ছোটগল্প

আলো-অন্ধকারে মাছ এবং মানুষেরা

মোহাম্মাদ জাকারিয়া

মানবকণ্ঠ
মোহাম্মাদ জাকারিয়া - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৬

সময়কাল সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত। শহরে যদিও দিনের আলো ফুরানোর এবং রাতের অন্ধকার শুরু হওয়ার মাঝামাঝি কাল ঠিক বোঝা যায় না; আলাদা করা যায় না—তবুও, যেহেতু চৈত্রমাস, আকাশটা পরিষ্কার। গ্রামদেশে কিংবা ফাঁকা জায়গায় বেলা তলিয়ে গেলেও দিনের আলোর রেশ কিছুক্ষণ দেখা যায়। গ্রাম এবং শহরের মধ্যে নানা পার্থক্য থাকলেও একটা জায়গায় মিল, তা হলোঃ দু’জায়গার আকাশ একই, তবে কখনো কখনো রঙে ভিন্ন।

ব্যস্ত ঢাকা শহরের তিন রাস্তার মোড়ে সব মিলিয়ে জনাদশেক মানুষের জটলার সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকে ডানদিকে হাতে মাপলে চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ দূরে একটা পুলিশ ভ্যান দেখা যাচ্ছে। বামদিকে বিশ হাত দূরে সাদা কাপড় বিছিয়ে একজন জাদুকর বসে আছেন। জনাদশেক মানুষের জটলার কাছে গিয়ে দেখা গেলঃ দুজন মানুষ একটি বাঁশের ঝাঁকায় করে বড় দুটো মাছ এনে বিক্রির জন্য এই তিন রাস্তার মোড় বেছে নিয়েছে। চিতল মাছ। বড়। প্রায় তিন হাত লম্বা। এই মাছ দুটো বাজারের মাছ থেকে আলাদা। আকারে, রঙে। তাই মাছ দু’টোর প্রতি সন্মানসূচক বড় কস্তুরি পাতা দিয়ে বিছানা বানানো হয়েছে। গাঢ় সবুজ রঙের কলাপাতার ভেতরে রুপোলী চিতল মাছ। জনাদশেক মানুষের দৃষ্টি মাছের দিকে। এ মাছ যে-সে মাছ নয়; যেন এ মাছের এক টুকরো যার পেটে যাবে তার কয়েকদিন না খেলেও চলবে। ভালো করে খেয়াল করে বোঝা গেলঃ এখানে রিকশাচালক আছেন, ভাঙারির দোকানে কাজ করা আছেন, ছোটখাটো চাকরি করা দু’জন আছেন, ছাত্র গোছের একজন আছেন। আরো দু’চারজনকে দেখা যাচ্ছে যাদের দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না তাদের পেশা কী? তবে কোট-টাই পরা একেবারে স্যুটেড-বুটেড একজনকে দেখা যাচ্ছে। টাক মাথা, তবে, টুক টাক। কায়দা করে চুল আঁচড়ে অনাবৃত অংশটুকু ঢেকে রেখেছেন। কিন্তু টাক মাথা আর টাকা এ দুটো নাকি ঢেকে রাখা যায় না। চোখে গোল কালো চশমা। এদের সবারই চোখ মাছের দিকে। রিকশাওয়ালার মন খুব করে চাচ্ছে–মাছটার দাম জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু, কোট-টাই পরা লোকের সামনে সে মাছের দাম জিজ্ঞেস করতে পারছে না। হাজার হলেও এ বাংলায় কোট-টাইয়ের একটা মূল্য বা মর্যাদা আছে।

ভদ্রলোক একটু ঝুঁকে মাছের দিকে তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে মাছ বিক্রেতা একজন বলে উঠল, ‘স্যার বিলের মাছ, গেরান্টি দিয়া বেচমু। ঠগবেন না। উপরে আল্লা, নিচে মাটি।'
মাছ ওয়ালার মুখে এমন ভরসাময় কথা শুনে ভদ্রলোক আরো একটু স্বস্তি পেলেন।

