সায়েন্স ফিকশন

শিমুর সৎ মা

আশরাফ পিন্টু

মানবকণ্ঠ
অলঙ্করণ - নিসা মাহজাবীন।

poisha bazar

  • ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২০

শিমুর মা শিমুকে প্রাণাধিক ভালোবাসে। শিমুর খাওয়া-পড়া থেকে শুরু করে রাত্রিতে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানো যাবতীয় কাজ শিমুর মা একহাতে করে থাকে। এজন্য সে কখনো কারো সাহায্য নেয় না। এরপরও বেশ কিছুদিন ধরে শিমুর মনটা বড্ড খারাপ। সে কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছে শিমু মাকে গোসল করিয়ে দিতে বললে একটা অজুুহাত দেখিয়ে কেটে পড়ে। পরে অন্যরা তাকে গোসল করিয়ে দেয়। কেন এমন করে মা শিমু তা বুঝতে পারে না। এ ছাড়া শিমু কোনোদিন ওর মাকে গোসল করতে দেখেনি। হয়তো আড়ালে-আবডালে করে কিন্তু শিমু তা জানে না।

শিমু ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। বাবা-মার অত্যন্ত আদরের সন্তান। বাবা অবিক আশরাফ স্বনন একজন বিজ্ঞানী। মা গৃহিণী। তবে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। যে কোনো কাজ-কর্মে তার দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। কোনো কাজ করতে তিনি কখনো ক্লান্তিবোধ করে না। আর যে কোনো কাজ তিনি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে করে ফেলে। শিমুকে স্কুলে আনা-নেয়াসহ যাবতীয় কাজ মা-ই করে থাকে। বাবা সময় পায় না; ফলে মা-ই বেশি সময় দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ছোটখাটো বিপদ থেকেও শিমুকে রক্ষা করেছেন কয়েকবার। এরমধ্যে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়।

কিছুদিন আগে স্কুল গেট থেকে শিমুকে ছেলেধরা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। সেদিন স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরি হয়েছিল মায়ের। শিমু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দোকান থেকে চুইংগাম কিনতে গেটের বাইরে যায়। দোকান থেকে গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে যাবে-এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ওকে জাপটে ধরে একটি মাইক্রোবাসে তোলে। ঠিক তখনি শিমুর মার রিকশাটি স্কুল গেটে এসে থামে। রাস্তায় চোখ পড়তেই দেখে- কারা যেন শিমুকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। শিমুর মা তখনি রিকশা থেকে নেমে দৌড়ে পৌঁছে যায় ঠিক মাইক্রোবাসটির সামনে। গাড়িটি দু’হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেয় সে। শিমু একটু অবাক হয়- তার মায়ের গায়ে এত শক্তি! একজন মহিলার গায়ে এত শক্তি থাকতে পারে কীভাবে তা সম্ভব? এ ছাড়া মায়ের তো অ্যাকসিডেন্টও হতে পারত। মা তো মা-ই। তারা ছেলেমেয়ের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে।

সেদিন শিমুকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে মা। বাবা তেমন অবাক হয় না। এমন কি মাকে কোনো ধন্যবাদও দেয় না। এটা যেন তার রুটিনেরই অংশ। বাবার এমন ব্যবহারে শিমুর মনটা আহত হয়। বাবা কি মাকে একটুও ভালোবাসে না? মেয়ের এমন উপকারে অন্তত একটা ছোট্ট ধন্যবাদ দেয়া উচিত ছিল তার।

সেদিন ওমন বড় একটা বিপদ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে তেমন বেগ পেতে হয়নি মাকে। কোনোরূপ অসুস্থও হয়নি। কিন্তু আজ মা কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিমু আজ সকালে খেলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে গিয়েছিল। খেলতে খেলতে তার বলটি পুকুরের পানিতে পড়ে যায়। সেটি আনতে গিয়েই বিপত্তিটা ঘটে। শিমু সাঁতার জানে না। সে পানিতে ডুবে যাচ্ছিল। ব্যাপারটি মা লক্ষ্য করে দৌড়ে গিয়ে ওকে পানি থেকে উদ্ধার করে। কিন্তু তারপর থেকেই মা যেন কেমন নেতিয়ে যায়। বিছানায় গিয়ে সটান শুয়ে পড়ে।

