আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘কলহবিদ্যুৎ’

মাহমুদ নোমান

মানবকণ্ঠ
আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘কলহবিদ্যুৎ’ - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৫:১৯

কবিত্বশক্তিকে সহিসালামতে রাখতে নির্লিপ্ত নয়ন থাকা চাই। যা ঘটবে ভেতরে, ফাটবে না। চোখ দিয়ে জল ঝরাবে না, অক্ষরে অক্ষরে এই বোধকে শানিত করবে শব্দপ্রয়োগের নান্দনিকতায়। ছোটকালে মা-বাবা সন্তানের নাম রাখলেও কৈশোরে বা শরীর-মনের উষ্ণতার মুহূর্তে আমরা অনেকে নিজেদের নাম দিয়ে থাকি।

এটাকে আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে নিছক আবেগের কাজ-কারবার হলেও আমরা নিজেরা যে নামটি নিজের জন্য নির্ধারণ করি সেটি সম্পূর্ণ নির্ভেজাল আকুতি। এসব কথা বলবার কারণ হচ্ছে, সম্প্রতি পাঠ করা আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘কলহ বিদ্যুৎ’ কবিতার বইটির প্রতিটি কবিতা নিজেদের সে নাম রাখার ঐতিহাসিক সার্থকতার মিল পেয়ে।

কবি আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতার মধ্যে একটা আলাদা আকাশ আছে। সময় নিয়ে সে আকাশের নিচে দাঁড়াতে হয়, কোনো কাজকামের ভেতর সে আকাশের হদিস পাওয়া যাবেই না। সে আকাশটি ভাবের উচ্চতর বোধে তৈরি এবং সেটি কেবল আলতাফ শাহনেওয়াজের কাব্যিকতার নিজস্ব বলয়ের জন্য সমৃদ্ধ আর এটি হুটহাট করে তৈরি হয়নি।

এটি সময়সাপেক্ষ ছিল, কেননা আলতাফ শাহনেওয়াজের কর্মস্থলের জন্য নানান জনের বোধের-ভাবের কবিতা পড়তে হয় প্রতিদিন আর সেখান থেকে নিজেকে আলাদা করে আনা মুশকিল বটে। কেননা বেশি জেনেশুনে নিজেকে আলাদা করাটা একেবারে দুরূহ।

এক কথায় আলতাফ শাহনেওয়াজের নিজের রাখা বোধের ডাকনাম ‘নির্লিপ্ত নয়ন’ এর সামগ্রিক রূপদান ‘কলহবিদ্যুৎ’.... অথচ, কবিতা কী সেটা বলতে চাওয়াটা মাতলামি আবার মাতলামিটাই কবিতা। বিধাতাকে দেখবার জন্য মুসার পাগলামি আর বিধাতা প্রেমের কাছে নমনীয় হয়ে যেই রূপ দেখাতে গেল অত পর্দা ভেদ করে কেবল কিঞ্চিৎ রশ্মি এসেছে, সেই রশ্মির ছটকে মুসা তো বেহুঁশ! মুসা জ্বলল না, পাহাড় জ্বলে ছাই হয়ে গেল; সেই ছাই এখন মানুষের চোখের সুরমা আর সেটিই কী কবিতার উৎপত্তির নিদর্শন। নয়তো মুসা জ্বলল না কেন!

আদতে, কবিতা এমনো আপেক্ষিক আবার অনুভবের তদুপরি কবিতা সৃষ্টি হয় কবির অন্তরাত্মায়, যেখানে সে সৃষ্টির জ্বলন ঠিকই হয়, কিন্তু কাউকে দেখাতে পারে না। সে অনুভব পাঠকরা নিদর্শন দেখে আর কত আন্দাজ করতে পারে, যদি ভক্তি না থাকে....? আবার ভক্তি আনতে গেলেও কবিত্বশক্তির সঙ্গে ভাবের সারল্যতার পরেও কবিকে নির্ভেজাল বোধসম্পন্ন হতে হয়। যেটি কবিকে বিচ্ছিন্ন করে না ফেলে পাঠকের কাছ থেকে, সর্বোপরি মানুষের কাছ থেকে।

ভক্তি নিয়ে ‘কলহবিদ্যুৎ’ পাঠ পরবর্তী আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতার ভাষা, ভাব, বোধকে সামান্য উপলব্ধি করেছি, কবিত্বশক্তি নিয়ে কেউ এখনো নিভৃতে পোড়ে, কাঁদে.... ‘কলহবিদ্যুৎ’ কবিতা বইয়ের নামকবিতাটি একটি দীর্ঘকবিতা। এটির সারকথা প্রতিটা পাঠক একেকভাবে বুঝে নিতে চাইবে অথচ কবি জানেন কোনভাবে মজে কবিতাটি লিখেছেন।

আলতাফ শাহনেওয়াজের বইটির কয়েকটি কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে দিলে পাঠক বরঞ্চ বিভ্রান্ত হবে। কখনো পাঠকের কৌত‚হলকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কেননা আলতাফ শাহনেওয়াজের প্রতিটি কবিতা পুরোপুরি পড়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তবুও পাঠকের যাচনাকে স্মরণ করে উল্লেখ করছি-

ক. ঘটনার মধ্যে দাঁড়িয়ে, ঘটনা থেকে দূরে / এই চোখ / দেখে / তোমার শাড়িতে রক্ত/ আর / আমাদের সুখী নৃশংসতা / নীরবে বিচ্ছিন্ন ঘটনার মতো দেখে
তোমার শরীরে আমার লাশটিকে কবর দেয়া হয়
-সমাধি; ১১ পৃ.)

খ. গল্পে আছে দৈত্যমাখা ভয়
বজ্র-জাগা দুয়োরানির মেয়ে
তার জন্য বাতাসটুকু থাক;
এবার পাশে বসো সিলিং ফ্যান
কুয়াশা হয়ে লেখো কেবল-আমি
ঝুলন্তকে উড়িয়ে দেব কাল!
-প্রচ্ছন্ন; ১৪ পৃ.)

গ. ফুল, কাননজুড়ে কী শান্ত উৎপীড়ন!
মনোরম অন্ধকারে নাচো
-পুষ্প, আপনার জন্য; ১৬ পৃ.)

আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতা পরিমিত চিত্রকল্পের জালিকাকার স্বর ও মানবিক চেতনায় নিজস্ব আর প্রতিটা কবিতার গল্পগুলো স্নায়ুজালকে বেশ আলোড়িত করে। গীতলতার ছন্দে ভেসে চলে কবিতার ভাষা ও বোধের নোওকা। পাঠকই তড়িতাহত হবে সৌন্দর্যবোধের পথমধ্যে আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘কলহবিদ্যুৎ’ এ.... এই কলহ চিরকালের সৃষ্টিশীল যেমন তেমনি মায়াবী ও ক্রিয়াশীল।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...