গল্প

যুদ্ধের গল্প

সাইফুল ইসলাম


poisha bazar

  • ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৫৬

ষাটের পর বয়স যতই বাড়তে থাকে মানুষ ততই শিশু হতে থাকে। সত্তরে পা দিয়ে এমনই হয়ে উঠেছে কছিমুদ্দিনও। তার ভালো বন্ধু এখন নাতি বাবু। বেড়ানো, ঘুড়ি ওড়ানো সব কিছুর সঙ্গী এখন সে। কোনোকিছুর দরকার পড়লেই বাবু বায়না ধরে দাদার কাছে। দাদাও তা আদায় করে দেয় বৌমার কাছে থেকে। তাইতো বৌমা ঠাট্টা করে বলে আমার দু’টো বাবু। একটা বড় বাবু আর একটা ছোট বাবু।

কছিমুদ্দিনের স্ত্রী গত হয়েছে বছর পাঁচেক আগে। তার দুই ছেলে আমজাদ হোসেন ও জামসেদ হোসেন। আমজাদ পাশের গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। প্রায় দশ বছর আগে পাশের গ্রামের এসএসসি পাস ফরিদার সঙ্গে বিয়ে হয় আমজাদের। তারপর আর ফরিদার পড়াশোনা এগোয়নি। এখন সে জাত গৃহিণী। শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর পুরো সংসার সেই সামাল দেয়। বাবু স্কুল থেকে ফিরেই দাদার সঙ্গে হই হই টই টইয়ে মেতে ওঠে। সন্ধ্যায় দাদা না বসলে সেও বসে না পড়ার টেবিলে। ছোট ছেলে জামসেদ আফ্রিকার কোনো এক দেশে গেছে বছর তিনেক আগে, ফিরবে এ বছরের শেষের দিকে। ওর জন্য মেয়ে দেখা হয়েছে, এসে বিয়ে করবে। তারপর ব্যবসা-বাণিজ্য বা কৃষি কাজ যাই করুক, থিতু হবে নিজ গ্রাম নজরপুরে। নজরপুর গ্রামের সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে বাঙালি নদী। তার পাড়েই গ্রামের হাই স্কুল। সেখানে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে কছিমুদ্দিনের এক মাত্র নাতি বাবু। আজ সকাল সকালই সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে স্কুলে যাওয়ার জন্য। কছিমুদ্দিন নাতিকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জেনে নেয়, কারা যেন ঢাকা থেকে আসবে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে। যারা আসবে তাদের নাক-চোখ-মুখ মাঝে মধ্যে দেখা যায় টেলিভিশনে। তাইতো সবার আগে স্কুলে যেতে হবে তাকে, বসতে হবে সামনের সারিতে। বাবুর ব্যস্ততা দেখে কছিমুদ্দিন বলেÑবৌমা, আমিও যাই না হয় বাবুর সাথে? তুমি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেছ, আর শুনে কী করবে? বলে বাবু। দেখলে আর শোনা যায় না, না?

বৌমা ছেলের জুতার ফিতা বেঁধে মাথার চুল আঁচড়ে দেয়, আর দাদা-নাতির তর্ক শোনে। বাবু এক সময় গম্ভীর হয়ে বলে, যেতে পারো, কিন্তু ভালো জামা-কাপড় পরে যেতে হবে। ঠিক আছে।
বৌমা ওয়্যারড্রোব থেকে ধোয়া জামা আর লুঙ্গি বের করে দেয়। কছিমুদ্দিন এসব পরে মাথার চুল আঁচড়ায়। পাম্প শূ টা পরে কাঁধে গামছা ছড়িয়ে দেয়। আয়নায় নিজেকে দেখে নেয় একবার। কাঁধে গামছা দেখে ক্ষেপে যায় বাবু। বলে, এখনো তোমাকে ভদ্রলোক বানাতে পারলাম না। রাখো গামছা, না হলে নেবো না তোমাকে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কছিমুদ্দিন। বৌমা শ্বশুরের ঘাড় থেকে গামছা সরিয়ে নিয়ে বলে, থাক আব্বা, আজ ঘাড়ের গামছা নাই বা নিলেন। কেমন যেন খালি খালি নাগে বৌমা। চলো এখন। এ কথা বলে টানতে টানতে দাদাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় বাবু।

বড় করে শামিয়ানা টানানো হয়েছে স্কুল মাঠে। তার নিচে মঞ্চ, মঞ্চে ব্যানারে লেখা আছে ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলার আসর-২০১৪’। নিচে আয়োজক সংগঠনের নাম। সামনে বসার জন্য পেতে দেয়া হয়েছে ভাড়া করে আনা প্লাস্টিকের চেয়ার। বাবুর আগেই চলে এসেছে বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে। তারা সামনের সারির চেয়ার দখল করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই।

