গল্প

কবরের মাটি সাক্ষী

সাবিত্রী সাহা


poisha bazar

  • ১২ অক্টোবর ২০১৯, ১৬:১২

স্যার আপনি কখনো প্রেম করেছেন?

অবন্তী ম্যাডাম! বসেন। প্রেমের কথা যখন তুললেন তাহলে শোনেন আমার প্রেম কাহিনী। এক সময় আমি ছিলম বিশ্বপ্রেমিক! দুই তিনটা করে চলমান। কখনো ফাকা ছিলাম না। বরং এমন হত কখন কার সঙ্গে দেখা করব সময় মিলাতে পারতাম না। এলাকায় আমি খুব দাপটে চলাচল করতাম। মেয়েরা আমার জন্য দিওয়ানা। এক বাড়িতে চার বোন থাকলে চার জনই আমার সঙ্গে আই টক করত। সবকিছু ছেড়ে বিএসসি পাশ করে চলে এলাম ঢাকা শহরে। এমএসসিতে ভর্তি হব জগন্নাথ কলেজে। যেহেতু আমি নিজের খরচ নিজেই চালাব তাই আমাকে ভর্তি হতে হবে ইভিনিং শিফটে। ডে-শিফটে কাজ করতে হবে। শুরু হয়ে গেলো জীবন। প্রেম ও চলছে। ইউনিক সিরামিক এর দোকানে কাজ নিলাম। মালিক আমাকে খুব সাদরে গ্রহণ করল। অন্য সব কর্মচারির থেকে শিক্ষা দীক্ষা ও মেধায় ছিলাম এগিয়ে। কর্মসংস্থান যোগার করলাম কিন্তু আবাসন এখন কোথায় পাই। এই ঢাকা শহর যত মানবিক, মাথা গুঁজতে দেবার জন্য ততটাই অমানবিক। এখানে ব্যাচেলর ‘বালাই’ জাতীয় শব্দ। তবুও আমি থেমে নেই মাথা গোজার জন্য আবাসন খুঁজতে।

হঠাৎ পেয়ে গেলাম বাসা নং ৪২৩, রোড নং ১১, বি ব্লক, পল্লবী। টিন সেড লম্বা ঘর। সেখানে যারা থাকে তারা সবাই গার্মেন্টস শ্রমিক। তাদের মধ্যে আমি শুধু ছাত্র। বাসার মালিক সরকারি চাকরি করেন। তার স্ত্রী বাসা দেখাশোনা করে। এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে জাপানে পড়াশোনা করে, বড় মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে ছোট মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বাসার মালকিনকে আমি খালা আম্মা বলে ডাকতাম। সময় সূত্রে খালা আম্মার সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে ওঠে।

সে মাঝে মাঝে তার দুই মেয়েকে নিয়ে আসত আমার রুমে। বিশেষত গণিতে কোন সমস্যা হলে। যেহেতু আমার এমএসসির বিষয় ছিল গণিত। আর একটু বলে রাখি- আমি যে রুমে থাকতাম তার ভাড়া ছিল ৭০০ টাকা। আমি ওই রুমে একাই থাকতাম। দিনে কাজ করছি সন্ধ্যায় ক্লাস করছি, যা ইনকাম করি তাই ব্যয় করি মাঝে মাঝে সিগারেট টানছি। দিব্যি বেশ ভালো আছি। খালা আম্মা আমার রুমে আসত আমি তার সঙ্গে সিগারেট টানতাম। একদিন বললাম খালা আম্মা আপনি মহিলা মানুষ হয়ে সিগারেট খান! বিষয়টা আসলে আমি আমলে নিতে পারছি না।
তখন সে বলল, আমি জেলা ফরিদপুরের উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ছিলাম। এক সময় দাপটে চলতাম। এখন দাপট কমেনি বরং বেড়েছে শুধু জায়গায় স্থানান্তরন।

তারপর থেকে খালা আম্মার সঙ্গে আমার আরো ভালো সম্পর্ক। সম্পর্ক থেকে বিশ্বস্ততা। বিশ্বস্ততার জোরে তার ছোট মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতাম। ছোট মেয়ের সঙ্গে আমার মাকড়শার জালের মত সম্পর্ক গড়ে উঠল। মাকড়শার জাল বললাম এই জন্য মাকড়শার বাসা ভেঙে দিলে আবার চিকন তারে বাসা বাঁধে। যে সম্পর্ক ভাঙা যায় না মৃত্যু ব্যতীত।

