হুমায়ূন আহমেদ : বহুমাত্রিক প্রতিভায় উজ্জ্বল নক্ষত্র


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ জুলাই ২০১৯, ২১:১৯

বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হুমায়ূন আহমেদের আজ ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। প্রতিটি শাখায় ভিন্নমাত্রার আবহ সৃষ্টি করে পৌঁছে গেছেন সাফল্যের শিখরে। একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক বলে গণ্য করা হয়। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। অন্য দিকে তিনি আধুনিক বাংলা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর পথিকৃত্। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

বাংলা সাহিত্যর এই বরপুত্রকে নিয়ে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস মূল্যায়ন করে বলেছিলেন, ‘হুমায়ূনের কাজসমূহ সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গভীর ভাবসম্পন্ন ও সবচেয়ে ফলপ্রসূ।’ একই রকমভাবে, বাংলাদেশি কবি আল মাহমুদ তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ঠাকুর ও নজরুলের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগ শেষ হয়েছে এবং আরেকটি শুরু হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের মধ্য দিয়ে।’ ইমদাদুল হক মিলন তাকে ‘বাংলা সাহিত্যের সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকারী’ বলে উল্লেখ করে থাকেন, যিনি তার সৃষ্ট চরিত্রের সব কাজ ও চিন্তা-ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করেন। বাঙালি লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাকে ‘বাংলা সাহিত্যে একটি শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক’ উল্লেখ করেন এবং তার মতে, ‘শরত্চন্দ্র চট্টোপাধায়ের চেয়েও জনপ্রিয় ছিলেন’। বাঙালি লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাকে ‘উপমহাদেশের অন্যতম সেরা লেখক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বাংলাদেশি লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।’ পাকিস্তানের প্রাচীনতম ও সর্বাধিক পঠিত ইংরেজি সংবাদপত্র ডন তাকে ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কিংবদন্তি’ বলে উল্লেখ করে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তার পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তত্কালীন পিরোজপুর মহকুমার উপ-বিভাগীয় পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। তার বাবা সাহিত্যানুরাগী মানুষ ছিলেন। তিনি পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। বগুড়া থাকার সময় তিনি একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন, গ্রন্থের নাম দ্বীপ নেভা যার ঘরে। তার মার লেখালেখির অভ্যাস না থাকলেও শেষ জীবনে একটি আত্মজীবনী গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম জীবন যে রকম। তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন শিক্ষাবিদ এবং কথাসাহিত্যিক; সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট। তার তিন বোন হলেন সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহিদ ও রোকসানা আহমেদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে একটি উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের শুরু। এই উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত বাংলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। বইটির প্রচ্ছদ করেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ভাস্কর শামীম শিকদার। উপন্যাসটি লেখক শিবির হতে বর্ষসেরা উপন্যাসের পুরস্কার লাভ করে। শঙ্খনীল কারাগার তার লেখা প্রথম উপন্যাস কিন্তু প্রকাশিত ২য় গ্রন্থ। তার রচিত তৃতীয় উপন্যাস বিজ্ঞান কল্পকাহিনীমূলক তোমাদের জন্য ভালোবাসা। বিজ্ঞান সাময়িকী সাপ্তাহিক পত্রিকায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

সত্তর দশকের এই সময় থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই কালপর্বে তার গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। তার সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রগুলো বাংলাদেশের যুবকশ্রেণিকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীও তার সৃষ্টিকর্মের অন্তর্গত, তার রচিত প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী তোমাদের জন্য ভালোবাসা। তার টেলিভিশন নাটকসমূহ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সংখ্যায় বেশি না হলেও তার রচিত গানগুলোও জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার রচিত অন্যতম উপন্যাসগুলো হলো মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া, লীলাবতী, কবি, বাদশাহ নামদার ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সর্ব সাধারণ্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ১৯৯৪-এ তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধভিত্তিক আগুনের পরশমণি মুক্তি লাভ করে। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ আটটি পুরস্কার লাভ করে। তার নির্মিত অন্যান্য সমাদৃত চলচ্চিত্র হলো শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), দুই দুয়ারী (২০০০), শ্যামল ছায়া (২০০৪), ও ঘেঁটুপুত্র কমলা (২০১২)। শ্যামল ছায়া ও ঘেঁটুপুত্র কমলা চলচ্চিত্র দুটি বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য দাখিল করা হয়েছিল। এছাড়া ঘেঁটুপুত্র কমলা চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালনা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

