গল্প

সোহানা

শহিদুল ইসলাম লিটন

মানবকণ্ঠ
শহিদুল ইসলাম লিটনের গল্প - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০৪

মানবজীবনের একান্ত ভাবনা থেকে প্রেমের সৃষ্টি। এ রকম এক প্রেমের করুণ কাহিনীর জন্ম হয় সোহানার জীবনে। সে তার প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে অসহায়ভাবে জীবন উৎসর্গ করে। প্রেমের বিপরীতে প্রতিশোধে মত্ত না হয়ে প্রেমিক প্রতারককে ক্ষমা করে দেয়। তার মতো আরো যত নারী এমন পরিস্থিতির শিকার তাদের জন্য সে এক নারী আশ্রমের পরিকল্পনা রেখে যায় তারই একান্ত বান্ধবীদের কাছে। প্রেমের সেই কাহিনী ছিল এ রকম সোহানা উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছাত্রী হিসেবে সে খুবই মেধাবী। সোহানার জীবনের লক্ষ্য ডাক্তার বা শিক্ষিকা হওয়া। যাতে সে মানুষের সেবা করতে পারে।

সোহানা একদিন তার ভাবির সঙ্গে মার্কেটে যায় কিছু কেনাকাটা করতে। সেই দোকানে দেখা হয় সুমন নামের একটি ছেলের সঙ্গে। ছেলেটি কিছুদিন পূর্বে লন্ডন থেকে এসেছে, সুমন সোহানাকে দেখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সোহানার দিকে। আর সে মনে মনে ভাবে কত সুন্দর মেয়েটি। এই রকম একটি মেয়ে যদি তার জীবন সঙ্গিনী হতো, তাহলে তার জীবন ধন্য হতো। সোহানা যেন ফুলের বাগানে সদ্য প্রস্ফুটিত এক ফুটন্ত গোলাপ।

হরিণীর মতো টানা টানা দুটো চোখ, মাধকতাময় চাহনী। দীঘল কালো চুল পিঠের সীমানা ছাড়িয়ে ঠাঁই নিয়েছে কোমরের নিচে, যেন বা কালোজলের আরেক লিটল ভিক্টোরিয়া কিংবা নায়াগ্রা জলপ্রভাত। প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে যায় সুমন। এই অপরূপ চেহারা এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেনি সুমন। সোহানাকে জীবন সঙ্গিনী বানাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে সুমনের মন। সুমন সেই দোকান থেকে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ফোন করে সোহানাকে। সুমন সোহানাকে পরিচয় দিয়ে বলে আমি সুমন। আপনার নিশ্চয় মনে আছে গত ক’দিন আগে আপনার সঙ্গে আমার এক দোকানে দেখা হয়েছিল। সোহানা জানতে চায়, কী আপনার উদ্দেশ্য।

সুমন-সোহানাকে মোবাইলে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সোহানা-সুমনের সেই বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। উপায়ন্তর না দেখে সুমন একদিন হলুদ খামের একটি চিঠি পাঠায় সোহানাকে। প্রেরক সুমনের নাম আর প্রাপক সোহানার নাম দেখে সোহানা পত্রটি খুলে পড়ে। আবেগ-আপ্লুত হয়ে যায়। এত সুন্দর চিঠির ভাষা। সুমন চিঠিতে লিখেছে, সোহানা আমি তোমার প্রেমের যোগ্য নই ঠিক কিন্তু তোমাকে পাবার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে আছে। আমি জানি, তোমাকে পাবার কোনো যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু আমার এই হৃদয়ের বিশাল আসনে সারাজীবন তোমাকে পরম পূজনীয় করে রাখবো। জানি না কী কারণে, কেন বা সোহানা তোমার নামটি আমার হৃদয়ে সদা জাগ্রত। এটা নিশ্চয় প্রভুর পক্ষ থেকে কোনো শুভ সংকেত। তোমাকে পাবার পবিত্র প্রত্যাশা নিয়ে লিখেছি এইপত্র। যোগ্যতার বিচারে নাইবা মূল্যায়ন করলে।