রিকশার সিটের উপর বসা রিকশাওয়ালা এবার আর চুপ থাকতে পারল না, বলল, ‘কত পইড়বো, বেচা দাম কও।' মাছওয়ালা মুখে কিছু বলল না। তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল যে, 'তুই চালাস রিকশা,ব্যাটা তুই কি এই মাছ কিনবার পারবি? ইহজনমেও না।'

ছোটখাটো চাকরি করা দুজন, ভাঙারিওয়ালা এবং অন্যান্যরা রিকশাওয়ালা দাম জিজ্ঞেস করাতে নড়েচড়ে উঠেছিল। কারণ সকলেরই মনের ভেতরে আঁকুপাঁকু করা প্রশ্নটাই বা মনের কথাটাই রিকশাওয়ালা বলেছিল বলে। এ মাছের দাম জিজ্ঞেস করা সাহসের ব্যাপার, যা সবার থাকে না। মাছ বিক্রেতা চাচ্ছে কোট-টাই পরা ভদ্রলোক নিজমুখে দাম জানতে চাইলেই কেবল সে দাম বলবে। কিন্তু ঐ ভদ্রলোকও দাম জিজ্ঞেস করছে না। কেবল মাছের দিকে তাকায় এবং আশেপাশে তাকায়। ভদ্রলোকের মন মাছে আটকে আছে। এমন মাছ বাসায় নিয়ে গিন্নীকে একটা সারপ্রাইজ দেয়া যাবে। দাম তার কাছে কোন বিষয়ই না। পকেট ভর্তি টাকা। না, এবার আর উত্তেজিত জনতাকে আটকে রাখা যাচ্ছে না। মাছ বিক্রেতা বলে বসল, ‘দামাদামি কইরলে এক পিস তিন আজার, না কইরলে আড়াই আজার।'

ভদ্রলোক বাদে চুপি চুপি সবাই যার যার পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিজ নিজ পকেটের অবস্থা জেনে নিল। কেবল রিকশাওয়ালা লুঙ্গির ভাঁজে কিংবা বোতাম খোলা শার্টের বুক পকেটে হাত রাখল না। কমদামি একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটে ধরল। এবং সিগারেটের ধোঁয়া সে ঠোঁটের কোনাকুনি জায়গা দিয়ে না ছেড়ে, ফুঁ দেওয়ার মতো করে ছাড়ল। ইট-ভাটার চিমনির মতো ধোঁয়া বের হলো তার মুখ থেকে। দিনের আলো একেবারে ফুরিয়ে না গেলেও মাথার উপরে থাকা শহুরে বাতি জ্বলে উঠল।

সাত-আট বছর বয়সী বালককে কোলে নিয়ে যাচ্ছিলেন এক মা। জটলা দেখে থামলেন। জটলার ফাঁক দিয়ে মাছ দু’টো দেখলেন। কোলের বালক তার মাকে বলল, 'মা, এই মাছটা কিনা লও। খাইতে স্বাদ লাগবো। প্যাট ভইরা ভাত খামু। তুমি তো খালি কও—আমি ভাত মুহে দেই না, খালি চিপস-চানাচুর আর হাবিজাবি খাই। এই মাছটা লও, খালি ভাতই খামু। হাবিজাবি কিছু খামু না। কাদের কাকার দোকানে আর যামু না।'
ছেলের কথা শুনে মা আর কিছু বললেন না। হেঁটে চলে যাচ্ছিলেন। কোল থেকে নেমে বাচ্চাটা রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল। কোন স্বান্তনা দিয়েই কাজ হচ্ছিল না দেখে শেষমেষ সামনে থাকা পুলিশের গাড়ি দেখিয়ে বালককে শান্ত করতে পারলেন। পুলিশের সদস্য মোবাইলে গান ছেড়েছে 'গোলে গোলে মুখরাতে কালা কালা চশমা'।