প্রথম টিভি দেখেছিলেন পঁয়ষট্টি সালে। টেলিভিশন ভবনেও যাওয়া-আসা ছিল। তবে টিভি দেখতে তার ভালো লাগত না। প্রযোজক নওয়াজীশ আলী খানের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। একটা ভৌতিক নাটক লিখলেন। সে নাটক বাদ। ঈদ উপলক্ষে একটা নাটক লিখলেন। সেটাও অপ্রচারিত রয়ে গেল। টিভির লোক নন তিনি। তারপরও নাটকে জড়িয়ে যাচ্ছিলেন। নওয়াজীশ আলী খানের প্রযোজনায় একক নাটক ‘প্রথম প্রহর’ দিয়েই শুরু। আশির দশকের গোড়াতেই করলেন ‘এইসব দিনরাত্রি’, মোস্তফিজুর রহমানের প্রযোজনায়। নাটকের জগত্ উল্টে-পাল্টে দিলেন। ‘নিরস গল্প’ নামে দুটি এপিসোড নিয়ে গেলেন নওয়াজীশ আলী খানের কাছে। পরিবর্তিত নামে সেটা হয়ে গেল ‘বহুব্রীহি’। ‘এইসব দিনরাত্রি’ ও ‘বহুব্রীহি’ সিরিয়াল দুটি লেখার পর একিদন ঘুরতে গেলেন গারো পাহাড়ে। সেখানে পেলেন ‘অয়োময়’ নাটকের প্লট। এভাবেই টেলিভিশন নাটকের সর্বকালের জনপ্রিয় নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের নাটক জীবন শুরু। বরকতউল্লাহর প্রযোজনায় ‘কোথাও কেউ নেই’ দিয়ে দর্শকপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলেন। এই দর্শকপ্রিয়তা অটুট ছিল বিটিভি আমল থেকে ফি ঈদে তার নাটক নিয়ে চ্যানেলগুলোর সাম্প্রতিক যুদ্ধ পর্যন্ত। এর পেছনে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র সৃষ্টির অনুকরণীয় ক্ষমতা। তার নাটকের চরিত্ররা দর্শকের মধ্যে তৈরি করেছে মোহ। পর্দা ছাড়িয়ে রাস্তায় তার চরিত্রের সমর্থনে হয়েছে মিছিল। এসব চরিত্রে অভিনয় করে অনেক অভিনয়শিল্পী খ্যাতির চূড়ায় উঠে গেছেন। অনেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী পেয়েছেন আত্মপরিচয়।
চরিত্র সৃষ্টিতে অনবদ্য এই কারিগর আসাদুজ্জামান নূরকে নিয়ে তিনি এক্সপেরিমেন্টাল করে এইসব দিনরাত্রির রফিক, অয়োময়ের মীর্জা সাহেব, মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারের নান্দাইলের ইউনূস, কোথাও কেউ নেই-এ বাকের ভাই ইত্যাদি। বাকের ভাই এমন একটি চরিত্র যার ফাঁসির রায়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদ সভা হয়েছে। আগুনের পরশমণির মুক্তিযোদ্ধা নূর, শঙ্খনীল কারাগারের কলেজপড়ুয়া বেকার যুবক, চন্দ্রকথার দাম্ভিক জমিদার, হুমায়ূনের সেলুলয়েডেও আছেন নূর। তার এমন কম নাটকই আছে যেখানে নূরের উপস্থিতি নেই।

