আবার হলো যে দেখা


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২২ জুন ২০১৯, ১৫:২০,  আপডেট: ২৩ জুন ২০১৯, ১২:৩৬

দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর পর আমাদের মধ্যে আবার যোগাযোগ হলো। অবিশ্বাস্য হলেও এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের মধ্যে একবারের জন্যও দেখা বা কথা হয়নি অথচ এমনটি হওয়ার কোনো কথা ছিল না। কথা ছিল আমরা এক সঙ্গেই থাকব। একই ছাতার নিচে। আমাদের সমসাময়িক যারা ছিল, যারা আমাদের চিনত তারা সবাই ধরেই নিয়েছিল আমাদের বিয়ে হবে। আমাদের দুজনের একটাই সংসার হবে। আমরা সুখী হব। আমরা একে অন্যের হাত ধরে সারাটা জীবন পার করে দিবো। আমরা বিয়ে করেছি, আমাদের সংসারও হয়েছে ঠিক। তবে তা আলাদা, আলাদা। ওর একটি সংসার, আমার আরেকটি।

রাত তখন অনেক হয়ে গিয়েছিল। ইউটিউবে গান শুনছিলাম। ইদানীং এটা আমার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। রাতে শুয়ে শুয়ে গান শোনা। কোনো নির্দিষ্ট গান শুনি তা নয়। ইউটিউবে সার্চ দিয়ে গানের কথা ও সুরটা ধরার চেষ্টা করি। যদি ভালো লাগে, মনে লাগে তবে গানটা পুরো শুনি। কোনো কোনো সময় একই গান বেশ কয়েকবার শুনি। তাতে শিল্পী যেই হোক। পৃথিবীর সব ভাষা যে আমি বুঝি তা নয়। তবে শিল্পীর ভাবভঙ্গিতে গানের কথা না বুঝলেও কী বলা হচ্ছে তা বুঝতে পারা কঠিন নয়। সে রাতে আমি ‘আমেরিকান গেট ট্যালেন্ট’ নামে একটি রিয়্যালিটি শো দেখছিলাম। একটি কালো মেয়ে হুইটনি হিউসটোনের ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানটি গাইছিল। আহারে এত সুন্দর করে কেউ ভালোবাসার গান গাইতে পারে? বারবার চোখ ভিজে আসছিল। মেয়েটি চলে যাচ্ছে, প্রেমিক মানুষটি তাকে বিদায় জানাতে এসেছে। কী মলিন, কী অসহায় মুখচ্ছবি প্রেমিকের! মেয়েটি গানের সুরেই বলছে সো গুড বাই, প্লিজ ডোন্ট ক্রাই...। মেয়েটি জানাচ্ছে তাদের মধ্যে গুরুত্ব যতই হোক, যা কিছুই ঘটুক ভালোবাসা হারাবে না। সব সুখ স্মৃতিগুলো সে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে। সারাজীবন সে ছেলেটিকে ভালোবেসেই যাবে।

বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথা হচ্ছিল। কিন্তু গানটি শোনার সময় একবারও ভাবিনি আমি আমার কথা, ভাবিনি শুভ্রা আর আমার কথা। ভাবিনি বহুদিন আগে আমরা আলাদা হয়ে গেছি। আমাদের মধ্যে এখন হাজার মাইলের দূরত্ব। এখন আমাদের আর দেখা হয় না। কথা হয় না। এখন আমরা কেউ কারো হই না। অথচ এক সময় এক মুহূর্তের জন্য কেউ কাউকে না দেখে, কথা না বলে থাকতে পারতাম না। যেদিন কোনো কারণে কথা হতো না সেদিন আমাদের খাওয়ায় অরুচি হতো, চোখের পাতা থেকে ঘুম উধাও হয়ে যেত। একদিনেই চোখের নিচে কালি জমত। পরদিন দেখা হলে আমরা কেউ কাউকে কিছু বলতাম না। কিন্তু দু’জনেই বুঝে ফেলতাম, আমরা একে অন্যের জন্য কষ্ট পেয়েছি। সেই আমরা দু’জন হঠাৎ আলাদা হয়ে গেলাম। কেন গেলাম, কী হয়েছিল আজো জানা হয়নি। সেবার আমাদের ক্যাম্পাসে ঈদের ছুটি হলো। আমি ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এলাম। এরপর আর ও ফিরে এলো না। এ রকম ছুটিতে আমরা প্রতিদিন দু’জন দু’জনকে চিঠি দিতাম। যাতে একদিনও চিঠি পড়া বাদ না যায়। যাতে একদিনও আমাদের কথা বলা বন্ধ না হয়। কিন্তু সেবার আর চিঠি এলো না।

প্রতিদিন আমি পোস্ট অফিসে গিয়ে শূন্যহাতে ভাঙ্গা বুক নিয়ে ফিরে আসি। ক্যাম্পাসের চারপাশে স্মৃতি হাতাই। যেদিকে তাকাই শুভ্রাকে নিয়ে আমার কাটানো সময়গুলো খিল খিল করে হেসে ওঠে। সেই হাসি শুনে আমার কান্না পায়! কিন্তু কিছু করার নেই। শুভ্রার বাড়ি গিয়ে ওর খবর নেয়ার মতো বীর পুরুষ আমি নই। আর সেটা ভালোও দেখায় না।