রিকশাওয়ালা সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ভদ্রলোক এখনো মাছের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিনছেনও না আবার চলেও যাচ্ছেন না। ভাঙারিওয়ালা বলল, ‘এক হাজার ট্যাকা দিমু। দিলে দ্যান, এক পিস লইয়া যাই।'

মাছ বিক্রেতা কিছু বলল না। ভাঙারিওয়ালাকে গোনায় ধরল না। তবে ‘এক হাজার ট্যাকা’—এটা উপস্থিত প্রায় সকলের মনের কথা। দাম। এই পানির দামে যদিও মাছ বিক্রি করবে না তবুও রিকশাওয়ালা ভাঙারিওয়ালার কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘ভাই দিয়া দ্যান গা। কম কয় নাই।' মাছওয়ালা এবার তাকেও গোনায় ধরল না। ভদ্রলোক এবার কয়েক কদম পেছালেন। পিছন দিকে হাঁটা ধরলেন। এবার উপস্থিত জনতা মাছটাকে একটু নিজের মনে করে দেখতে লাগল।

ভাঙারিওয়ালা বলল, 'কী গো ভাই, মাছটা দিলেন না?'

মাছওয়ালা বলল, এই দামে পুঁটিমাছ পাওয়া যায়। বাজারে গিয়া পুঁটিমাছ কিন্না লইয়া বাসায় যাও। কামে দিবো।'
ভিড়ের মধ্য থেকে এবার ছাত্র বলে উঠল, ‘এতো দামে তুমি এই মাছ বিক্রি করতে পারবে না।'

মাছওয়ালা এ কথা শুনে মনে মনে একটু ধাক্কা খেল। কিন্তু পরক্ষণেই কোট-টাই পরা ভদ্রলোককে দেখতে পেয়ে আবার সাহস ফিরে পেল। ভিড়ের মধ্যে ভদ্রলোককে দেখে বোঝা যাচ্ছে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দের মধ্যে আছেন। মাছটা কিনতেও ইচ্ছে করছে, আবার কোন এক কারণে তিনি মাছটা কিনতে পারছেন না। তার পকেট ভর্তি টাকা। টাকা কোন বিষয়ই না। ভদ্রলোক চিন্তায় পড়ে মাথার চুলে হাত বোলাচ্ছেন। কী করবেন তিনি?

এরই ফাঁকে চলতি পথের কেউ কেউ জটলার ফাঁক দিয়ে মাছকে দেখে গেল। কেউ বড়জোর মাছটার দাম জিজ্ঞেস করল। এমন মাছ তারা কিনতে না পারলেও, দাম জানাটাও তাদের কাছে কাজের কাজ। অন্তত বাসায় গিয়ে এ মাছ নিয়ে গল্প করতে পারবে—দেখে এলাম এক মানুষ সমান এক মাছ... এ তো যে-সে মাছ নয়। বিগ ফিশ।

যেহেতু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, মাছ বিক্রি হচ্ছে না। উপস্থিত প্রায় সকলেই মাছ কেনার সামর্থ্য রাখে না। তাই সকলেই কোট-টাই পরা ভদ্রলোকের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। রিকশাওয়ালা সিটের উপর পা তুলে শরীর যাত্রী-সিটের উপর এলিয়ে দিয়ে বলল, ‘লাভ নাই, লাভ নাই। এই মাছ হে কিনবার পাইরবো না।'

ভিড়ের মধ্য থেকে ছাত্র রিকশাওয়ালাকে বলল, ‘ আপনি কিনতে পারবেন?’

