বিড়াল ছানার মুক্তিযুদ্ধ

মনিরা মিতা

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৩:০৬,  আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৩:১৪

টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। সে শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাতে চেষ্টা করছে তনু। মনটা ভালো নেই তার। বাড়ির পরিবেশ থমথমে। ভাই তার যুদ্ধে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে। বাবা-মা-দাদি সবাই মুখভার করে থাকে। তনুর কিছু ভালো লাগে না।

বৃষ্টি থেমে গেছে। চারিপাশ নিস্তব্দ। শুধু ব্যাঙের ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ ডাক শোনে যাচ্ছে। তনু আজ দাদির কাছে শুয়েছে। তবুও তনু জানালা-দরজায় খিল দিয়ে শুয়েছে। অন্ধকার বড় ভয় পায় সে।

বাইরে শো শো বাতাস বইছে। তনুর কেমন যেন ভয় ভয় করছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে চলছে। এমন সময় মিঞ মিঞ ডাক শুনতে পায় তনু।
হ্যাঁ, এটা একটা বিড়াল ছানার ডাক। এতো রাতে জানালার পাশে বিড়াল ছানা কোথা থেকে এলো? তনু চোখ বন্ধ করে খিটিমিটি দিয়ে শুয়ে রইল। একটু পর আবার মিঞ মিঞ ডাক। একেবারে তনুর জানালার কাছ থেকে আসছে সে ডাক।

তনু আস্তে আস্তে জানালার পাশে যায়। বুকটা ধুকপুক করছে। তবুও মন চাইছে জানালা খুলে দেখতে। তনু জানালা খুলে দিল। চারদিকে অন্ধকার। তনু নিচের দিকে তাকিয়ে বিড়াল ছানার খোঁজ করছে। মনে মনে বিড়ালটার জন্য মায়া হচ্ছে ওর। এই ঝড়ের রাতে বিড়াল ছানাটা বাইরে। জোরে জোরে বাতাস বইছে। আহারে! ছানাটার মনে হয় কষ্ট হচ্ছে। তনু মনে মনে ভাবে বিড়াল ছানাটার দেখা পেলে ওকে ঘরে নিয়ে আসবে। এই ভাবনা থেকে তনু জানালাটা খোলা রাখে। বিড়াল ছানাটা যেন জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারে।

বেশ অনেকটা সময় পার হলো। বিড়াল ছানার ডাক শোনা যাচ্ছে না। জানালা দিয়ে ঘরেও আসেনি। তনু ভাবলো হয়তো অন্য কোথাও ছানাটা চলে গেছে। তনু জানালার খিড়কি লাগাতে গেল। ওমনি বিড়াল ছানা মিঞ করে উঠল। তনু এবার ভালো করে খুঁজতে লাগল।

এরপর হঠাৎ ভূত দেখার মতো চমকে উঠল তনু। এটা কোন বিড়াল ছানার ডাক না। একটা ছেলে ওমন করে মিঞ মিঞ করে ডাকছে!
ভয়ে তনু জড়োসড়ো হয়ে গেল। জানালা বন্ধ করতে যাবে ঠিক তখনই ছেলেটা কথা বলল। জানালাটা বন্ধ করো না বুবু।

‘বুবু’ ডাকটা থামিয়ে দিল তনুর হাত। তনুর বয়স এগারো বছর। কেউ কখনও তাকে ‘বুবু’ বলে ডাকেনি। মা-বাবা আদর করে বুড়ি বলে ডাকে। ভাই আদর করে ছোটন বলে ডাকে। কিন্তু এই প্রথম কেউ বুবু বলে ডাকলো তনুকে। ছেলেটার বয়স ৭/৮ বছর হবে। অন্ধকারে ওর মুখটা ঠিকমতো দেখতে পারছে না তনু।

তনু ধীরে ধীরে জানালার পাশে মুখ লাগিয়ে দাঁড়ালো। তনু ওকে বললো তোমার নামকি? তুমি এখানে কেন এতরাতে? ছেলেটা বললো আমি বিড়াল ছানা। এতরাতে এলাকা পাহারা দেই বুবু। ওর নাম ‘বিড়াল ছানা’ শুনে খিলখিল করে হেসে ওঠে তনু। মানুষের নাম কখনও বিড়াল ছানা হয় বুঝি! তনুর চোখে বিষ্ময়। আর তুমি এলাকা পাহারা দিচ্ছ কি করে? আর কেনই বা দিচ্ছ?

বিড়াল ছানা কিছুক্ষণ চুপ কর রইল। তারপর ফিসফিস করে বললো আমি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বুবু। আমি তোমাদের এলাকা পাহারা দিচ্ছি। সামনের ওই জঙ্গলে আমাদের ঘাঁটি। ওখানে বড় মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে। সামনের নদীর পাড়ে পাকসেনারা অবস্থান করছে। ওরা যেকোন মুহূর্তে তোমাদের গ্রামে ঢুকে পারবে। একবার গ্রামে পৌঁছালেই ওরা গ্রামটা জ্বালিয়ে দেবে। আমি চুপিচুপি নদী সাঁতরে ওপারে গিয়েছিলাম।ওদের ঘাট পার হবার নৌকার দঁড়ি খুলে দিয়েছি। নৌকা না পেয়ে ওরা গ্রামে আসতে পারবে না। তবুও আমি পাহারায় আছি। যদি পাকসেনারা গ্রামে ঢুকে দৌঁড়ে গিয়ে আমাদের ক্যাম্পে খরব দেব। এজন্যই মিঞ মিঞ করে ডাকছি। আমর মিঞ ডাকের অর্থ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা জানে। এর অর্থ হচ্ছে অবস্থা এখনো শান্ত আছে। পাকসেনারা গ্রামে পৌঁছাতে পারে নাই।

