ভূত ভিলা

নাজমুল হক ইমন

মানবকণ্ঠ
ভূত ভিলা - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৩৬

পাঁচটি কুকুর হঠাৎ বেশ ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যেন জরুরি কোনো কথা মনে পড়েছে। পরস্পরের সঙ্গে নিঃশব্দ দৃষ্টি বিনিময় করে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময় অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে সেই অন্ধ ভিখারি। এখন আর তাকে অন্ধ মনে হচ্ছে না। ইদ্রিসের প্যান্টের পকেট হাতড়ে ওয়ালেট, খুচরা টাকা বের করে নেয়। শার্টের বুক পকেটে পেয়ে যায় কাক্সিক্ষত বস্তুগুলো, গাড়ির চাবি আর সেলফোন। এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে মিশে যায়। ল্যাম্পপোস্টের ওপর বসে থাকা দাঁড় কাকটি বড় দুটি ডানা ঝাঁপটে পিছু নেয় তার।

 

(গত সংখ্যার পর)

আপেল নয়, যেন আস্ত একটা কাঁচা করলায় কামড় বসিয়েছে। এমন তিতা লাগছে। অথচ আপেল রনির খুব প্রিয়। শব্দ শুনে রান্নাঘর থেকে দৌঁড়ে আসে আমেনা। তার সামনেই কারপেট ভাসিয়ে দিয়ে হড়হড় করে বমি করে দেয় রনি। রনির বেডরুম ঘেঁসে যে ঝাকড়া আমগাছটি সেটার ডালে এতক্ষণ ধরে স্থির হয়ে বসে ছিল একটা বড় কালো দাঁড় কাক। কেউ তাকে লক্ষ্য করেনি। ঘরের ভেতর যখন আমেনা বুয়া রনিকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন দাঁড় কাকটি মাথা ঘুরিয়ে নিচে রাস্তার মোড়ের দিকে তাকায়। সেখানে বসে থাকা অন্ধ ভিখারিটিও মাথা উঁচু করে দাঁড়কাকটির দিকে নজর ফেরায়। নিঃশব্দে কিছু তথ্যের আদান-প্রদান চলে।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা লোকজনের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, এই মুহুর্তে একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনার প্রথম ধাপটি পূর্ণ হলো। খুব নজর দিয়ে লক্ষ্য করলে স্থানীয় বাসিন্দারা খেয়াল করত, কদিন ধরে একটি অন্ধ ভিখারি রনিদের বাসা থেকে একটু দূরে রাস্তার মোড়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকছে। ভিখারিকে কেউ সেভাবে নজর করে না, সে জন্যই এই ভিখারিটির স্বভাবের বিচিত্র দিকগুলো কেউই খেয়াল করেনি। যেমন সারাদিন রাস্তায় বসে থাকলেও এই ভিখারি কারো কাছেই ভিক্ষা চায়নি। সে অন্ধ, বোবা নয়। বোবা হলেও থালা নেড়ে ভিক্ষা চাওয়াটাই স্বাভাবিক।

কালো দাঁড় কাকটি গত সাতদিন ধরে আস্তানা গেড়েছে রনিদের আমগাছটিতে। সারাদিন কোনো শব্দ নেই, কাকা করে ডাকাডাকি নেই, শুধু এক দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে রনির বেডরুমের দিকে তাকিয়ে থাকা। এটাই ছিল তার কাজ। বড় দুটি ডানা ঝাপটে গাছের ডাল ছাড়ে দাঁড়কাকটি। ছেঁড়া কাপড়টি ফেলে উঠে দাঁড়ায় অন্ধ ভিখারি। আস্তে আস্তে হেঁটে চলে যায়। তার মাথার উপর উড়তে থাকে গড়পড়তা কাকগুলোর চেয়ে আকারে বেশ বড় একটি কুচকুচে কালো দাঁড়কাক।

দেখে মনে হয়, তাদের অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। এবার বাড়ি ফেরার পালা।