আমার ভালোবাসার আকুল আবেদনটুকু যদি গ্রহণ কর তাহলে, এই অতৃপ্ত হৃদয় ফিরে পাবে একটু শান্তির পরশ। সুমনের চিঠির ভাষায় মুগ্ধ হয়ে যায় সোহানা। সোহানা বিষয়টি তার ভাবির সঙ্গে আলাপ করে। পরিবারের সবার মতামত জানতে চায়। পরিবারের সবাই সোহানার এই ইচ্ছায় মত দেয়নি। তারা সোহানাকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, তুমি শিক্ষিতা মেধাবী ছাত্রী। সামনে তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। যেখানে সুমনের সঙ্গে তোমার কোনো ভালো পরিচয় নেই, তাতে এই বিয়েতে আমাদের কোনো মত নেই। আমরা এই বিষয়ে তোমাকে আর কিছু বলব না। তাই নিরুপায় হয়ে একদিন পরিবারের অমতে সবার অজান্তে কোর্ট ম্যারেজ করে সোহানা আর সুমন।

কিছুদিন পর সবাই জেনে গেল তাদের এই বিয়ে। পরিবারের কেউ এই বিয়ে আন্তরিকভাবে মেনে নেয়নি। সুমন ও সোহানার দাম্পত্য জীবন বেশ কিছুদিন সুখে ও শান্তিতে কাটছিল। সুমন সোহানাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায়।

অনাবিল হাসি আর আনন্দে কাটে তাদের এই জীবন। একদিন সুমন সোহানাকে নিয়ে যায় শিশু পার্কে। পার্কে বসে সোহানা আর সুমন গল্প করছিল। হঠাৎ সুমনের মোবাইল ফোন বেজে ওঠে একটি নারী কণ্ঠ। সুমন তুমি কবে আসছো। এই কণ্ঠ সোহানার জীবনের একটি অশনি সংকেত, সোহানা তা ভাবতে পারেনি। কিছুদিন পর সুমন চলে যায় লন্ডন। লন্ডনে যাওয়ার পর সুমন আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি সোহানার সঙ্গে।

ৎসোহানার সঙ্গে সুমন যখন দীর্ঘ ছয়মাস যোগাযোগ রাখেনি তখন সোহানা তার বাবার বাড়িতে চলে যায়। সেখানে সে পদে পদে অনুভব করে সবার স্নেহ-মমতা ক্রমশ তার প্রতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। সোহানা ভাবে পরগাছা হয়ে বেঁচে থেকে কী লাভ? বরং দেখি নিজের যোগ্যতাকে দিয়ে ভাগ্য গড়া যায় কিনা। সোহানা চলে যায় ঢাকার তার বান্ধবী শীলার কাছে। শীলা একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক। সোহানা আশ্রয় নেয় শীলার বাসায়। সেখানে সোহানা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য চেষ্টা করে।

বাঁচার তাগিদে জীবনযুদ্ধের কঠিন সংগ্রামে সোহানা প্রত্যক্ষ করে তার শ্রমের মূল্যায়নের চেয়ে দেহের সৌন্দর্যের মূল্যায়ন মালিকদের কাছে সবচেয়ে বেশি। তাই অশুভ লালসার দৃষ্টির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে সোহানা বিকল্প চিন্তা করে। দুটো ডাল-ভাত খেয়ে কীভাবে পবিত্র জীবনযাপন করা যায়। পত্রিকায় একদিন একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পায়। একজন গৃহশিক্ষিকা আবশ্যক। সোহানা ঠিকানা মতো চলে যায়। সেখানে কিছুদিন সে শিক্ষকতা করে। সোহানা শিক্ষকতা করে রাস্তায় বের হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনজন মাস্তান সোহানাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় নির্জন স্থানে। এতে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে সোহানা হয়ে যায় সমাজের আবর্জনা। যার চোখে ছিল সুখের স্বপ্ন।

নরপশুরা তার জীবনের সেই সুখের স্বপ্ন কেড়ে নেয়। তিনদিন পর সোহানা একজন নরপশুকে খুন করে সেখান থেকে কোনো রকমে পালিয়ে আসে। সোহানার দুটি হাত হয়ে যায় রক্তে রঞ্জিত। যে হাত দুটি সারাজীবন মানুষের সেবা করার কথা ছিল। শীলা অনেক খোঁজাখুঁজি করে সোহানাকে খুঁজে পায় মতিঝিলের এক রাস্তায় পাগলির বেশে। শিলা বুকে জড়িয়ে রাখতে চায় সোহানাকে। সোহানা তাতে বাঁধা দেয়। তোমার এই পবিত্র বুকে আমাকে জড়িয়ে পাপ বিস্তার করো না। ছুঁয়ো না আমাকে, পাপ হবে।

