সাক্ষাৎকার

মানুষ হতে প্রকৃতির কাছে যেতে হবে: সেলিনা হোসেন

মানবকণ্ঠ
সেলিনা হোসেন - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের
  • ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২৯,  আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৩৪

সেলিনা হোসেন
কথাসাহিত্যিক
জন্ম ১৪ জুন ১৯৪৭
পিতা এ কে মোশাররফ হোসেন
মাতা মরিয়ম-উন-নিসা বকুল
নিজ জেলা রাজশাহী। তবে বগুড়ায় কেটেছে শৈশব।

সেলিনা হোসেন মূলত একজন কথাসাহিত্যিক। লেখালেখির শুরুটা বড়দের জন্য হলেও পরে ছোটদের সামনে মেলে ধরেছেন উপন্যাস ও গল্পের ডালি। ছোটদের জন্য লেখা তার বইয়ের সংখ্যা ৩৬টি। এর মধ্যে বেশিরভাগই উপন্যাস। এছাড়া বড়দের জন্য লিখেছেন উপন্যাস ৪৩টি, গল্পগ্রন্থ ১৫টি এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ১৫টি। পেয়েছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার। বাংলা একাডেমির শিশু-কিশোর সাময়িকী ‘ধান শালিকের দেশ’ সম্পাদনা করেছেন ২৫ বছরেরও বেশি সময়।
প্রথম বই উৎস থেকে নিরন্তর (গল্পগ্রন্থ, ১৯৬৯)
ছোটদের জন্য প্রথম বই সাগর (উপন্যাস, ১৯৯১)

সেলিনা হোসেনের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আসাদ জোবায়ের। গ্রন্থনা করেছেন এনাম রাজু।


কেমন আছেন?
ভালো আছি। যদিও শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। তবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ভালোভাবেই টিকে আছি। সবমিলে বলতে পারি ভালো আছি।

ভালো কিভাবে থাকা যায়?
আসলে ভালো থাকার চেতনাটা অর্জন করতে হবে। আমরা একটু শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকতে পারি। কিছু সামাজিক-পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু এই সবকিছু মোকাবিলা করে ভালোর দিকটা অর্জন করতে হবে। তাহলে ভালো থাকা যায়।

আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশ হয় ১৯৬৯ সালে, যা বড়দের জন্য লেখা। এর প্রায় বাইশ বছর পর ছোটদের জন্য উপন্যাস ‘সাগর’ প্রকাশ হয়। এত পরে কেন মনে হলো ছোটদের জন্য লেখা উচিৎ?
আমি ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলা একাডেমির ‘ধানশালিকের দেশ’ পত্রিকা প্রায় ২৫ বছরের বেশি সময় সম্পাদনা করি। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল ছোটদের জন্য আমি কখনো লিখতে পারব না। শিশুদের জন্য লেখা খুব কঠিন কাজ। পরে শিশু একাডেমিতে বিপ্রদাশ বড়–য়া ছিলেন। তিনি আমাকে বাধ্য করেছেন শিশুদের জন্য লিখতে। এ জন্য আমি বিপ্রদাশের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। কারণ তার অনুপ্রেরণায় লেখা সেই ‘সাগর’ উপন্যাসটি ‘শিশু’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। পরে ১৯৯১ সালে তা বই আকারে আসে। এরপর ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমি আমাকে দিয়ে ‘বর্ণমালার গল্প’ লিখিয়ে নিয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে আপনি লেখালেখির মাধ্যমে ছোটদের জন্য কী বলতে চেয়েছেন?
আমি কখনোই ছোটদের জন্য ভূতের গল্প লিখব না। এটা একটা আনন্দের জায়গা, একটা বিনোদনের জায়গা। কিন্তু আমি নিজেকে এই দায়িত্ব থেকে দূরে রেখেছি। কারণ আমি আমার লেখায় ছোটদের জন্য মেসেজ দিতে চাই। ছোটদের যে মেসেজটা দেওয়া দরকার তা হলো প্রকৃতিকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়, সংরক্ষণ করতে হয়। মানুষের সাথে মানুষের কিভাবে ভালোবাসা হয়। এসব কিছুই আমি আমার গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের মতো আমাদের গর্বের বিষয়গুলো তুলে ধরতে চেয়েছি।

একটা সুন্দর মানুষ বলতে কি বুঝেন?
আমার কাছে সুন্দর মানুষ মানেই যিনি মানুষকে ভালোবাসেন। যিনি নৈতিকভাবে সৎ। যার সততার দিক দিয়ে কোনো ঘাটতি নেই। তিনি আমার কাছে সুন্দর মানুষ। আমি চেহারা দিয়ে মানুষের সৌন্দর্য বিচার করি না।