অন্য আরো একটা গল্প... গ্যারেজে গাড়ি ঢোকানোর মুহূর্তে বিপত্তি। কোত্থেকে একটা বেড়াল এসে দৌঁড়ে গাড়ির সামনে দিয়ে পার হলো। মনটা খারাপ হয়ে যায় ইদ্রিস মিয়ার। কিছু কিছু ব্যাপার সে কঠিনভাবে মেনে চলে। যেমন ওস্তাদের কাছ থেকে শেখা, গাড়ির সামনে দিয়ে বিড়াল পার হলে তা অয়ানক অশুভ লক্ষণ। যতক্ষণ না আরেকটা বিড়াল একইভাবে গাড়ির সামনে দিয়ে পার হচ্ছে, ততোক্ষণ গাড়ি চালানো নিরাপদ নয়। কিন্তু ইদ্রিস মিয়ার বিড়ালের অপেক্ষায় বসে থাকার সময় নাই। আলসারের রোগী সে। খালি পেটে থাকা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বাইরের খাবার খাওয়া ডাক্তারের কড়া নিষেধ। আর হোটেলের খাবার তার পেটেও সয়না। একজন ড্রাইভারের জন্য এটা বিরাট সমস্যা। পেটে আগুন জ্বলছে। জলদি গাড়ি গ্যারেজ করে বাড়ি ফিরে আগে ভাত রাধতে হবে, তারপর খাওয়া।

জিপিওর একজন কেরানির কোয়ার্টারে এক রুম নিয়ে সাবলেট থাকেন ইদ্রিস। বারান্দার এক চিলতে রান্না ঘরে বাড়িওয়ালার রান্না চলে, সেখানেই নিজের রান্না করেন ইদ্রিস। এই বাজারে ঢাকা শহরে পরিবার নিয়ে থাকা অসম্ভব। বউ-বাচ্চারা বাড়িতেই থাকে। মাসে-দুমাসে একবার গিয়ে তাদের দেখে আসেন, বউয়ের হাতে টাকা-পয়সা দিয়ে আসেন। এক চিলতে জমিতে যেটুকু ফসল হয় তা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে যায় ইদ্রিস পরিবারের। অলক্ষুণে বিড়ালটার কথা মনে করে ভেতরটা খচখচ করছে। গাড়ির দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরের লাইটটা নিভে যায়। অন্ধকারে ঘাড়ের চুলগুলো সব দাঁড়িয়ে যায়। তীব্রভাবে অনুভব করেন, অন্ধকারে কেউ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ্য করছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার বাতি জ্বালেন। কই, কোথাওতো কেউ নেই! তাহলে কী মনের ভুল? তাই বা হয় কী করে, এতো জীবন্ত, এতো তীব্রভাবে অনুভব করলেন! বেশি ভাববার সময় নেই। গাড়ি লক করে পা বাড়ান বাইরের দিকে। এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যায়। চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকান ইদ্রিস। ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিড়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যাক, আজ রাতে শান্তির ঘুম হবে। জিপিওর ফোর্থ ক্লাস কর্মীদের ঘুপচি কোয়ার্টারে গুমোট গরমে সারাটা রাত কেটে যায় গায়ের ঘাম মুছতে মুছতে। যখন বিদ্যুৎ থাকে না তখন তো কথাই নেই।

আর যখন থাকে তখন মাথার উপর শব্দ করে ফ্যানটা ঘুরে। এতে বাতাস না পাওয়া গেলেও ঘরে একটি ফ্যান আছে এবং সেটি ঘুরছে- এই মানষিক শান্তিটা পাওয়া যায়। তাই ভিজে যাওয়ার জোড়ালো আশঙ্কা স্বত্তে¡ও আসন্ন বৃষ্টির আশায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন ইদ্রিস। বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে থাকেন। বৃষ্টি আগে শুরু হয় ধুলি ঝড়। চারদিক ধুলোয় ঝাপসা হয়ে ওঠে। এই দুর্যোগের রাতে রাস্তা একেবারে সুনশান। ঝড়ের বেড় বাড়ছে। কড়াৎ শব্দে আশেপাশে কোথাও একটা গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে। এবার ছুটতে থাকেন ইদ্রিস। একটু পর থমকে দাঁড়ান। ঝুলোর মেঘ ফুঁড়ে যেন উদয় হয়েছে যন্তুগুলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার তিনটি কালো কুকুর দেখে বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে।

