নোঙর

লিটন আব্বাস

মানবকণ্ঠ
নোঙর - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৪০

একমাত্র সন্তান সাদেক সাতদিন ধরে অসুস্থ। আজ যা হয় হোক। ছেলেকে সরকারি হসপিটালে দেখাবে। সোজা বাসে চড়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বহির্বিভাগে নিয়ে গেল। একটা টিকিট কেটে মেডিসিন বিভাগের বিশাল সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে। দুই ঘণ্টা পর ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পেল। ছেলেকে ডাক্তার দেখিয়ে বুঝতে পারে সন্ধ্যা হতে আর সময় নেই। মনের মধ্যে ঝড় উঠে গেল। একটা কাজ শেষ হলেও পেটের ভাতের জোগানের স্থান কিভাবে ঠিক থাকবে সেই ভাবনায় ভীত হয়ে আছে ঠিকই। ছুটি না পেয়েও শুধু কলিগদের বলে চলে গেছে অথচ কলিগদের কিছুই করবার নেই। হাজার টাকার মধ্যে ছেলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধপত্র হয়ে গেল।

সাতদিন সাদেকের জ্বর কিছুতেই কমছে না। মাঝরাতে জ্বর বাড়ে, মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। নাপায় যাচ্ছে না, জলপট্টি দিলে কিছুটা আরাম পায় নিমিষেই আবার আগের অবস্থা হয়। সাবিনা ঢাকা শহরের বড় এক প্রাইভেট হাসপাতালের ক্লিনার। গোনা বেতন, অনিয়মিত সামান্য বকশিশে মা-ছেলের চলে যায়। ছেলেটার বয়স তিন বছর। অসুস্থ হলে সরকারি হসপিটালই সই। বড় হসপিটালের চাকুরে হলেও এখানে ছেলেকে দেখানোর সাধ্য তার নেই। ভিজিট, বকশিশ, প্রয়োজনীয় টেস্ট, অহেতুক টেস্ট করানোর সামর্থ্য নেই। বড় বড় হসপিটালের কায়কারবার তার অনেকটাই জানা। সেবার নামে হোপ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিলাপ দেয়া সেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় এই শহরে বেশি। পেটের তাগিদে চাকরি করে। সারাদিন সময়ের অধিক খাটুনি খেটে গাবতলীর বেড়িবাঁধের খুপড়ি ঘরে শান্তির বসত তাদের। ছেলেটার জ্বর আজ এতোটাই যে, সে সিস্টারদের কনসার্ন নিয়ে আড়াইশ’ নাপা সাপোজিটরি দিয়ে গত রাতটা পার করেছে কোনমতে। সকাল থেকেই আবার আগের অবস্থা।

সারাক্ষণ মা, মা করছে।
মা, আজ তুমি অফিসে যেও না। আমাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে চলো?

ছেলের এমন আবদারে না করতে পারেনি। মা আর সন্তানের সম্পর্ক কী কেবল মা ও সন্তানই জানে। পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক মা আর সন্তানের। কিসের চাকরি, কিসের টাকা, কিসের বাড়িঘর। সন্তানের জন্য মা সবকিছু করতে পারে। গেল কয়েকদিন ধরে সিকিউরিটি অফিসারকে বলে একবেলার ছুটিও করাতে পারেনি। ভোর সাতটা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা সাতটা অবধি ডিউটি অথচ সাতটায় ছুটি হয় না। হতে হতে রাত নয়টা বেজে যায়। ঘরে ফিরতে দশটা সাড়ে দশটা। পাশের ঘরের মানুষ আর কতক্ষণ দেখভাল করবে। সাদেক পেটে থাকতেই তার বাবা লাপাত্তা। সাবিনা অপেক্ষা করে করে আর প্রতীক্ষায় থাকে না। একটা কাজ জুটিয়ে নিয়েছে। চাকরিটা ভালো। কিন্তু এখানে অনেক মানুষ প্রতারিত হয় নানাভাবে। ভর্তি থেকে শুরু করে বেড ভাড়া, অজস্র ইউনিট, ফার্মেসি সব ক্ষেত্রে কিছু না কিছু সিডিউসমেন্ট চলে। যে রোগী একবার ভর্তি হয় রিলিজের সময় ঝগড়া না করে ফেরে না। এসব দেখে দেখে মাঝে মধ্যে সাবিনার মনের মধ্যে বিবেকের দরজা খুলে ওঠে কিন্তু বেচারি নির্বিকার। তার মতো একজন সামান্য ক্লিনার রোগীদের প্রতি সহানভ‚তি দেখানো ছাড়া কোনো সহযোগিতা করবার মতো ক্ষমতা নেই। রোগীর কথা ভেবে তাদের স্বজনেরা অসহায়ের মতো দিনের পর দিন হসপিটালে পরে থাকে! সাবিনার চাকরির বয়স আড়াই বছর হয়ে গেলো। তার মোটামুটি সব খবরই জানা বা শোনা হয়ে গেছে। কিন্তু সর্বত্র সে চুপ। স্বামীর কাছে, সংসারে, প্রতিবেশী, রাস্তাঘাটে সবখানে চুপচাপ। সবার আঘাত সহ্য করে সে বেঁচে আছে।