বাবা এসে সব শোনে। মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, তাকে হাসপাতালে নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। শিমু অবাক হয় মায়ের প্রতি বাবার এমন অবহেলায়। ও বাবার আচরণে খুব দুঃখ পায়। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরিয়ে পড়ে। বাবা শুধু একবার মাকে বিছানায় গিয়ে দেখে এসেছে। এরপর বাইরে এসে পায়চারি করছে। শিমু অশ্রুসজল চোখ নিয়ে বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়। বাবা শিমুর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আদর করে বুকে টেনে নেয়। শিমু নীরবে কিছুক্ষণ অশ্রু বিসর্জন করার পর বলে, মাকে ডাক্তার দেখাও, হাসপাতালে নিয়ে যাও বাবা। মা তো কিছু বলছে না।

বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত¡না দেয়। কি বলবে বুঝতে পারে না। শিমুকে বুকে জড়িয়ে ধরে সেও কেঁদে ফেলে। বাবার চোখে পানি দেখে শিমু অবাক হয় বাবা কাঁদছেন! ও অবাক নয়নে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বাবা নীরবতা ভঙ্গ করে বলে, তোর মা আর ভালো হবে নারে রে শিমু। ওর ভেতরের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে।
-তাই বলে তুমি মাকে হাসপাতালে নেবে না, ডাক্তার দেখাবে না?
-দেখিয়ে কোনো লাভ নেই রে মা। আমি ওকে দেখেছি।
-ক্যানো? তুমি কি ডাক্তার?
-তোর মা তো অনেক দিন আগেই মরে গেছে। বাবা ইচ্ছে করেই সত্য কথাটা বলে ফেলে।
-কি যে বলো তুমি! মা অসুস্থ হলো আজ সকালে আর তুমি বলছো কি না অনেক আগেই মারা গেছে।
-তোর আসল মায়ের কথা বলছি।
-কি বললে? উনি তাহলে কে?
-উনি তোর সৎ মা।
-সৎ মা! শুনে শিমুর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
-হ্যাঁ। তোকে জন্ম দিতে গিয়ে হাসপাতালেই মারা যায় তোর মা। তখন আমি তোকে লালন-পালনের জন্য এই সৎ মাকে অর্থাৎ রোবট মাকে তৈরি করি। একে হুবহু তোর মায়ের চেহারার আদল দেই। এজন্য শুধু আত্মীয়-স্বজন ছাড়া বাইরের কেউ জানে না যে এটা তোর আসল মা নয় একটা রোবট।
-কিন্তু রোবট মাকে কি ভালো করা যাবে না? সে তো খুব ভালো মা ছিল, সৎ মা বলে মনেই হতো না।
-তা ঠিক। ওভাবেই আমি ওকে গড়েছিলাম। কিন্তু তুই জানিস না, পানি হলো যে কোনো ইলেকট্রনিক জিনিসের যম। রোবটেরও শত্রু। পানি থেকে সতর্ক থাকার বুদ্ধিও ওর মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তোকে বাঁচাতে গিয়ে ওর ভেতরের সব কল-কবজায় পানি ঢুকে যায়। ফলে ওর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব বিকল হয়ে গেছে।
-ওনাকে কি কোনো ভাবেই সুস্থ করা সম্ভব নয়?
-ঠিক বলতে পারছি না। তবে আমি চেষ্টা করব তোর মাকে ফিরিয়ে দিতে; এজন্য সময় লাগবে।
-কত সময়?
-প্রায় বছর খানেক।
-আমি অপেক্ষা করব বাবা।
-বেশ মা।
বাবার কথায় শিমুর মন ভালো হয়ে যায়। মাকে আবার দেখতে পাবে পূর্বের মতো। ইস! এমন যদি মানুষের বেলায়ও করা যেত! তাহলে ওর আসল মাকেও ফিরে পাওয়া যেত। যাক, এক বছর বেশি সময় নয়, দেখতে দেখতে কেটে যাবে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...