একটা বইয়ের নাম বলুন, যা আপনাকে আলোড়িত করেছে বা প্রভাবিত করেছে?
আমি সবসময় একটা কথা বলি সেটা হলো, রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ আমাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে। একজন কবি কিভাবে কলকাতা থেকে আমাদের তখনকার পূর্ববঙ্গকে অনুভব করেছেন। এই যে প্রকৃতি দেখা, নদী দেখা, মানুষ দেখা। যখন প্রবল বন্যায় পূর্ববঙ্গে কৃষকদের ধানক্ষেতের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। তিনি তা অনুভব করে পূর্ববঙ্গে এস্টেটে চিঠি লিখেছেন যেন একজন প্রজার কাছ থেকে কোনো খাজনা নেয়া হয় না। এই যে সহানুভ‚তির জায়গা, মানুষের প্রতি ভালোবাসার জায়গা, শ্রদ্ধার জায়গা এগুলোই আমাকে আলোড়িত করেছে।

আপনি কি কখনো কারো মতো হয়েছেন?
এরকম কখনো ভাবিনি যে আমাকে কারো মতো হতে হবে। তবে, আমি ভেবেছি সবার আদর্শ নিয়ে আমি বড় হব এবং আমি নিজের বোধ নিয়ে নিজের চিন্তা নিয়ে বড় হব। যেমন আমি দুজন মানুষের কথা বলতে পারি। আমি যখন বাবার চাকরি সূত্রে বগুড়ায় ছিলাম। লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। সেখানকার প্রধান শিক্ষক স্কুলের অ্যাসেম্বলির পর দুটি লাইন পড়তেন ‘পাখি সব করে রব রাতি পেহাইল, কাননে কুসুম কলি সকলই ফুটিল’। পড়া শেষ হলে বলতেন, এই তোমরা চিৎকার করে এই লাইন দুটি পড়। আমরা সবাই তখন চিৎকার করে বলতাম। তখন স্যার আমাদের বলতেন, তোমরা সবাই আমার সামনে কুসুম কলি। তোমরা বড় হয়ে মানুষ হবে। হয়তো তোমাদের কেউ রিকশা চালাবে, কেউ ডাক্তার হবে। যে যাই হোক, তবে মানুষ হতে হবে সবাইকে।

আরেকটা ঘটনা বলি, আমরা করতোয়া নদীর ওপারে বসতিহীন একটা বাগান বাড়িতে যেতাম প্রায়ই। আমরা খেয়াঘাটে গিয়ে মাঝিকে বলতাম বাবু আমাদের পার করে দিবেন? আমরা ওপারে যাব। তখন তিনি বড়দের বলতেন, কেউ নৌকায় উঠবে না। আমি ওদের পার করে দেব। কারণ ওরা ওপারে গিয়ে খেলবে, হাসবে, ফল খাবে। বড়রা তাকে বকা দিত। তিনি উত্তরে বলতেন, ওরা একদিন অনেক বড় হয়ে দেশের সেবা করবে। এই যে একটা নিরক্ষর মানুষের মধ্যে বোধ। এটা আমাকে আপ্লুত করেছে।

মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে আপনি কোথায় যেতে চান?
আমি সেই সব মানুষের কাছে যেতে চাইব। সেই বঙ্গোপসাগরের পাড়ে যেখানে আমাদের জমিনটা শেষ হয়ে শুরু হলো সাগর। যেখানে মানুষরা সাগর ও জীবনের সাথে বেঁচে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে।

আপনি সময় কিভাবে কাজে লাগান?
আমি সময়কে সবসময় কাজে লাগাই। দায়িত্ববোধ থেকে পিছু হটি না। আমার লেখালেখির কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। যখন ফ্রি হই সেটাই আমার লেখার সময়।

আপনি কষ্ট পান কখন?
কষ্ট পাই যখন আবরারকে মেরে ফেলল। দীপনের মতো একটা চমৎকার ছেলেকে মেরে ফেলল। এসব ঘটনা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। কেননা এসব মৃত্যু আমাদের সামনে নৈতিকতার একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। এটা থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে।

আপনার গর্ব হয় কখন?
মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দান করা। এটা আমার কাছে একটা বড় গর্বের বিষয়। এছাড়া যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটা দেশ পেলাম। এই দুটোই আমাদের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...