গল্প

প্রেম

এম এ জাহের


poisha bazar

  • ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:০০

জয় যখনই বিফল হয়েছে, তখনই কবির কল্পনার কথা মনে করে মনকে চাঙ্গা রেখেছে। যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখিবে তাই পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন। জয়ের প্রতিজ্ঞা কার্টুনের প্রতি তার যে স্বপ্ন সেটা যদি পুড়ে ছাইও হয়ে যায় তবু সেই ছাই সে উড়িয়ে দেখবে অমূল্য রতন কোথায় লুকিয়ে আছে। শুরু হয় জয়ের কার্টুন যুদ্ধ, আর এই যুদ্ধের প্রথম সাফল্য আসে এক বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, সে বছর বাহাদুর শাহ পার্কে বাংলা ১৪০০ সাল বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন রাগশ্রী শিল্পী গোষ্ঠী। সেই অনুষ্ঠানেই জয়ের প্রথম কার্টুনের সাফল্য অর্জন, বিনিময় জয় পেয়ে যায় একটি সনদপত্র, যে কার্টুনের জন্য জয় প্রথম সাফল্য হিসেবে সনদপত্র পেল, সে কার্টুনটি ছিল, পল্লীর এক দৃশ্য শিরোনামটি ছিল পল্লীবধূ কলসি কাখে জল ভরিতে যায়। জয়ের প্রথম সাফল্যের সনদপত্রের সঙ্গে যোগ হলো আরেকটি সনদ, সেটা হলে সঞ্চিতার ভালোবাসা তবে এই সঞ্চিতা কোনো কার্টুন নয় এক সুদর্শনা নারী, এই রমনী জয়ের পল্লীবধূ নামক কার্টুন মুগ্ধ হয়ে জয়ের প্রেমে পড়ে যায়।

সঞ্চিতার সারাজীবনের সঞ্চিত ভালোবাসার অংশীদার হওয়ার সনদপত্র পেয়ে জয় ভাসতে থাকে আনন্দের বন্যায়, এভাবে, দিনের পর দিন মাসের পর মাস চলতে থাকে তাদের ভালোবাসার অভিসার, এক পর্যায়ে তাদের প্রেম অন্যদের নিয়ে যায় গভীর থেকে গভীরতরে সঞ্চিতার গভীর প্রেমে হারিয়ে যায় জয়ের সব ভালোবাসা, জয়ের এখন আর মনে হয় না যে, ভালোবাসায় যন্ত্রণা আছে, তার ধারণা পাল্টে যায়, ভালোবাসার দড়িয়ায় হাবুডুবু খাচ্ছে জয় তাই অনুভব করতে পারছে না ভালোবাসার অর্থ, জয় শুধু ভাবে ভালোবাসায় এক অনাবীল ক্লান্তি, দিনে দিনে কার্টুন প্রেমিক জয় হয়ে ওঠে এক প্রেয়সী প্রেমিক তাই এখন অপর কার্টুনের প্রতি জয়ের তেমন ভালোবাসা নেই সবটুকু ভালোবাসা যেন তার প্রেয়সী সঞ্চিতার জন্য। ভালোবাসার নাগরদোলায় দোলতে দোলতে জয় হোঁচট খায় এক নাট্যশালায়। প্রেমের সমাধি সাটকের একটি দৃশ্য জয়কে ভাবিয়ে তোলে, দৃশ্যটি ছিল এই রকম। নায়িকা নায়ককে ভীষণ ভালোবাসে- এক পর্যায়ে ব্যর্থ হয় তাদের ভালোবাসা, নায়িকা বিরহের জ্বালা সইতে না পেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথ বেছে নেয় এই দৃশ্যটিই জয়কে মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসার যন্ত্রণার কথা। নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয় জয়ের মনে, জয় ভাবতে থাকে সঞ্চিতা যদি এই রূপ ব্যর্থ হয়, তবে কি... না, একথা ভাবতে জয়ের ভীষণ কষ্ট হয়, তবু জয়ের ভাবনার শেষ নেই।