মিসির আলী চরিত্র কার না মনে দাগ কেটেছিল—আবুল হায়াতকে তিনি এমন আবহ তৈরি করেছিলেন যে মিসির আলীর কথা মনে করতেই ভেসে উঠে মিসির আলীর চরিত্রে অভিনয় করা আবুল হায়াতের কথা। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে আবুল হায়াত এক অপরিহার্য অভিনেতা। অয়োময়ের গরিবী হাল থেকে উঠে নতুন জমিদার হোক আর অন্যান্য নাটকে বাবার চরিত্রেই হোক, হুমায়ূন আহমেদের নাটক বলতেই আবুল হায়াত আছেন।
পাশাপাশি এইসব দিনরাত্রিতে সুখী নীলগঞ্জ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মাস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে আবুল খায়েরের যাত্রা শুরু। এরপর তার অসংখ্য নাটকে অভিনয় করছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বহুব্রীহির দাদা, আজ রবিবারে বাবাসহ এ ধরনের অনেক চরিত্র।
‘বহুব্রীহি’ নাটকে পাগলাটে মামার চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন আলী যাকের। সারা বাংলার মামা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে পাগলাটে ধরনের চরিত্র হলেই ডাক পড়ত আলী যাকেরের। আজ রবিবারেও তার অভিনয় অনেকের মনে আছে।

হুমায়ূন আহমেদের অনেক নাটকেই কাজ করেছেন সুবর্ণা মুস্তাফা। তবে কোথাও কেউ নেই’ নাটকে মুনা চরিত্রে তার অভিনয় তাকে যতটা জনপ্রিয়তা দিয়েছে তার আর কোনো নাটক তাকে দিতে পারেনি। এই একটি চরিত্রই তাকে দর্শকের কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

আজ রবিবারে চশমাপরা আর আহ্লাদি কণ্ঠে কথা বলা আনিসের চরিত্র, সবুজ সাথী নাটকে লাঠিধরা পাগলা মফিজের চরিত্র, শ্রাবণ মেঘের দিনে ছবিতে গাতক মতির চরিত্র, হুমায়ূন আহমেদের নাটক—সিনেমায় জাহিদ হাসান এক আবশ্যক চরিত্রে।

অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জার শালির চরিত্রে তার অভিনয় ছিল মনে রাখার মতো। এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের অনেক নাটকেই অভিনয় করেছেন বিপাশা। তবে বিপাশার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন জাতীয় পুরস্কার তিনি পেয়েছেন ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে।
অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জার বড় বউ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সারা যাকের। স্বল্পসংখ্যক টিভি নাটকে অভিনয় করা সারা যাকেরকে এই একটি চরিত্রের জন্যই শুধু অনেক দর্শক তাকে মনে রেখেছেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে অভিনয় কম করলেও তাকে ভোলার উপায় নেই।

এইসব দিন রাত্রি নাটকে মা, ভাবী আর স্ত্রী এই তিন ভূমিকায় অভিনয় করে টিভি নাটকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান তৈরি করেন ডলি জহুর। এরপর হুমায়ূন আহমেদের অনেক নাটকে বাধাধরা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। সিনেমায় পা রাখার পর ‘আগুনের পরশমণিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেন।

অভিনেতা হিসেবে তার জন্ম কোথাও কেউ নাটক দিয়ে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের কত নাটকে অভিনয় করেছেন— মাহফুজ তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিশেষত হুমায়ূন আহমেদের সিনেমাগুলোতে মাহফুজ চমত্কার সব চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন।