কছিমুদ্দিনকে দেখে অফিস থেকে বের হয় হেডমাস্টার। কছিমুদ্দিন বলে, তোমরা নাকি মুক্তিযুদ্ধর গল্প শোনাইবা, তাই নাতির সাথে চইলা আইলাম।
ভালো কইরছেন। এসব অনুষ্ঠানে আপনেগোর মতো মুরুব্বী মানুষের উৎসাহ দরকার। বইসেন এইহানে। ছেলেমেয়েদের বলে, তোমরা সামনের সারি ছাইড়া বসো, এখানে মেহমানরা বইসবে। স্যারের কথায় ছেলেমেয়েরা সামনের সারি ছেড়ে বসে। সেখানে নাতিকে নিয়ে বসে কছিমুদ্দিন। মাস্টারকে জিজ্ঞেস করে-কারা কারা আসবে?
-ঢাকা থেকে টিভি অভিনেতা যাকের সাব, তার সঙ্গে আরো কয়েকজন। ডিসি সাবের আসার কথা আছিল, কিন্তু কী কাজে জানি ব্যস্ত, তিনি আইসতে পাইরবেন না। তবে ইউএনও সাব আইসবেন। আপনে বইসেন, আমি রাস্তা দেহি, উনারা আইসতেছেন কিনা।

শামিয়ানার নিচ থেকে চলে যায় হেডমাস্টার। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ছেলেমেয়েদের ঝগড়া। তারা বাবুকে সামনের সারিতে বসতে দিতে নারাজ। বাধ্য হয়ে বাবুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পিছনে সরিয়ে দেয় দাদা। তারপর ওদের ঝগড়া থামে। এ সময় চেয়ারম্যান মেম্বারসহ কয়েকজন এসে পড়ে। এদের কেউ টিভি অভিনেতাকে দেখতে এসেছে, কেউ এসেছে ইউএনও সাহেব আসবেন বলে। তবুও অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে জমজমাট। এক সময় ইউএনও সাহেবের সঙ্গে মেহমানরা চলে আসে। যাকের সাহেবকে একনজর দেখার জন্য ঘিরে ধরে সবাই। ইউএনও সাহেবের কাছে আর কেউ থাকে না। এ অবস্থা দেখে মুচকি হাসেন ইউএনও। হেডমাস্টারকে বলেন, চলুন অনুষ্ঠান শুরু করা যাক। ভিড় ঠেলে যাকের সাহেবের কাছে চলে আসে হেডমাস্টার। ছেলেমেয়েদের বলে, যাও। শামিয়ানার নিচে গিয়ে বসো, এখনই শুরু হবে অনুষ্ঠান। অভিনেতাকে দেখার সুখ না মিটিয়েই শামিয়ানার নিচে চলে যেতে হয় তাদের। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলার আসর। হেডমাস্টার দু’চার কথা বলে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করেন ইউএনও সাহেবকে।

মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আপনারা জানেন যে, এই বেসরকারি সংস্থাটি সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে আগামী প্রজš§কে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে এক বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই আজকের এ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বলবেন টিভি ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা যাকের সাহেব। আর একটি কথা অনুষ্ঠান শেষে দর্শক-শ্রোতাদের জন্য প্যাকেট খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাবার না নিয়ে কেউ যাবেন না। এখন আপনাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলবেন জনপ্রিয় অভিনেতা যাকের সাহেব।

যাকের সাহেব মাউথ পিসটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে ফুঁ দেন, শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করেন বসেই বলি, না কি বলেন? তার কথা বলার ঢঙে সবাই খুশি হয়, চিৎকার করে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনে যে ভাবে ইচ্ছা বলেন।

’৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-র ১১ দফা নিয়ে গড়গড় করে বলতে থাকেন যাকের সাহেব। অভিনেতা মানুষ, কখনো নিচু গলায় কখনো বা উচ্চ কণ্ঠে, আবার কখনো অভিনয়ের ঢঙে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাগুলো সাজিয়ে যেতে থাকেন একের পর এক। কথা বলতে বলতে হঠাৎ মনে হয়, তার কথা কেউ শুনছে না। শ্রোতারা তাকে দেখছে অবাক হয়ে, যেন সে এক অদ্ভুত প্রাণী বা যাত্রাদলের সঙ। আবার কেউ কেউ বসে বসে ঝিমুচ্ছে। যাকের সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন চেয়ারম্যান সাহেব ঘুমে নেতিয়ে পড়েছেন, নাকডাকা বাকি। ইউএনও সাহেবের চোখ বন্ধ, যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছেন তার কথা। কিন্তু যাকের সাহেবের মনে হয়, তিনি আসলে শোনার ভান করছেন। হেডমাস্টারের দিকে তাকান যাকের সাহেব। চোখাচোখি হয় তার সঙ্গে। হাত ইশারায় বলেন যে পানি খাবেন। পানি নিয়ে আসে আয়া। যাকের সাহেব পানি ঢেলে দেন তার গলার মধ্যে। সেই সঙ্গে গুছিয়ে নেন নিজেকে। বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা প্রকল্পে কাজ করছি, সš§ানীও নিচ্ছি। সেই সঙ্গে মনে হচ্ছে দেশের জন্যও কিছু একটা করছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে বকাউল্লা বকে যাচ্ছি, শোনাউল্লা শোনে বলে মনে হয় না। এ কথা শুনে দর্শক-শ্রোতারা নড়েচড়ে বসে, মনোযোগ দেয় অনুষ্ঠানে। যাকের সাহেব বলেন, আজ থেকে অনুষ্ঠানটা অন্যভাবে সাজাবো বলে ভাবছি। এ অনুষ্ঠানে যারা বয়স্ক আছেন, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন তাদের কাছে থেকে শুনবো মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তাতে অন্তত মুখস্থবিদ্যা জাহির করতে হবে না। কেউ কি আছেন যিনি নিজে থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলবেন? অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই চুপ করে থাকে। তিনি আবারো বলেন, যা দেখেছেন তাই বলবেন, বাড়তি কিছু বলার দরকার নেই। আমি চাই নিজে থেকে এসে বলুন মুক্তিযুদ্ধের গল্প। এ কথার পরে বয়স্করা একে অপরের দিকে তাকায় কিন্তু কেউ চেয়ার ছেড়ে ওঠে না। যাকের সাহেব আবার মাউথ পিস হাতে নিয়ে বলেন, আপনারা কেউ আসছেন না, অথচ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানাটা খুব জরুরি। এবারো তার কথায় সাড়া দেয় না কেউ। ভিতরে ভিতরে রেগে যান তিনি, কিন্তু কাউকেই বুঝতে না দিয়ে বলেন. কেউ নিজে থেকে আসছেন না, কিন্তু অনুষ্ঠানটি চালাতে চাই। যাই হোক, এখন আমি যা বলবো তা কি শুনবেন আপনারা? হ্যাঁ শুনবো বলুন আপনি। আমি একজন বয়স্ক মানুষকে ডাকবো যিনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। যাকে ডাকবো তিনি আসবেন তো? আপনি ডাকুন, যাকে ডাকবেন সেই যাবে। দর্শক-শ্রোতা তার দিকে তাকিয়ে আছে সে কী করে তা দেখার জন্য। কিছুক্ষণ চুপ থাকেন যাকের সাব, দর্শকের দিকে তাকিয়ে দেখে নেন, কাকে ডাকবেন তা ভেবে নেন। অবশেষে আঙ্গুল উঁচিয়ে ডাক দেন সামনের সারিতে বসা কছিমুদ্দিনকে, আপনি আসুন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাবেন। ডাক শুনে ভ্যাবচ্যাকা খায় কছিমুদ্দিন। পিছনে তাকায়, না তাকেই ডাকছেন যাকের সাহেব। এ সময় বাবু উঠে এসে দাদার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। কারণ দাদা মঞ্চে উঠবে, এটা অনেক গর্বের ব্যাপার মনে হয় তার কাছে। মাইকের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে, দাদা বলো না তুমি মুক্তিযুদ্ধের গল্প।

বলুন, ভয়ের কিছু নাই। আপনি যা দেখেছেন তাই বলুন। আপনারা না বললে কে শোনাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা। যাকের সাহেব কৌতুক আর অনুনয় মিশিয়ে বলেন কথাটি। আপনিও বলছেন? নাতিটার জ্বালায় বিপদে পড়েছি, তার সাথে আপনিও বিপদে ফেলতে চান? বলুন আপনি, সবাই আপনার কথা শোনার জন্য বসে আছে। ওদের আচরণে মজা পায় ইউএনও সাহেব। সেও অনুরোধ করে কছিমুদ্দিনকে। গলা খাঁকারি দিয়ে মাইকের সামনে দাঁড়ায় কছিমুদ্দিন। মাইকে ফুঁ দিয়ে বলা শুরু করে, দ্যাশে এক নেতা আছিল, তার নাম শেখ মজিবর। হে কইল, পাকিস্তানিরা আমাগোর দ্যাশের সম্পদ লুট কইরা নিতাছে। এডো অন্যায়। আমরা ন্যায়ের পক্ষে তার পিছে কাতার বাইন্ধা দাঁড়াইলাম। ওরা আমাগোর উপর হামলা চালাইলো। আমরাও রাইফেল উঁচা কইরলাম। শুরু অইলো যুদ্ধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধ। যার নাম মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা যুদ্ধ। এত বড় একটা যুদ্ধ অইলো কিন্তু হেই দেশের মানুষ এহুন নিজেরাই ন্যায়-অন্যায়ের ফারাক ভুইলা গেছি, ভুইলা গেছি মুক্তিযুদ্ধের কথাও। আপনারা যারা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাইতে আইসেন তারা ন্যায়-অন্যায়ের কথাডা কইয়েন। দেখবেন আবারো মুক্তিযুদ্ধের কথা, স্বাধীনতার কথা আইসা পড়বো। গল্প কইরা আর মুক্তিযুদ্ধের কথা কওয়া নাইগবো না। কারণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই স্বাধীনতা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। তহুন ব্যাবাক মানুষ এক কাতারে খাড়ায়া যাইবো। এ কথা বলতে বলতে চোখে পানি এসে যায় কছিমুদ্দিনের। জামার কোনা দিয়ে চোখের পানি মোছার চেষ্টা করে সে। কছিমুদ্দিনের কথায় খেই হারিয়ে ফেলে অনুষ্ঠানের আয়োজক, মেহমান এমনকি শ্রোতারাও।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...