এক এক করে ভাবনাগুলো এসে জড়ো হয় জয়ের চারপাশে, জয় ভাবে স্বাগত সমাজ যদি আমাদের ভালোবাসা মেনে না নেয়, তাছাড়া সঞ্চিতা ধনীর দুলালী, মা-বাবার একমাত্র মেয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে ধুমধাম করে তাকে অনেক বড় ঘরে বিয়ে দেবে, কিন্তু আমার মতো হতদরিদ্র এ আমি কি করলাম, কেন আমি সঞ্চিতাকে ভালোবাসতে গেলাম, ভালোবাসা যে ধনী, গরিব, জাতকুল মানে না, একথা সমাজের বিত্তবান লোকেরা বুঝতে চায় না। তারা ভালোবাসার মূল্যায়ন করে অর্থের মাপকাঠিতে অর্থ আর প্রতিপত্তির অহমিকায় তাদের চোখে আবর পড়িয়ে দেয় আঁধারের এক টুকরা কালো মেঘ, তাই ভালোবাসার উজ্জ্বল নক্ষত্রটি, তাদের কাছে ক্রমেই ঝাপসা হয়ে ওঠে। এই রূপ নানা, সমস্যার কথা যখন জয়ের হƒদয়ের অটোগ্রাফিতে ভেসে ওঠে, তখন জয়ের হƒৎপিণ্ডটা দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যায়, জ্বলে-পুড়ে খাক হতে থাকে জয়, কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না জয়ের বুকে কি, যন্ত্রণা, আর বুঝবেই বা কি করে ভালোবাসার আগুনের ধোয়া যে বর্ণহীন যা চোখে দেখা যায় না, হƒদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়, একমাত্র সঞ্চিতাই পেয়েছিল জয়ের যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করতে, যে জয় একদিন ভালোবাসার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একজন তরুণীকে ভালো না বেসে ভালো বেসেছিলেন রণবীর কার্টুনকে কিন্তু নিয়তির বেড়াজালে জড়িয়ে সেই যন্ত্রণার আগুন তাকে বইতে হচ্ছে। প্রেমের সমাধী নাটকের দৃশ্যের মতো পাল্টে যাচ্ছে জয়ের জীবন নাটকের দৃশ্য।

জয় দিনের পর দিন ঝিমিয়ে পড়তে থাকে, সঞ্চিতা জয়ের ঝিমিয়ে পার কারণ জানতে চাইলে জয় এড়িয়ে চলে, সঞ্চিতা বুঝতে পারে জয় আর আগের মতো তাকে ভালোবাসতে পারছে না, এমন কি, ভালো করে দুটো কথাও বলে না, কোথা যেন একটা গ্যাপ থেকে যাচ্ছে, তবে কি, সঞ্চিতার ভালোবাসা মিথ্যে, না মিথ্যে নয় জয় এখনো সঞ্চিতাকে ভীষণ ভালোবাসে, আর ভালোবাসে বলেই জয় সঞ্চিতার সঙ্গে এমন ভাব করছে যাতে সঞ্চিতা ভুল বুঝে জয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায় জয় বুঝতে পেরেছে, সঞ্চিতার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক এটা কখনো সঞ্চিতার মা, বাবা মেনে নেবে না অবশেষে সঞ্চিতা হয়তো ব্যর্থ হয়ে প্রেমের কালি দিতে চাইবে তার চেয়ে ভালো সঞ্চিতা আমাকে ভুল বুঝুক তবু সে বেঁচে থাক, এসব কথা ভাবতে ভাবতে, জয় আবার কার্টুন আঁকার জন্য কলম আর ডায়েরি নিয়ে বসে, সঞ্চিতার ভালোবাসা থেকে মনটাকে আবার কার্টুনের প্রতি ফেরাতে চায় জয়। কিন্তু এখন আর কার্টুনেও মন বসে না, তবু সেই দিনের সেই নাটকের দৃশ্যটি মনে করে একটি কার্টুন রচনা করে জয়, এমন সময় সঞ্চিতা আসে সঙ্গে সঙ্গে জয় ডায়েরিটা বন্ধ করে দেয়, সঞ্চিতা জানতে চায় কি করছিলে, জয় কাচুকাচু করে উত্তর দেয়, এমনি আঁকাআঁকি করছিলাম, জয়ের এই রচনা করা কার্টুনটি কি ছিল সঞ্চিতা জানতে পারেনি, তাছাড়া সঞ্চিতা সহজ-সরল মেয়ে বলে জানার তেমন আগ্রহও দেখায়নি, জয় সঞ্চিতাকে যত এড়িয়ে চলে, সঞ্চিতার ততই আগ্রহ জাগে জয়কে কাছে পাওয়ার।