আবছা অন্ধকারে যেন পশুগুলোর চোখ জ্বলজ্বল করছে। তীক্ষ্ণ সাদা দাঁতগুলো আবছা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। প্রায় আধ হাত সমান বেরিয়ে থাকা জীবগুলো বেয়ে লালা ঝড়ছে। পুরো দৃশ্যটাতেই একটা কেমন গাগুলানো অশুভ ছায়া। শরীরের সবগুলো লোম দাঁড়িয়ে যায়। একপা-দুপা করে পেছাতে থাকেন ইদ্রিস। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গুটি গুটি পায়ে আগাতে থাকে জন্তুগুলো। নির্মম স্থির চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এ সময় পেছন থেকে গড়গড় শব্দ। আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে সম্বিত হারিয়ে ফেলেন ইদ্রিস।
পেছনে আরো দুটো এসে জুটেছে। পালাবার পথ নেই। সব বিবেচনাবোধ হারিয়ে হঠাৎ দৌঁড়ানো শুরু করেন ইদ্রিস মিয়া। কয়েক কদম যাওয়ার পরই চাপা গর্জন করে তার টুটি লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্বাপদগুলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইদ্রিস। গলা বেয়ে গলগল করে রক্তের ধারা নামতে থাকে। এ সময় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে। রক্তের ধারা ধুয়ে যায়।
পাঁচটি কুকুর হঠাৎ বেশ ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যেন জরুরি কোনো কথা মনে পড়েছে। পরস্পরের সঙ্গে নিঃশব্দ দৃষ্টি বিনিময় করে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময় অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে সেই অন্ধ ভিখারি। এখন আর তাকে অন্ধ মনে হচ্ছে না। ইদ্রিসের প্যান্টের পকেট হাতড়ে ওয়ালেট, খুচরা টাকা বের করে নেয়। সার্টের বুক পকেটে পেয়ে যায় কাঙ্খিত বস্তুগুলো, গাড়ির চাবি আর সেল ফোন। এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে মিশে যায়। ল্যাম্প পোস্টের ওপর বসে থাকা দাঁড় কাকটি বড় দুটি ডানা ঝাপটে পিছু নেয় তার।
রাতের ঝড়-বৃষ্টির বিন্দুমাত্র ছাপ নেই কোথাও। চারদিক আলো করে রোদ উঠেছে।

শুক্রবারের অলস সকাল। সবার মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব। রনিদের এই ফ্ল্যাট বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি হচ্ছে মাস্টার বেডরুম লাগোয়া বারান্দাটি। মা নানা জাতের গাছ টাছ লাগিয়ে এক্কেবারে দারুন সুন্দর করে তুলেছে। শুক্রবার সকালে এখানে বসে বড় একটা মগে কালো কফির সঙ্গে খবরের কাগজ পড়াটা ইফতেখার রহমান, মানে রনির বাবার ছুটির দিনের সবচেয়ে বড় বিনোদন। কিন্তু আজ এই বিদোনটা নিরবিচ্ছন্নভাবে উপভোগ করা হলো না। অনেকক্ষণ ধরে কে যেন বেল টিপছে। কেউ দরজা খুলছে না। অগত্যা নিজেকেই উঠতে হলো। অথচ ছুটির দিনে পুরো পেপারটাই খুটিয়ে পড়ার অভ্যাস ইফতেখারের। এর মধ্যে কোনো কারণে ওঠা পছন্দ করেন না। কিন্তু এভাবে বেল বাজতে থাকলে বসে থাকা যায়! একটু বিরক্তি নিয়েই দরজা খুলেন। সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে অচেনা এক লোক দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাতেই অপরিচিত লোকটি বলতে থাকে, স্যার, আমার নাম কিসমত। আপনাদের ড্রাইভার ইদ্রিস মিয়ার শালা। ভাগ্নিটার শরীল খারাপ। তাই দুলাভাই কাল রাতের গাড়িতে বাড়ি চইলা গেছে। আমারে বলছে কয়েকদিন ডিউটি দিতে। আমার লাইসেন্স আছে স্যার। এই যে- হড়বড় করে কথাগুলো বলে পকেট থেকে ড্রাইভার্স লাইসেন্স বের করে দেখায় কিসমত।