হুমায়ূন আহমেদই শাওন নামের অভিনেত্রীটির স্রষ্টা। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ছাড়া তাকে দেখা যাওয়া বিরল অভিজ্ঞতা টিভি দর্শকদের কাছে। আজ রবিবারের কঙ্কা চরিত্রটিই তাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। হুমায়ূন আহমেদের সিনেমাগুলোতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয় প্রতিভা মেলে ধরার অনন্য সুযোগ পেয়েছেন শাওন। হুমায়ূন আহমেদের সর্বোচ্চসংখ্যক নাটকের অভিনেত্রী গর্বিত হতেই পারেন তিনি।
শক্তিমান অভিনেতা মমতাজউদ্দিন আহমেদকে শঙ্খনীল কারাগারে বাবার চরিত্রেই দর্শক দীর্ঘদিন তাকে মনে রাখতে চাইবেন। পুরো পরিবারের ভরণপোষণের ভারে চাকরি থেকে অবসর নেয়া বাবার ভূমিকায় তার অভিনয় সত্যি মনে রাখারই মতো।

কখনো মা, কখনো দাদি, বিভিন্ন নাটকে তার উপস্থিতি বিভিন্ন রকম। তবে অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জার জমিদারি দেখাশোনায় পটু অন্ধ মায়ের ভূমিকায় দিলারা জামানের অভিনয় সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। আজও দর্শক তাকে মনে রেখেছেন এই চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য।
কাদের, মোবারকসহ নানা ভৃত্যের চরিত্রে আফজাল শরীফের বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় তাকে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতায় পরিণত করেছিল। এখান থেকেই কমেডিয়ান হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়।

শিলা আহমেদ অভিনয় ছেড়েছেন বহুদিন। হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে হলেও চরিত্র আর অভিনয়ের কারণেই দর্শক আজো তাকে মিস করেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকের বাঁধা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। পেয়েছেন অসম্ভব জনপ্রিয়তা। আজ রবিবারের তিতলী কিংবা কোথাও কেউ নেইতে মিমির ছোট বোন, সবটাতেই দারুণ অভিনয় করতেন তিনি। আগুনের পরশমণিতে যেমন অভিনয় করেছেন অসাধারণ, তেমনি নিম ফুল নাটকে তার একার অভিনয় ছিল উপভোগ করার মতো।

একদিন প্রতিদিন নাটকে কঙ্কাল বেয়ে বেরানো লজিং মাস্টার, কোথাও কেউ নেই নাটকে সত্ উকিল, সবুজ সাথী নাটকে ঘোড়ায় চড়া ভিড়ুক, হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই হুমায়ূন ফরীদির স্বল্প অথচ সরব উপস্থিতি। শ্যামল ছায়া ছবিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অভিনয় ছিল আলাদা করে ভাবার মতো।

শ্রাবণ মেঘের দিনের ঢুলির চরিত্রে ডা. এজাজুল ইসলামের অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে। হুমায়ূন আহমেদ এই অভিনেতাটিকেও ডাক্তারি আঙিনা থেকে এনে একের পর এ দুর্দান্ত চরিত্রে অভিনয় করিয়ে দর্শকের হূদয়ে বসিয়ে দিয়েছেন। গত দুই তিন বছরে হুমায়ূন আহমেদ যত কাজ করেছেন তার পঁচানব্বই শতাংশ নাটক-সিনেমাতেই তার অসাধারণ উপস্থিতি রয়েছে।

