ছোটগল্প

কাকতাড়ুয়া

আবুল কালাম আজাদ

মানবকণ্ঠ
কাকতাড়ুয়া - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ১১:০৪,  আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ১১:২২

মোহন আর মোহনা। দুই ভাইবোন। মোহন বড়। মোহনা ছোট। মোহন পড়ে ক্লাস ফোরে। আর মোহনা ক্লাস টুতে। ওরা ভালো বন্ধুও।
স্কুল ছুটি বলে ওরা গ্রামে মামাবাড়ি বেড়াতে এসেছে। সবুজ ফসলের মাঠ। ঘাসে ঢাকা আলপথ। নদীর পার। সবই ওদের ভালো লাগে।

গ্রামে মোহন আর মোহনার প্রিয় বন্ধু মজনু মামা।
ওদের মামা বাড়ির কাজের সহায়ক যুবক মজনু। কিশোর বয়স থেকেই সে মোহন আর মোহনার মামাবাড়িতে আছে। ওদের মামা বাড়ির একজন সদস্য হয়ে গেছে সে। মোহন-মোহনার নানা-নানু তাকে নিজের ছেলের মতো দেখেন। মজনুও সবাইকে আপন করে নিয়েছে।
মজনু মামার সঙ্গে বিকেলে ওরা বেড়াতে বের হয়েছে। খেতের মাঝখানে কি একটা দাঁড়িয়ে আছে। বড় একটা মাথা। কালো। মাথার ওপর সাদা চোখ। বড় সাদা হাঁ। পরনে বড় জামা। পা দেখা যায় না। কোনো কোনোটার হাতে একটা লাঠি।
মোহনা বলে: ওটা কী?
মজনু মামা বলে: ওটা কাকতড়ুয়া।
: ওটা কী করে?
: ওটা কাক আর অন্যান্য পাখি তাড়ায়।
: তাড়ায় কেন?
: পাখিরা ফসল খায় তাই...।
মোহন বলে : ওরা তো কথা বলতে পারে না। তাহলে কাক তাড়ায় কীভাবে?
: কথা বলা লাগে না। দেখো না ওগো চেহারা। ওগো চেহারা দেখলেই কাক আর সব পাখির বুক ধড়ফড় শুরু হয়া যায়।
: ওরা তো হাঁটতে পারে না?
: ওগো যা কাজ তা যদি খাড়ায়া খাড়ায়া করতে পারে তো হাঁটতে যাওয়ার দরকার কী?
: ওদের গায়ের জামার এমন ছেঁড়া কেন?
: ওরা কি তুমাগো মতো ঢাকার শহরে থাকে যে ফুল বাবু হয়া থাকব? ক্ষেতের মধ্যে ছেঁড়া জামা পইরা থাকাই ভালো।
মোহন আর মোহনা প্রতি বিকেলেই মজনু মামার সঙ্গে কাকতাড়–য়া দেখতে বের হয়। ঘুরে ঘুরে কাকতাড়–য়া দেখে আর নানা প্রশ্ন করে। মজনু মামা কখনো রসালো আবার কখনও নিরলসভাবে জবাব দেয়।

তিন চারদিন কাকতাড়ুয়া দেখার পর মজনু মামা বলে: গ্রামে দেখার মতো আরও কত কিছু আছে! নদীর ধারে কত রকমের ফুল, কাশবন। ছেলেপেলে কত্ত রকম খেলাধুলা করে। সামনে বাজারে কত্ত মজা! তোমরা আছো শুধু কাকতাড়ুয়া দেখার তালে। এইটা দেখার কিছু হইল?
মোহনা বলে: কাকতাড়ুয়া আমাদের ভালো লাগে।
: কাকতাড়–য়ার মধ্যে ভালো লাগার কী আছে? বিশ্রী চেহারা। থ্যাবড়ানো নাক। মুখ দেখলে মেজাজ খারাপ হয়েছে।
: তোমার মতো চেহারা।
: এইটা কোনো কথা বললা? আমার চেহারা ঐরকম? তোমাগো মাজেদা খালার কাছে জিজ্ঞাস কইরো আমার চেহারা কেমুন।
মাজেদা মোহন আর মোহনার নানুর কাজের সহায়ক মেয়ে। সেও খুব ভালো।
মোহন বলে: মাজেদা খালাকে জিজ্ঞেস করলে সে কী বলবে?
: বলবে, আমার চেহারা নায়ক রাজ রাজ্জাকের মতো।
: হিহিহিহি। মোহন আর মোহনা হেসে উঠে। ওদের হাসি আর থামে না। মজনু মামা রাগ করে বলে: হাসার কী হইলো? হাসার কী হইলো অ্যা?