একমাত্র সন্তান সাদেক সাতদিন ধরে অসুস্থ। আজ যা হয় হোক। ছেলেকে সরকারি হসপিটালে দেখাবে। সোজা বাসে চড়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বহির্বিভাগে নিয়ে গেল। একটা টিকিট কেটে মেডিসিন বিভাগের বিশাল সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে। দুই ঘণ্টা পর ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পেল।

ছেলেকে ডাক্তার দেখিয়ে বুঝতে পারে সন্ধ্যা হতে আর সময় নেই। মনের মধ্যে ঝড় উঠে গেল। একটা কাজ শেষ হলেও পেটের ভাতের জোগানের স্থান কিভাবে ঠিক থাকবে সেই ভাবনায় ভীত হয়ে আছে ঠিকই। ছুটি না পেয়েও শুধু কলিগদের বলে চলে গেছে অথচ কলিগদের কিছুই করবার নেই। হাজার টাকার মধ্যে ছেলের পরীক্ষা নিরীক্ষা, ওষুধপত্র হয়ে গেল।

এর মধ্যে ছেলে বায়না ধরল।

মা, কিছু খেতে পারছি না, আমি ফল খাবো। ছেলের এই সামান্য আব্দার মেটাতে তার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। দুই হাজার টাকা ধার করেছে। টেস্ট, ওষুধ নিয়ে হাজার খানেক শেষ হলেও এখনো অনেক টাকা হাতে। আপেল, কমলা, আঙ্গুর, পিয়ারা সবই কিনল। সঙ্গে পাউরুটি। সব কিনে হাসিমুখে ছেলেকে নিয়ে বেড়িবাঁধের খুপড়ি ঘরে নিশ্চিন্তে গেল ঠিকই কিন্তু সাবিনার মনে চলছে হসপিটাল। চাকরিটা থাকবে কিনা! না থাকলে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে কি করবে? কোথায় যাবে? রাজ্যের চিন্তা ভর করে শ্রমজীবী এই মহিলার।

ছেলেকে ঘরে নিয়ে রুটি, ফল ওষুধ খাইয়ে ঘরের বাইরে আসে। বেড়ি বাঁধের বিশাল রাস্তা, ময়দানের মতো। শুধু গাড়ি আর গাড়ি ছুটছে। এক সময় এখানে কোনো যানবাহনের দেখা মিলত না। রাস্তা এত চওড়া ছিল না। রাস্তার উপরেই বস্তি গেড়ে ছিল। এখন রাস্তার ঢালে চলে গেছে এসব মানুষ। এলাকার নেতাগোছের বড় ভাইয়েরা এসব নিয়ন্ত্রণ করে। ঘরের মাথায় পলিথিন চাটাই দিয়ে মুরগির খোপ খোপ করে ঘর প্রতি মাসে আঠারশ’, ভালো বিজনেস। এই সব ঘরহারা, স্বজনহারা মানুষের এ ছাড়াও তো উপায় নেই। ভালোই আছে এরা।

রাত গাঢ় হয়ে এসেছে। ঢাকা শহরের ঝিলিকবাতির ঝলক বন্ধ হতে চলেছে। ঝিকমিকি আয়োজন আর কোলাহল কমতে শুরু করেছে। কালকের সকালের জন্য সারাবিশ্বের ভয় তার মনের মধ্যে। কিছুতেই সাহস পাচ্ছে না ঘরে ফিরতে। ছেলেটোর মুখের দিকে তাকালে হুহু করে কান্না চলে আসবে।

কিন্তু ফিরতে হবে। ঘরে ফিরে এসে দেখে ছেলেটা বিভোরে ঘুমোচ্ছে। মাথায় হাত দিয়ে দেখল, জ্বরের কোপটা আগের মতো নেই। ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি সাবিনা। ঘুম যখন ভাঙল সকাল সাতটা বেজে সারা। ধচমচ করে ওঠে। ছেলেকে ওষুধ-পথ্য খাইয়ে পাশের ঘরের পড়শিতো বোনকে বলে কিছু না খেয়েই সোজা হসপিটালে দৌঁড়। যথারীতি আটটার কয়েক মিনিট আগে ঢুকে দেখে নির্ধারিত জায়গায় আরেকজন ক্লিনার। যাকে সে আগে দেখেনি। সিকিউরিটি অফিসারের কাছে যায় সাবিনা। অফিসারের মুখ গোমরা দেখে ভয়ে ফিরে আসে। এরপর কলিগদের কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করে কিন্তু কেউই কিছু বলছে না। সবার মুখে ব্যান্ডেজ। ডিউটিরুমে ঢুকে দেখে সেই বিশাল মোটা সাইজের গোমরামুখের প্রধান নার্স বসে আছেন। এসি চলছে আবার টেবিল ফ্যানও। মনে হচ্ছে মেদের চোটে মন খিটিমটে হয়ে আছে। সামনে যেয়ে সালাম দিতেই বলে, এডমিনে যাও। আর কিছু বলার সাহস না করে দোতলায় এডমিনের ঘরে গেল। সেখান থেকে এইচআরে পাঠায়। এবার সে আস্তে আস্তে বুঝেছে এইচআর মানে মহাবিপদ। পা টিপে টিপে এইচআরে যায়। এর মধ্যে এইচআরের একজন বলে, কি দরকার?