তাই কালবিলম্ব না করে সঞ্চিতা মুখোমুখি হয় তার মা-বাবার। সরাসরি জয়কে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়ে বসে সঞ্চিতা। জয়ের সঙ্গে সঞ্চিতার সম্পর্কের কথা শুনে মা-বাবা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। তারা সরাসরি সঞ্চিতার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে তাকে জানিয়ে দেয় তোমার বিয়ে অন্যত্র ঠিক করা আছে। সঞ্চিতাও তার মা-বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় বিয়ে আমার হলে জয়ের সঙ্গেই হবে, অন্যত্র নয়। সঞ্চিতা এসব ঘটনা জয়ের কাছে খুলে বলে, জয় এতদিন যা ভেবে আসছিল আজ বাস্তবে তাই হলো। জয় সঞ্চিতাকে বুঝানোর চেষ্টা করে, দেখ সঞ্চিতা ভালোবাসা একটা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড যার শুরুটা আগুন শেষটা ছাই, তাই আমি চাই না আমাকে ভালোবেসে তোমার জীবনটা জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাক। সঞ্চিতা রেগে গিয়ে বলে হোক না ছাই তাতে কি হয়েছে ভালোবাসার আগুনে জ্বলেপুড়ে আমি নিঃশেষ হয়ে যাব তবু হার মানব না, ভালোবাসার অগ্নিকুণ্ডে জ্বলে যাওয়া ছাই থেকে আমি আবিষ্কার করব অমূল্য রতন, তবু আমার ভালোবাসা মিথ্যে হতে দেব না। জয় অনেক বুঝিয়ে সঞ্চিতাকে বাড়ি পাঠায়, এর সপ্তাহ খানেক পরই সঞ্চিতার মাথায় নেমে আসে বিনা মেঘে বজ্রপাত। সঞ্চিতার বাবা, মা, তার অজান্তেই বিয়ে ঠিক করে ফেলেন তার দুঃসম্পর্কের এক মামাত ভাইয়ের সঙ্গে। অতি সতর্ক এবং গোপনীয়ভাবে চলে বিয়ের আয়োজন। সঞ্চিতাকে রাখা হয় কড়া প্রহরায়, যাতে জয়ের কাছে কোনো খবর পৌঁছাতে না পারে। বিয়ের লগ্ন ঘনিয়ে এলে, এক প্রকার জোর করেই সঞ্চিতাকে বিয়ের শাড়ি পড়ানো হয়।

এদিকে বর এসেছে বলে সবাই দৌড়ে যায় বর দেখতে, তখন সঞ্চিতা তার এক বান্ধবীর সহযোগিতায় বিয়ের আসন থেকে পালিয়ে সোজা জয়ের ঘরে গিয়ে ওঠে। সঞ্চিতাকে বিয়ে সাজে দেখে জয় চমকে ওঠে, জয় কিছু বলার আগেই সঞ্চিতা জয়কে বলতে থাকে তাড়াতাড়ি চল, আমরা এখনই বিয়ে করব। আমি বিয়ের আসন থেকে পালিয়ে এসেছি দেরি হলে বিপদ হবে, সঞ্চিতার এরূপ হঠাৎ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি জয়, তাই সঞ্চিতা ব্যর্থ হয়ে চলে যায় যাওয়ার সময় সঞ্চিতা জ্বালাময়ী কিছু কথা বলে যায়, ওই কথাগুলোই ছিল সঞ্চিতার জীবনের শেষ কথা, সঞ্চিতা বলেছিল জয় এতদিন আমি জানতাম তুমি বীরপুরুষ। (চলবে...)

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...