অনু অবাক হযে বিড়াল ছানার কথা শুনচ্ছিল। এতটুকুন একটা ছেলে এতো বড় কাজ করছো! তনুর ছোট মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। তনু হাত বাড়িয়ে বিড়াল ছানার এলোমেলো চুলে আদর করে দেয়। ঠিক এই মুহূর্তে তনুর নিজেকে বিড়াল ছানার বুবু মনে হচ্ছে। এমন বিড়াল ছানার জন্য গর্ব হচ্ছে তনুর। বিড়াল ছানা বলে ‘বুবু এক গ্লাস পানি খাওয়াবে?’ তনু দৌঁড়ে রান্না করে যায়। চিনিগুলো এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। বিড়াল ছানা পানি খেয়ে খুব খুশি হয়। মুখে একটা মিষ্টি হাসি টেনে বলে ‘বুবু তোমার হাতের পানি খুব মিষ্টি।’

আমার একটা মা ছিল বুবু। খুব ভালোবাসতো আমাকে। পাকসেনারা আমার মাকে কোথায় যেন নিয়ে গেল। আর খুঁজে পাই নাই। আমার মাও তোমার মতো মিষ্টি পানি দিত আমাকে। কখনও যদি আমার মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হয় তাকে বলো”তার বিড়াল ছানা তার অপেক্ষায় আছে।
এবার তাহলে যাই বুবু। আমার অনেক কাজ বাকি আছে বুবু। আমার মিঞ মিঞ ডাক না শুনতে পেলে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা অস্থির হয়ে উঠবে। ভোরে আমরা নদীর পাড়ে অপরেশনে যাব। পাকসেনাদের ধ্বংস করব।

তনু বলে অপারেশন কেমন হলো কাল এসে কিন্তু বলবে আমাকে। বিড়াল ছানা বলে জানাব বুবু আর তোমার হাতের মিষ্টি পানি খেয়ে যাব। এই বলে মিঞ মিঞ ডাকাত ডাকতে চলে যায় বিড়াল ছানা। তনু তাকিয়ে আছে ওর চলে যাওয়া পথের দিকে।

সকাল থেকেই তনুর মনটা খুব অস্থির। মনের ভেতর সারাক্ষণ বিড়াল ছানার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোরে কি হয়েছে নদীর পাড়ে? মুক্তিযোদ্ধারা কি পেরেছে পাকসেনাদের মারতে? এসব প্রশ্ন তনুর মনে ঘুরপাক খায়।

তনু রাত হওয়ার অপেক্ষা করে।

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তনুর চোখে ঘুম নেই। এখনো কেন বিড়াল ছানা আসছে না? অনেক চিন্তা ঘিরে ধরে ছোট তনুকে। সে বারেবারে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। জানালা খুলে বাইরে উঁকি দেয়। তারপর অপেক্ষা করতে করতে জানালার পাশেই ঘুমিয়ে পরে।

সকালবেলা মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে তনুর। মা চুপিচুপি বলে তনু ওঠ, তোর ভাই এসেছে। ভাই এসেছে শুনে এক লাফে উঠে পড়ে তনু। কত দিন ভাইকে দেখে না তনু! দৌঁড়ে গিয়ে ভাইয়ের কোলে বসে। ভাই তনুকে অনেক আদর করে। তনুর ভাই বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না। তাকে চলে যেতে হবে।
মুক্তিযোদ্ধাদের যে অনেক কাজ বাকি। তনুর ভাই বলে গত পরশু রাতে নদীর পাড়ে একটা অপরেশনে করতে তারা গ্রামে ঢুকেছিল। এটা শুনে তনুর বুকটা ধাক্কা দিয়ে ওঠে। এই অপারেশনের কথাই তো বিড়ার ছানা বলেছিল। তাহলে ভাইয়ের কাছেই বিড়াল ছানার কথা জানা যাবে। তনু ভাইকে বলে ‘অপারেশন কেমন হলো?’ ভাই বলে খুব ভালো। আমরা সব পাকসেনাদের মারতে পেরেছি। আমাদের কেউ মারা যায়নি। শুধু একটা বিড়াল ছানা মারা গেছে।

বিড়াল ছানা মারা গেছে! তনুর মাথাটা ঘুরতে থাকে। চোখের সামনে বিড়াল ছানার মুখটা ভেসে ওঠে। ও বলেছিল আবার আসবে। তনুর হাতের মিষ্টি পানি খাবে। কিন্তু বিড়াল ছানা আকাশের তারা হয়ে গেল। তনুর দুচোখ ভেঙে কান্না বেয়ে পরে। বিড়াল ছানার মিঞ মিঞ ডাক কানে বাজতে থাকে তনুর। ছোট তনুর মনটা মমতায় ভরে যায়। তনু দৌঁড়ে জানালার কাছে আসে। যে জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল বিড়াল ছানা। জানালা দিয়ে সকালের সোনা রোদে ভরে যায় তনুর ঘর। সে রোদ তনুর কানে কানে বলে যায় বিড়াল ছানা মরে নাই। একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনও মরে না। বেঁচে থাকে মানুষের মনে।

মানবকণ্ঠ/জেএস





ads






Loading...