এডমিন থেকে আমাকে পাঠাল। আমি কার সাথে কথা বলবো?
কী বিষয়?
এইচআরের উচ্চকিত কণ্ঠের জবাবে ভয় পেয়ে গেছে সাবিনা।
ইশারায় ভেতেরের রুম দেখিয়ে দেয়। মাঝারি সাইজের কর্তা। ঢুকে সালাম দেয়।
কি ব্যাপার?
স্যার আমি চারতলার ক্লিনার সাবিনা।
এইচআরের কর্তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইন্টারকম চেপে একজনের সঙ্গে কথা বলে ফোন রেখে দিয়ে বললেন, তোমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সতেরোদিনের বেতন নিয়ে যেও সামনের মাসে।
মানে স্যার! আমার অপরাধ তো একদিন, মানে আমার ছেলের অসুস্থতার জন্য আসতে পারিনি কাল। আমি তো ছুটি চেয়েছিলাম ছেলের অসুস্থতার জন্য কিন্তু আমাকে পারমিশন দেয়নি। ছেলেটা আজ সাতদিন ধরে ভীষণ অসুস্থ।
আমার কিছুই করার নেই। উপরের নির্দেশ। সুতরাং তুমি আসতে পারো। সাবিনা কী করবে কার সাথে কথা বলবে। উপয়ান্তর খুঁজে পায় না। কাল যা ভেবেছে তাই হলো। গরিবের ভাবনা মিলে যায়, স্বপ্ন সত্যি হয় না।

সকালের রোদ তখনো চড়া হয়ে উঠেনি, একটু মিষ্টি মিষ্টি তেজ শরীরে ওম দিয়ে গেল। ভাবনাটা সাবিনাকে ভয়ে ভয়ে রাখে। অসুস্থ ছেলেটার কী হবে! অসুখটা হয়তো সেরে যাবে কিন্তু আবারো কোন অসুখ করবে তখন কী হবে।

কে তার জন্য কাজ নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। এই সময়ে গতরের খুব চাহিদা। সাবিনার পুরোট ও নির্মেদ শরীর অনেককে আকর্ষণ করে। সাদেকের বাবা ফেলে গেলে কতজন কতই না প্রলোভন দেখিয়েছে, খারাপ কথা বলেছে। সেসব সহ্য করে নিজেকে আগলে রেখেছে। তার কাছে ব্যক্তিত্বই সব।

সম্পদ মনে করে মাঝেমাঝে হেসেছে একাকি। ওর কিছু কলিগতো অফিসের উঠতি বসদের মনোরঞ্জন করে চলে। তাদের ছুটি, সিএল, এবসেন্ট ঠিকই তারা কাভারেজ দিয়ে দেয়। কেবল সাবিনার বেলায় হয় না। গতরের গর্মি সাবিনাকে আর সবার থেকে আলাদা রাখে বলে এই নিয়ে লোভী, হিংস্র মানুষের প্রবল ক্ষোভ। হায়, ছেলেটার অসুস্থতার কাছে হার মেনে চাকরি হারিয়ে ফেলল। নিষ্কর্ম সময় কোন মতে কাটতে চায় না। এদিকে সেদিক করে বেলা এগারোটার বেশি বাজলো না। এখুনি ঘরে গেলে পড়শিরা কী মনে করবে। একেকজন একেক রকম প্রশ্ন করে জর্জরিত করবে। তারচেয়ে বড় কথা সাদেকের মুখের দিকে তাকালে চোখে জমা থাকা বানের সব স্রোত অঝোরে নেমে আসবে।
অবশেষে ব্যর্থতা, আগামীর সব অনিশ্চয়তা সঙ্গে করে বাড়ি ফিরে এলো সাবিনা।

ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতেই সাদেক বলে ওঠে, মা আজ তাড়াতাড়ি ফিরে এলে! আমি ভালো হয়ে গেছি মা। দেখো না আমার আর জ্বর নাই! সাবিনা সাদেকের কপালে হাত দিয়ে দেখে সকালের পর আর জ্বরটা উঠেনি।

সন্ধ্যার অন্ধকার খুপড়ি ঘরে প্রবেশ করে। সাবিনা ছেলেকে বুকের মধ্যে নিয়ে আগামীকালের সোনারোদ সকালের অপেক্ষায় রাজ্যির সব শিশুতোষ গল্প এক এক করে ছেলেকে শোনাতে থাকল। রাতও যেনো মন দিয়ে ভোরের অপেক্ষায় সাবিনার ব্যাথা-বেদনার বাড়িতে নোঙর করল।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads






Loading...