স্যার কথাটা আর একটু স্পষ্ট করে বলবেন।

স্পষ্ট কথা হলো, ছোট মেয়েটা বয়সে ছোট ছিল তবে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছিল। মেয়েটা আমার রুমে একাধিক বার আসা যাওয়া করত। ভালো ছাত্র, গণিত ভালো বুঝাই এই জন্য হয়ত ওর মা কিছু বলত না। আমি অবশ্য, সারাদিন বাইরে থাকতাম। ক্লাস শেষ করে আসতাম রাতে। তখন সময় করে ওকে পড়াতাম। দিনে যখন বাসা থেকে বের হতাম আমার রুমটা খোলা থাকত। মেয়েটা রুমে গিয়ে রুম পরিস্কার করত, বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখত। আমি বুঝতে পারতাম। এর মাঝে যেটা হত, পড়ার টেবিলে ক্যালেন্ডার ডেক্স রাখতাম। তার নিচে একটা চিরকুট লিখে রাখতাম। বিশেষ করে বিভিন্ন উপন্যাস বা কবিতার দুই/চার লাইন। মাঝে মাঝে ছায়া ছবির দু/এক লাইন। আমার হাতের লেখা ছিল বেশ সুন্দর। ইউনিক সিরামিকসে বেশ কিছু দিন কাজ করার পর চিন্তা করলাম, যেহেতু আমি স্টুডেন্ট সুতরাং পড়াশোনা সংক্রান্ত কাজ হলে ভালো হয়। তখন পরিচয় হয় হারুনুর রশিদ ভাইয়ের সঙ্গে। তার নিজস্ব বই-বিতান ছিল। সেখানে পত্রিকার লেখা এবং বিভিন্ন ম্যাগাজিনের লেখা আসত। সেই লেখাগুলোতে প্রুফরাইটার হিসাবে কাজ করতাম। কোন বানানটা ভুল আমি সংশোধন করে লাল কালি দিয়ে লিখে রাখতাম। তারপর আমার লেখা দেখে প্রিন্ট দিত। সে সূত্রে আমি ছায়াচিত্র ম্যাগাজিনের লেখা অরুর জন্য লিখতাম। অরুণিমাকে আমি অরু বলে ডাকতাম। আমার খেলা পড়ে অরুণিমা উত্তর দিত।

আমার আর বুঝতে বাকি নেই আমাদের প্রেম হয়ে গেছে। চিঠিপত্রের এই উত্তর প্রতি-উত্তরের মাঝে অরুণিমার সঙ্গে তার স্কুলের সামনে দেখা করতে যেতাম। একদিন অরু বলল, আমরা আজ রিকশায় ঘুরব। আমি কাজে না গিয়ে তার স্কুলের সামনে থেকে তাকে নিয়ে রিকশায় ঘুরতে শুরু করলাম। পিচ ঢালাপথে চলছে রিকশা। রিকশার হুডের নিচে প্রেমিক যুগল। প্রেমিকের হাতের বামপাশে প্রেমিকার ডানহাত। হাতের ভাঁজে হাত রেখে শপথ। মাঝে মাঝে অরুর ডান হাতের তর্জনী ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমার ওষ্ঠ। দুজনের আঙুলি ছুঁয়ে যাচ্ছিল দুটো হৃদয়কে। প্রেমিকা বাম পাশে বসে থাকলে নিজেকে হিরো মনে হয়। তারপর যা হলো!
কপাল মন্দ হলে সাদা কাপড়ে রং ওঠে!

কেন স্যার?