এবার একটু ভালো করে কিসমতের দিকে তাকান ইফতেখার। চিকন-চাকন গড়নের কিসমতের নাকের নিচে সরু গোফটা চেহারায় কেমন একটা চালাক চালাক ভাব ফুটিয়ে তুলেছে। বয়স খুব বেশি নয়, বড়জোর ২৬-২৭। কিসমতকে ভেতরে নিয়ে আসেন ইফতেখার রহমান। কতদিন ধরে গাড়ি চালাও।

তা স্যার পাঁচ-ছয় বছর। এর আগে কোথায় চাকরি করেছ?

স্যার চিটাগাংয়ে এক গার্মেন্টস মালিকের বাড়িতে কাজ করতাম। স্যার পুরা ফ্যামিলি নিয়া কানাডা চইলা গেছে। ঠিক আছে। নিচে গিয়ে বসো। একটু ভাবেন ইফতেখার, ইদ্রিস মিয়া একবার ফোনও করলো না। ঠিক সেই মুহুর্তে পাজামার পকেটে সেল ফোনটি কেঁপে উঠে। রাতের ঘুমটা নিরবিচ্ছিন্ন করতে মোবাইল ফোনের রিঙ্গার অফ করে ভাইব্রেশনে দিয়ে রাখেন ইফতেখার।

পকেট থেকে ফোন বের কনে কানে লাগান। ইদ্রিস মিয়ার ফোন।

হ্যালো, স্যার, ভোর সকালে শালা আইসা খবর দিল ছুডু মাইয়ার শরীল খারাপ। সক্কালের গাড়িতেই বাড়ি আইলাম। শুক্কুরবার ছুডির দিন বইলা আমনেরে ফুন দেই নাই। আমার শালা কিসমতরে রাইখা গেলাম। হেয়ও ডেরাইবারির কাম জানে।

ঠিক আছে ইদ্রিস, মেয়ের খবর জানিও।

মনের কোনে যাও একটু দুশ্চিন্তা ছিল, ইদ্রিসের ফোনটি পেয়ে সেটা কেটে গেল। দ্বিতীয় মগ কঠি নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ইংরেজি দৈনিকটা খুলে বসেন।

ফোনের অপর প্রান্তে কী ঘটছে সেটি যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতেন ইফতেখার সাহেব তাহলে এক্ষুনি একটা ছোটখাট হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত। কথা বলা শেষে মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে পকেটে রাখে সেই অন্ধ ভিখারি। কাল রাতে ইদ্রিস মিয়ার মৃতদেহের পকেট থেকে এটা বের করে নিয়ে ছিল। যন্ত্রটা এখন বেশ কাজে দিল। এটাকে যত্ন করে রাখতে হবে। এতোদিন ধরে ইফতেখার সাহেবের একটু পরেই এই ফোন থেকেই ইদ্রিস মিয়ার কণ্ঠ নকল করে তার বাড়িতে ফোন করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে দেবে, এ তথ্যটি জানিয়ে ইদ্রিসের স্ত্রীকে নিশ্চিন্ত করে। যাক, দুই দিকই ঠিক আছে। এখন ইদ্রিসের নকল শালা কিসমত ধরা পড়ার আগেই ভালোয় ভালোয় কজটা শেষ করতে হবে। নিজের মনেই হেসে উঠে বহুরূপী অন্ধ ভিখারি। তার কাঁধে বসা দাঁড় কাকটাও কর্কস স্বরে ডেকে উঠে যেন সেও মালিকের সঙ্গে হাসিতে যোগ দিল। (চলবে...)

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads






Loading...