রিকশাওয়ালা মুখে কিছু বলল না। খ্যাক খ্যাক করে হাসল। সামনে থাকা পুলিশ ভ্যানের পেছনের লাল-বাতি জ্বলে উঠল। এটা অবশ্য উপস্থিত কেউ খেয়াল করল না। ছাত্র এবার ভদ্রলোককে বলল, 'আংকেল, আপনিই এই মাছটা নিয়ে যান। বাসায় খুশি হবে। আপনি ছাড়া এ মাছ কেনার মতো কেউ নাই। তাছাড়া মাছটাও খুব ভালো। তাজা মাছ।'

ভদ্রলোক সবই বুঝতে পারছেন। কিন্তু তার ভয় তো কেবল পুলিশের ভ্যান দেখে। ভদ্রলোক ভাবছেনঃ পুলিশের লোক হয়ত টোপ হিসেবে এই মাছওয়ালা দুজনকে এখানে বসিয়েছে। এ মাছ যে কিনবে তাকে একটু বাজিয়ে দেখার জন্য। আর তাতে যদি ভদ্রলোক ধরা খেয়ে যান। চোরের মন পুলিশ পুলিশ।

এই মাছওয়ালাদের সাথে পুলিশ ভ্যানের কোন সম্পর্ক ছিল না। পুলিশ সদস্যরা এসেছিল নিত্যদিনের মতো ডিউটি পালন করতেই। মাছ হাতে নিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খাওয়ার চাইতে খালি হাতে যাওয়াই ভালো। ভদ্রলোকের দশা বুঝতে পেরে মাছওয়ালা বলল, ‘স্যার, আমাগো কাছে ব্যাগ আছে। কেউ টের পাইবো না। ব্যাগে ভইরা দেই?’

রিকশাওয়ালা সিটের উপর বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। উপরে আল্লাহ, নিচে মাটি—বলে যাত্রী-সিট গামছা দিয়ে ঝেড়ে মুছে খালি রিকশা ঝড়ো গতিতে টান দিল। দিনের আলো ফুরিয়ে কখন রাতের আলোয় শহর ভরে গিয়েছে তা উপস্থিত জনতা টের পেল না।

রাস্তার পাশে সাদা কাপড় বিছিয়ে জাদুকর বসে আছেন। উপস্থিত জনতা সেখানে ভিড় জমালে জাদুকর তার হ্যাট খুলে আবার ফুঁ দিয়ে মাথায় দিয়ে বললেন, 'খেলা শেষ। জাদুর খেলা শেষ। আজ আর কোনো খেলা দেখানো হবে না। যার যার বাড়ি গিয়া চ দিয়া মুড়ি খান। চ-তে চানাচুর। চানাচুর দিয়া মুড়ি খান। যান। কী মিয়ারা যান না ক্যা?'
উপস্থিত জনতা তবুও আশায় দাঁড়িয়ে রইল, জাদুকরের একটি জাদু দেখার আশায়। জাদুকর বাঁশি হাতে নিয়ে করুণ সুর তুললেন। এরপর বললেন, 'ঢাকার কোন চুলায় কী রান্না হয়, কোন চুলা জ্বলে আর কোন চুলা না জ্বলে জলে মানে পানিতে ভেসে যায় তা কি বলতে পারবেন? পারবেন? যদি পারেন তাইলে আমি জাদুর খেলা দেখাবো।'

উপস্থিত জনতা ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে যে-যার বাড়ি ফিরে গেলে, আদরের ছেলে বা মেয়ে যখন জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করল, 'বাবা কী আনছো আমার লেইগা?'
তখন বাবা বলল,'কিছু আনি নাই। একটা গল্প আনছি লগে।'
'ঠিক আছে তাইলে ঐ গল্প শোনাও।'
এরপর বাবা বলল, 'দেইখা আইলাম এক মানুষ সমান মাছ... '
'কও কী ! এতো বড় মাছ দেহা তো ভাগ্যের ব্যাপার। বাবা, তুমি যে কত বড় ভাগ্যবান তা কি তুমি বুঝতে পারতেছো?'

তখন ঢাকা শহরে দিন না রাত তা—বোঝা গেল না।

লেখক- মোহাম্মাদ জাকারিয়া : চিত্রনির্মাতা ও সাহিত্যিক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...