আমি খুনি, আমি পাপী। এ কথা শুনে শীলার চোখ থেকে অঝরে বৃষ্টির মতো পানি পড়তে থাকে। সোহানা একটি চিঠি তুলে দেয় শীলার হাতে। কিছুক্ষণ পর পিছন থেকে একটি ঘাতক ট্রাক এসে সোহানার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। শীলা সোহানার চিঠিতে লেখা অনুযায়ী তার জীবনের শেষ উদ্দেশ্যটুকু শীলা এবং সোহানার বান্ধবীরা পূরণ করে। সোহানার বান্ধবীরা খুব ধনী এবং উচ্চশিক্ষিত বিধায় তারা সবাই নিজেরা অর্থ দিয়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নারী আশ্রম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। সোহানার স্বপ্ন পূরণ করে। যে সমস্ত নারী ভালোবাসার নামে প্রতারণার শিকার হয়ে সমাজ থেকে নিগৃহীত হয়ে স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে বেঁচে থাকার আশ্রয় চায় এই আশ্রমে যাতে তাদের আশ্রয় হয়। সোহানার স্মৃতি রক্ষার্থে খোলা হয়েছে এই নারী আশ্রম। তার স্বপ্নের এই নারী আশ্রমে শত শত নারী আশ্রিত।

সোহানার জীবনের করুণ পরিণতির জন্য দায়ী সুমন। সুমন ভালোবাসার নামে প্রতারণা করে তছনছ করে দিয়েছে সোহানার সোনালি জীবন। যে সুমন একদিন ভিখারীর মতো ভিক্ষা চেয়েছিল সোহানার ভালোবাসা। সোহানা সরল বিশ্বাসে সবার অমতে তার দেহ-মন উজাড় করে দিয়েছিল তার হাতে। বিশ্বাস ঘাতকতায় সোহানা হয়ে যায় নিঃস্ব ও অসহায়। সমাজ তাকে ফেলে দেয় আস্তাকুড়ে। শিলা প্রতিশোধ নিতে চায়, সুমনকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে। উন্মোচন করতে চায় তার মুখোশ কিন্তু সোহানা তার পবিত্র ভালোবাসার কসম দিয়ে চিঠিতে বারণ করেছিল শীলাকে যাতে সে সুমনের ওপর কোনো প্রতিশোধ না নেয়। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে শীলাকে অনুরোধ করে তার ভালোবাসার অমর্যাদা হয় এমন কিছু না করতে। সুমন সোহানার প্রতি যে অবিচার করেছে, তার বিচার ছেড়ে দেয় ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ওপর।

শীলা ভাবতে থাকে কত বিশাল চিত্ত ছিল সোহানার গভীর প্রেমে আচ্ছন্ন ছিল যে হৃদয়, সুমন নামের এমন এক প্রতারক জুটল সোহানার জীবনে। তাই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সোহানার জীবনে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত দুঃখজনক ঘটনা না লিখার সিদ্ধান্ত নেয় শীলা। পৃথিবীতে যতদিন প্রেম ও ভালোবাসা থাকবে সোহানার এই ভালোবাসা কিংবদন্তি হয়ে ইতিহাসের পাতায় গাঁথা থাকবে চিরকাল চির অম্লান হয়ে। শীলা মনে মনে ভাবে সুমন নামের এই প্রতারক যদি না জুটতো সোহানার জীবনে তাহলে সোহানার স্বপ্ন অনুযায়ী সে হয়তো ভালো কোনো শিক্ষিকা বা ডাক্তার হয়ে সমাজে তার কর্মের মাধ্যমে প্রশংসিত হতো।

সোহানা যখন সুমনের উপর প্রতিশোধ নিতে নিষেধ করেছে আমাকে তখন পত্রিকায় তার ছবি (সোহানার) ছাপা করে সুমনের প্রতারণা এবং নরপশুদের দ্বারা এই সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনার জীবন কাহিনী প্রকাশ করে সোহানার মতো বিশাল চিত্তের মমতাময়ী নারীকে তার সম্মান এই সমাজে খাটো না করাই ভালো। সোহানা চলে গিয়েছে জীবন থেকে কিন্তু অসহায় নারীদের জন্য সোহানা রেখে গেছে নারী আশ্রম। অসহায় নারীরা যতদিন উপকৃত হবে এই আশ্রম থেকে ততদিন বাংলার আকাশে বাতাসে সোহানার নাম ধ্বনিত হবে বঞ্চিত নারীদের কণ্ঠে।

মানবকণ্ঠ/জেএস





ads







Loading...