ছুটি শেষ হওয়ার আগেই আমি আমার হোস্টেলের রুমে এসে উঠি। ভেবেছিলাম, ও আমার মতোই তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। তখন যদি আমাকে না পায়? অনেকদিন হয়ে গেল আমাদের কথা হয় না। অনেক কথা জমে আছে, সে সব বলতে তো হবে। কিন্তু শুভ্রা আর ফিরে এলো না। আমি অপেক্ষা করতে করতে এক সময় পাথর হয়ে গেলাম। ঘোর বরষার দিনে, বসন্তের লু হাওয়ায় মন কেমন বিষন্ন হয়ে উঠত। ঘন কুয়াশার মধ্যে মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে ওকে আমার মনে পড়ে যেত। চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতাম শুভ্রার পায়ের শব্দ কী শুনেছি আমি এই ভেবে। বসন্তের লু হাওয়ায় অকারণে চোখ ভিজে আসত। তার পর এক সময় সময়ের কাছে হেরে গেলাম আমি।

সেই আমি আর শুভ্রা আমরা কী অদ্ভুতভাবে গুছিয়ে সংসার করছি। হ্যাঁ অনেক পরে জেনেছিলাম শুভ্রার বিয়ে হয়ে গেছে। বহুদিন দেবদাস জীবন কাটিয়ে একদিন আমিও বিয়ে করে ফেললাম। এরপর হয়তো কেউ কাউকে আর মনে রাখিনি অথবা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেই দিন মাস বছর পার করে গেছি। কেউ সে বন্ধ দরজায় নাড়া দেবার সাহস পাইনি বা পাই না হয়তো। সাহস হবার কথাও নয়। নাড়া দিলে যে নিজের ভেতর আমি নিজেই ভেঙ্গেচুরে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবো।

শুভ্রা যখন আমাকে ফোন করল তখনো আমি গান শুনছিলাম। রাতও কম নয়। এত রাতে আননন কোনো নম্বর রিসিভ করার কথা নয়। তবু কেনো যেন করলাম। ওপাশ থেকে শুভ্রা যখন জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো? তখন একবারও মনে হলো না দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর আমরা কথা বলি না। আমাদের দেখা হয় না। এত দীর্ঘ সময় পর শুভ্রার কণ্ঠস্বর চিনতে এক মুহূর্ত কষ্ট হয়নি আমার! আমার বুকের ভেতর এতদিনের জমিয়ে রাখা স্মৃতি, আটকে রাখা যত আবেগ একসঙ্গে সব আমার অনুভ‚তির বারান্দায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। নিজের ভেতরে নিজের ভেঙ্গে পড়ার ঝন ঝন শব্দে আমি কেঁপে কেঁপে উঠলাম। চোখ ভিজে গেল আমার। আমি জানি না একই সঙ্গে কেন যেন অদ্ভুত রকমের আনন্দ হচ্ছিল। বুকের ভেতর কে যেন চিৎকার করে বলছিল, আমি পেয়েছি। আমি ওকে ফিরে পেয়েছি। সেদিন আমার স্ত্রী বাসায় ছিল না। শুভ্রার কণ্ঠ শুনে আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারছিলাম না। শুভ্রা আবার জিজ্ঞেস করল-চিনতে পেরেছ? নিজেকে সামলে বললাম-হ্যাঁ।

বলতে গিয়ে টের পেলাম গলাটা কেমন ভারী মনে হচ্ছে! অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করলে যেমন হয়! কিন্তু আমি তো কাঁদিনি! শুভ্রা থেমে থেমে ধীরে ধীরে কথা বলছিল আমার সঙ্গে। আমার শরীরের খোঁজ নিল। সংসারের খোঁজ নিল। আমার স্ত্রীর সঙ্গেও আলাপ করতে চাইল। বললাম, বাচ্চাদের নিয়ে সে বেড়াতে গেছে। তাহলে একা বাসায় কে রান্না করে দিচ্ছে।

খাবার বেড়েই বা দিচ্ছে কে? একা একা আমি সব সামলে চলতে পারছি কিনা তাও জানতে চাইল। এভাবে আরো টুকটাক নানা কথা। কথা বলতে বলতেই আমরা কথা হারিয়ে ফেলছিলাম। এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। আবার অপ্রয়োজনীয় কোনো টপিক নিয়ে কথা শুরু।

