টেশনের পর থেকে আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছে, তার পুরোটাই আমি এখানে আসার আসে ও আমাকে বর্ণনা করেছে। বলা চলে, ওর সঙ্গে এক প্রকার জেদ করেই এখানে এসেছি আমি। ওর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, ও এখানে এসে রাত কাটিয়েছে। ও যদি এখান থেকে আতিথেয়তা নিয়ে যথাযথভাবে ফেরত যেতে পারে, তাহলে আমি কেনো পারব না। মাহমুদ আমাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, ওই মেয়েটি এক সাক্ষাৎ পিশাচী। মানুষ তার প্রিয় শিকার।

শুধু তাই নয়, সে শিকারকে নিয়ে এমনভাবে খেলা করে, তাতে শিকারের কিচ্ছুটিই করার থাকে না। শিকার কেবল তার খেলনার পাত্র হয়েই থাকে। তার প্রাসাদের সামনে এসে থামবে শিকারের গাড়ি। নিজে গিয়ে শিকারকে আতিথ্য দেবার কথা বলে এখানে নিয়ে আসবে। শিকারকে গোছালে পাঠানোর নাম করে ফ্রেশ করবে। অপরিষ্কার শিকারে বুঝি তার বেশ অ্যালার্জি রয়েছে!

শিকারকে পেটপুরে খাইয়ে আরো বেশি তরতাজা করবে। শিকারের পেট ভরা থাকলেও কিছু করার নেই। তার মুখের পানে তাকিয়েই খাবার গ্রহণ করবে শিকার। রান্না করতে খুব ভালো লাগে তার। সেটাও বুঝি আপ্যায়ন করানোর আরেকটা কারণ। একদিকে লাউডে গান বাজতে থাকবে, অন্যদিকে শিকারকে নিজের রূপ দিয়ে প্রেমের জালে ফাঁসাবে। তারপর আসল রূপে, অর্থাৎ পিশাচী রূপে আবির্র্ভূত হবে সে। শিকারের কোনো কিছু জানার থাকলে, বলবে সে। এমনকি সেটা যদি এই পিশাচীর নিজের গোপন কোনো কাহিনি হয়, তাও। বন্ধু মাহমুদের দুর্ভাগ্য, তার বিশেষ কিছু জানার আগ্রহ জাগেনি। মনটা ভালো ছিল না।

বিশেষ এক ভাবনায় মগ্ন ছিল তখন। যাই হোক, তারপর শিকারকে নিজের পুরোপুরি বশে এনে তার শরীরে ফুটিয়ে দেবে বিষ দাঁত... এক ফোটা রক্ত বিন্দু অবশিষ্ট থাকা অবদি চলবে তার রক্ত পান। তারপর... তা আর বলতে পারেনি বন্ধুবর। শুধু আমাকে বলেছে, বালিকা একটু আগে যে কথাগুলো আমাকে বলেছে, ওকেও নাকি ঠিক একই কথা বলেছে সে। পিশাচীর একটা কথাও নাকি মিথ্যা নয়!
তার মানে...?

সামনে তাকিয়ে দেখি, মুহূর্তের মধ্যেই সেই সুন্দর রূপশ্রী বদলে গেছে। তার বদলে তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত পাশবিকতা। চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে তার। সামনের দুটি দাঁত যেন ঠেলে বের হয়ে এসেছে। (চলবে)

শেষ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন। 

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads






Loading...