বাসায়, ফিরে দেখি খালা আম্মা বসে আছে। অরু মাথা নিচু করে তার রুমে চলে গেলো। খালা আম্মা আমাকে ডেকে বলল আবিদ তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। যদিও উত্তরবঙ্গের মানুষ আমি পছন্দ করি না, আমার ছোট বোনের সংসার ভেঙে যাবার কারণে। তবে আজ তুমি আমার বিশ্বাস রিকশায় রেখে এসেছো। তুমি বাসা ছেড়ে দেও।

আপনি মালিক। বাসা ছেড়ে দিতে বললে ছেড়ে দিতে হবে। তবে আমি আপনার ভালোবাসায় আঘাত করিনি।

খালা আম্মা আমাকে তখন কিছু না বলে তার রুমের দিকে চলে যায়। রাতে আমার রুমে খাবার পাঠায়। মাঝে মাঝেই রাতের খাবার তারা আমাকে দিত। কিছুদিন যেতেই পরিবেশটা শান্ত হয়। তখন আবার অরু আমার রুমে নিয়মিত আসা শুরু করল। এখন অরু আর দিনের বেলায় আসে না, রাতে আসে। সবার চোখ ফাকি দিয়ে রাতের বেলায় দেখা করা চারটি খানি কথা না! দেখা করার বুদ্ধিটা অরুর। অরু তার আঙুলের সঙ্গে আমার আঙুল সুতায় বাঁধত।

স্যার সেটা কেমন?

আমি রুমে প্রবেশ করার পর সুতায় আঙুল বাধতাম। অরু সেই সুতা জানালা দিয়ে টেনে আঙুলে বেঁধে তার রুমে শুয়ে থাকত। আমার রুমের তিনটা রুম পর অরুদের থাকার রুম ছিল। যখন সবাই ঘুমাত কোন শব্দ নেই কবর স্থানের মত শুনশান পরিবেশ তখন আমি সুতায় টান দিতাম। অরু বিছানা ছেড়ে উঠে আসত আমার কাছে। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত আমার কাছ থাকত। ভোরের দিকে তার রুমে চলে যেত।

স্যার বিষয়টা তো বেশ বুদ্ধির ছিল।

কোনটা?

সুতায় আঙুল না ভালোবাসা বাঁধা! হুম।

অরুর খুব তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছিল। ওর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করার কাছে আমি হেরে যেতাম। তারপর এভাবে প্রতিরাতে আমাদের দেখা হত। অরুর সঙ্গে আমার এত ভালোবাসার মাঝখানেও ক্যাম্পাসে এখানে সেখানে হাই হ্যালো দু একটা প্রেম আমার চলে।

স্যার, তখনো!

জি! একদিন বারবার সুতায় টান দেবার পর অরু আর আসে না। কিছু সময় পর ওর মা আসে। আমি তো অবাক। ভাবলাম খালা আম্মা হয়তো সিগারেট খাবে। আমি সিগারেট বের করতেই দেখি সে বইপত্র টেবিল থেকে বিছানায় দিয়ে বলল, কাল বাসা ছেড়ে চলে যাবে। বুঝলাম সে সব জেনে গেছে। পরদিন আমি বাসা ছেড়ে বের হয়ে আসি। আমি শুধু বাসা ছেড়ে আসি, অরুর পিঠের উপর চলে।

মিরপুর সাড়ে ১১, বাসা নং ৩/৪। গাজীপুর জেলার ডিসির বাসা। তার স্ত্রী বাসা দেখা শোনা করে। যেভাবে হোক বাসা ঠিক হলো। একটা রুম নিয়ে আমি সেখানে থাকা শুরু করলাম। অরু কালশি স্কুলে পড়াশোনা করত। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে বাসার ঠিকানা দিয়ে আসলাম। চাকরি বাদ দিলাম। সিগারেট বিলসহ যাবতীয় খরচ অরু আমাকে দিত। কারণ চাকরি করলে অরুর সঙ্গে দিনের বেলায় দেখা করতে পারব না। আমি সন্ধ্যায় দুটো টিউশনি করতাম। বাসার মালিক দোতলায় থাকত আমি নিচতলায়। পড়ালেখা করার কারণে বাসার যাবতীয় হিসাব আমি রাখতাম। এখানেও খালা আম্মার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক হয়। কিছু দিন যেতেই অরু লুকিয়ে লুকিয়ে আমার বাসায় আসা শুরু করল। দুজন গল্প করতাম। কারণ বাইরে দেখা করতে গেলে হঠাৎ কে না কে দেখে। একদিন দুজনে একসঙ্গে শুয়ে আছি, দরজা খোলা ছিল। (চলবে...)

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...