শুভ্রার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি প্রথমে শোয়া থেকে বিছানার ওপর উঠে বসলাম। তারপর কখন যেন নেমে এলাম। আমার কান থেকে হেডফোন কখন খুলে পড়ে গেল আমি জানি না। আমি গভীর রাতের শূন্যতা মেখে ঘরময় হেঁটে হেঁটে কথা বলতে লাগলাম। আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। শুভ্রার জন্য আমার বুকের ভেতর আটকে থাকা হাহাকার আমাকে জাপটে ধরে ফোঁপাতে লাগল। আমি কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে আমি চোখ মুছে নিচ্ছিলাম। আমি শুভ্রাকে তা বুঝতে দিচ্ছিলাম না। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে দেখি। ওর কাছে ছুটে যাই। হাত ধরে বসে থাকি। ওর হাত ধরে বাচ্চাদের মত কেঁদে কেঁদে শুভ্রাকে বলি, আমাকে ফেলে তুমি কোথায় গেছিলে। আমি পাগলের মতো তোমাকে খুঁজেছি, তোমার চিঠির জন্য প্রতিদিন পোস্ট অফিসে গিয়ে বসে থেকেছি। শেষ মেইলটা আসা পর্যন্ত বসে অপেক্ষা করেছি। তোমার চিঠি আসেনি। আমি মাথার চুল টানতে টানতে গ্রামের শূন্য পথে একা একা বাড়ি ফিরেছি। পরের দিন আবার এসেছি। তখন অনেকেই ভেবেছিল আমি পাগল হয়ে গেছি বা যাচ্ছি। তোমাকে ছাড়া আমার থাকতে খুব কষ্ট হয়ে ছিল শুভ্রা।

এসব আমি ভেবেছিই শুধু। শুভ্রাকে কিছু বলিনি। ভাবতে ভাবতে আমি ভুলে গেলাম আমার বয়স হয়েছে। আমার দুটো সন্তান রয়েছে। ভরাট একটি সংসার আছে আমার।
অনেক রাত অব্দি আমরা কথা বললাম। গুছিয়ে কোনো কথা নয়। এলোমেলো, আগোছালো। আমার স্ত্রী বাসায় না থাকায় শুভ্রাও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মন খুলে কথা বলার সুযোগ পেল। এর মধ্যে একবারও আমি শুভ্রার বর্তমান জীবন নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখালাম না। জানতে চাইলাম না এখন শুভ্রা কেমন আছে? এত কথার মাঝ থেকে জরুরি অনেক কথা হারিয়ে গেল। একবার কথা উঠতে উঠতে উঠল না। শুভ্রা বললঃ আমাদের যেদিন দেখা হবে, সেদিন আমরা অনেক কিছু জেনে নেবো। আমি বাধ্য ছেলের মতো বললাম-আচ্ছা।

একবারো ভাবলাম না, আমি এখন কেন শুভ্রার সঙ্গে দেখা করবো? আমাদের এখন আর দেখা হওয়ার কী আছে? জানারই বা কী আছে? জেনেই বা কী হবে?
আরো অনেক কথার পর অবশেষে দিনক্ষণ ঠিক হলো। শুভ্রা একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কথা বলল। আমরা দেখা করবো। তরুণ বয়সের সেই উত্তেজনা নিয়ে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। এ ক’দিনে কত কথা যে মনে পড়ল। শুভ্রার সঙ্গে এতদিন পর দেখা হওয়াটা পৃথিবীর সবশ্রেষ্ঠ আনন্দময় ঘটনার একটি বলে মনে হলো।

এক তোড়া গোলাপ ফুল হাতে শুভ্রার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম, ওর বলে দেয়া জায়গায়। আজকাল ঢাকা শহরে আড্ডা দেয়ার, কারো সঙ্গে দেখা করার কত জায়গা! আগে এত ছিল না। যতটা সম্ভব নিজেকে পরিপাটি, গোছানো করে নিয়ে এসেছি আমি। বসে আছি শুভ্রার জন্য। কত কথা যে ভাবছি, কত কথা যে মনে পড়ছে! অপেক্ষার সময় আর কাটে না। অপেক্ষা করতে করতে যখন আর তর সইছে না তখন শুভ্রা এলো। শুভ্রা এসে সরাসরি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। ছোট্ট করে একটু হাসল। শুভ্রাকে রেস্টুরেন্টের ভেতরে আসতে দেখেই আমার কান্না চলে আসছিল। নিজেকে সামলে নিলাম।

ছোট্ট একটি টেবিলে মুখোমুখি বসলাম আমরা। ফুলের তোড়াটি হাতে দিয়ে আমি তাকিয়েই রইলাম শুভ্রার মুখের দিকে। আমার মুখে কথা সরছে না। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। আমি এখন আর নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছি না। পড়–ক পানি। শুভ্রা দেখুক আমি কেমন আছি।

ছাব্বিশ বছর পর আমরা মুখোমুখি। আমি তাকিয়েই আছি শুভ্রার দিকে। আলতো করে ধরে আছি শুভ্রার হাত। দেখছি, আমার শুভ্রা বদলে গেছে অনেক। বয়স হয়ে গেছে তাই আগের চেয়ে ভারী হয়েছে শরীর। সেই ঘন কালো চুল আর নেই। চোখের উজ্জ্বলতাও কমেছে অনেকটা। তবু ওকে দেখে তেষ্টা মিটছে না আমার।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads





Loading...