বলা চলে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে অভিনয় যে কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রীর জন্য ছিল ভিন্ন মাত্রার এক অভিজ্ঞতা। বহু তারকার জন্ম হয়েছে তার নাটকে অভিনয় করে। তিনি হাতে ধরে তুলেছেন অনেক অভিনয় শিল্পীকেই। মাজনুন মিজান, দিহান, পুতুল, এমন অনেক শিল্পীরই তার নাটক দিয়ে উত্থান। মহিলা কমেডিয়ান শবনম পারভীন তারই নাটকের কুশলী। মনিরা মিঠুও একইভাবে দর্শকচিত্ত জয় করেছেন। আশির দশকে রহিমার মা চরিত্রের আড়ালে হারিয়ে গেছেন মাহমুদা খাতুন। লুত্ফর রহমান জর্জ কোথাও কেউ নেই নাটকে মজনু চরিত্রে অভিনয় করে অমরত্ব পেয়েছেন। মুক্তি শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিতে পেয়েছেন ক্যারিয়ারের সেরা চরিত্র। গোলাম মুস্তাফা, আফসানা মিমির মতো তারকারা যখনই হুমায়ূন আহমেদের নাটকে-সিনেমায় কাজ করেছেন তা নতুন কিছু যোগ করেছে তাদের অভিনয় জীবনে। টেলিভিশন নাটকের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যকার-নির্মাতা হিসেবে অগণিত দর্শকনন্দিত নাটকের পাশাপাশি অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্টি করেছেন। এসব চরিত্রের মুখে জনপ্রিয় ‘মাইরের মদ্যে ভাইটামিন আছে’, ‘সালাম ইজ নট রিকোয়ার্ড’, ‘আমি নেত্রকোনার পোলা’, ‘বেশি কথা বলা আমি পছন্দ করি না’ সংলাপগুলো এক সময় আওড়েছে জনগণ। চরিত্রগুলোও সময় পেরিয়ে দর্শকপ্রিয়তার নতুন নতুন নজির তৈরি করেছে। এসব চরিত্রে অভিনয় করেই ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে গেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।

হুমায়ূন আহমেদ তার অসংখ্য বহুমাত্রিক সৃষ্টির জন্য নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৩ সালে লেখক শিবির পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা উপন্যাসে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি মাইকেল মধুসূদন পদক লাভ করেন। ১৯৯০ সালে তিনি হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯৯২ সালের শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯৪ সালে দেশের দ্বিতীয় বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। একই বছরের আগুনের পরশমণি চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা বিভাগে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ও শ্রেষ্ঠ গীতিকার বিভাগে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া চলচ্চিত্রটি সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিনের জরিপে সমালোচকদের বিচারে সেরা দশ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের তালিকায় নবম স্থান লাভ করে।

সেই সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে তৌকীর আহমেদ নির্মিত দারুচিনি দ্বীপ (২০০৭) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। আমার আছে জল (২০০৮) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ১১তম মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সমালোচক পুরস্কার শাখায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক বিভাগে মনোনয়ন লাভ করেন। তার উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম নির্মিত প্রিয়তমেষু (২০০৯) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। ঘেঁটুপুত্র কমলা (২০১২) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক এবং শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগে দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ১৫তম মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সমালোচক পুরস্কার শাখায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। তার উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম নির্মিত অনিল বাগচীর একদিন (২০১৫) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ৪০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মরণোত্তর শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার পুরস্কার লাভ করেন।

বর্ণিল জীবনের অধিকারী জীবনের শেষভাগে ঢাকা শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমণ্ডির ৩/এ রোডে নির্মিত দখিন হাওয়া ভবনের একটি ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করতেন। খুব ভোর বেলা ওঠা অভ্যাস ছিল তার, ভোর থেকে সকাল ১০-১১ অবধি লিখতেন তিনি। মাটিতে বসে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কখনো অবসর পেলে ছবি আঁকতেন।

২০১১-এর সেপ্টেম্বের মাসে সিঙ্গাপুরে ডাক্তারি চিকিত্সার সময় তার দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিত্সা গ্রহণ করেন। তবে টিউমার বাইরে ছড়িয়ে না পড়ায় সহজে তার চিকিত্সা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হলেও অল্প সময়ের মাঝেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। মলাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিত্সাধীন ছিলেন। কৃত্রিমভাবে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই পুরো বাংলাদেশকে শোকসাগরে ভাসিয়ে নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এখন শুয়ে আছেন তার হাতে গড়া স্বপ্নের আঙিনা নুহাশ পল্লীতে।

হুমায়ূন আহমেদের জীবন ও কর্ম নিয়ে বইয়ের পর বই রচিত হবে তবে ইতিহাস শেষ হবে না। তার প্রতিটি সৃষ্টিই এক একটি অধ্যায়। যে অধ্যায়ের শুরু আছে শেষ নেই।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...