এক বিকেলে ওরা মজনু মামাকে পায় না। ঘুরতে যাবে কিন্তু মজনু মামার খবর নেই। ওরা মাজেদা খালাকে জিজ্ঞেস করল। মাজেদা খালা বলল: তার খবর আমার কাছে কী? তারে আমি দুই চক্ষে দেখতে পারি না।
মোহন বলল: তাকে নাকি আপনি নায়ক রাজ রাজ্জাক বলেন?
: ছে! কাকতাড়ুয়ার মতো থ্যাবড়াইন্যা নাক, গোল্লা গোল্লা চোখ। হেয় আবার নায়ক রাজ রাজ্জাক? নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তায় চলেছি একা.....ঐ সবুজের শ্যামল মায়ায় দৃষ্টি পড়েছে ঢাকা...। কাকতাড়ুয়া মজনু কি এমন গাইতে পারবো?
: হিহিহিহি। মেহন আর মোহনা এক সঙ্গে হেসে উঠে।
মোহন বলল: চল, আমরা দু’জনই বেড়াতে যাব।
: দু’জন! যদি কোনো সমস্য হয়?
: সমস্যা কী হবে? এটা কি ঢাকা শহর যে গাড়ি এসে গায়ে উঠবে? আলপথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাব, আবার সেই আলপথ দিয়েই ফিরে আসবো।
: যদি কাকতাড়ুয়া কিছু বলে?
: আরে ধুর! দেখিস না কাকতাড়ুয়া কেমন নড়ে না, চড়ে না। ওরা কী বলবে? হাঁটতেও তো পারে না।
: হাতে যে লাঠি!
: লাঠি থাকলে কী হবে? লাঠি তো নাড়তেই পারে না।
: আচ্ছা চলো।

একটু এগিয়েই কুমড়োর মাচার পাশে বড় এক কাকতাড়ুয়া। মোহন আর মোহনা খুব অবাক হল। আগেরদিনও ওরা এখানে কোনো কাকতাড়ুয়া দেখেনি। কাকতাড়ুয়ার হাতে একটা লাঠি। আস্তে আস্তে লাঠিটা নাড়ছে। কাকতাড়ুয়া লাঠি নাড়ে কেমন করে? এই কাকতাড়ুয়াটা অন্যসব কাকতাড়ুয়া থেকে কিছুটা ভিন্ন। বেশি লম্বা। বেশি মোটা। পা মনে হচ্ছে দুইটা। মাটি পর্যন্ত লুঙ্গিতে পা ঢাকা। পোশাক বেশ পরিচ্ছন্ন। অন্যসব কাকতাড়ুয়াদের পোশাক সাধারণত ময়লা।

মোহন বলল: কি হে, কাক-টাক ঠিকমতো তাড়াতে পারো তো?
: পারি না আবার! লাঠিটা কিভাবে নাড়াচ্ছি দেখছো না? কোনো কাক কাছে এলেই ঠ্যাং ভাইঙ্গা হাতে ধরায়া দিমু।
এ কথা শুনেই মোহন আর মোহনা লাফ দিয়ে কয়েক হাত পিছিয়ে গেল। কাকতাড়ুয়া কথা বলে এটা ওরা ভাবতে পারছে না। ওরা কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। কাকতাড়ুয়া আবার বলল: সারা বছর খবর নাই, এখন এসেছে কাক তাড়াতে পারি কি না তা জানতে।
মোহনা থরথর করে কাঁপছিল। কাঁপতে কাঁপতে বলল: সারা বছর তো লেখাপড়ার ঝামেলা থাকে। পরীক্ষা থাকে। কোচিং, প্রাইভেট...।
: বাচ্চাদের এত লেখাপড়ার ঝামেলা থাকবে ক্যান? বাচ্চাদের এত পরীক্ষা থাকবে ক্যান? কোচিং থাকবে ক্যান? প্রাইভেট থাকবে ক্যান? জবাব চাই। জবাব চাই। বাচ্চারা আনন্দে থাকবে। খেলবে। হাসবে। বেড়াবে। মজা করবে।
: তা আমরা কি জানি? আমাদের তো কিছু করার নেই।
: হ, তুমাগো তো কিছু করার নাই।
মোহন সাহসী ছেলে। বলল: কাকতাড়ুয়াটার কণ্ঠ কিন্তু মজনুমামার কণ্ঠের মতো।
মোহনা বলল: ধুর! আবোল-তাবোল বকো না।
: আবোল-তাবোল না। আমার তাই মনে হচ্ছে। ওর জামা ধরে একটা টান দিয়ে দেখি।
: ভাইয়া! এত সাহস ভালো না। দেখছো না কত্তবড় লাঠি! কিভাবে নাড়াচ্ছে।
: আমি টান দিব।
: বিপদে পড়বে।
: দেখি না।
যেই মোহন জামা ধরে হেচকা টান দিয়েছে ওমনি কাকতাড়ুয়া মাথার পাতিল ফেলে উল্টোদিকে ঝেড়ে দৌড়। মোহনা হাত তালি দিয়ে লাফাতে লাগলো: মজনু মামা। মজনু মামা।

মজনু মামা দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করতে লাগলো: খবরদার! কাকতাড়ুয়াকে মামা ডাকবা না।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...