যাচ্ছেন ভাগ্য পরিবর্তনে, ফিরছেন কফিন বন্দি হয়ে

লাশের কফিন - প্রতীকী

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৩৪,  আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৫৭

নাজমা আক্তার। বয়স ৪০। গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জে। গত ১০ মাস আগে দালালের মাধ্যমে ১ লাখ ৮০ হাজার টাক খরচ করে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় পাড়ি জমান সৌদি আরব। স্বপ্ন ছিল অভাবের সংসারে আনবেন স্বচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন কফিন বন্দি হয়ে ফিরে আসলেন বাংলাদেশে।

শুধু নাজমা নয়। তার মতো গড়ে ১১ জন কর্মী প্রতিদিন লাশ হয়ে দেশে ফিরেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৩৯ হাজার ৭৪৯ জন শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে।

এর মধ্যে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ৮ মাসে এসেছে ২ হাজার ৬শত ১১ জনের লাশ। সরকারি হিসেব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ১১ জন শ্রমিকের লাশ দেশে আসছে বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে।

নাজমার স্বজনদের অভিযোগ, সৌদিতে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগকর্তার পরিবার  কর্তৃক চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হন নাজমা। বাড়ির মালিকের ছেলে তাকে প্রায়ই যৌন নির্যাতন করত। কথা না শুনলে বেধড়ক মারপিটও করা হতো। এমনকি ওই বাড়ির অন্যরাও সুযোগ পেলেই তার ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাতেন। মৃত্যুর দু’দিন আগেও নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য স্বজনদের কাছে আকুতি জানান নাজমা।

কিন্তু অর্থাভাবে তাকে দেশে ফিরে আনা সম্ভব হয়নি। অমানুষিক নির্যাতনে নাজমার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। কিন্তু নাজমার মতো যারা কফিন বন্দি হয়ে দেশে ফিরেন তাদের ময়নাতদন্তের রিপোর্টে লেখা হয় আত্মহত্যা অথবা স্বাভাবিক মৃত্যু। এমন রিপোর্ট কেউ কখনো চ্যালেঞ্জ করেনি। ফলে অনেকের কর্মস্থলে নির্যাতিত হয়ে মারা গেলেও তা স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তের ব্যাপারে নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ। এমনকি তাদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নেই কোনো নজরদারি।

স্বয়ং প্রবাসী ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলছেন, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডজন খানেক শর্তসহ চুক্তি হলেও এর কোনোটিই মানছে না দেশগুলো।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭ শত ৮৯ জন বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসী রয়েছেন। যার মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৭ লাখ ২শত ৭৮ জন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী জানা গেছে, বিগত ২০০৫ সালে ১ হাজার ২৪৮ জন, ২০০৬ সালে ১ হাজার ৪০২, ২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৭৩, ২০০৮ সালে ২ হাজার ৯৮, ২০০৯ সালে ২ হাজার ৩১৫ জন, ২০১০ সালে ২ হাজার ৫৬০, ২০১১ সালে ২ হাজার ৫৮৫, ২০১২ সালে ২ হাজার ৮৭৮, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৭৬, ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৩৩৫, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৩০৭, ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৪৮১, ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৮৭ জন প্রবাসীর লাশ দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে এসেছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। মোট মৃত্যুর ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশগুলোতে হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সৌদি আরবে প্রায় ৩০ শতাংশ। একক দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে আসছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লাশ। এর পরের তালিকায় ক্রমান্বয়ে আছে আরব-আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লিবিয়া।

এর বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লাশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ইতালি ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে আছে নানা প্রশ্নও। অভিযোগ রয়েছেন, নিয়োগকর্তাদের নির্যাতনের শিকার কিংবা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকায় প্রাণ হারাতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু কেন শ্রমিকদের মৃত্যু হচ্ছে সে বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় মৃত্যুর সঠিক কারন জানা যাচ্ছে না। সে দেশের পোটমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী অস্বাভিক মৃত্যুকে স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিতে হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জনে অমানুষিক পরিশ্রম করা বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেশিরভাগই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করেন, সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার সংস্থানও হচ্ছে না অনেকেরই। বাংলাদেশ থেকে গিয়ে অনেকেই প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। বিপুল টাকা ব্যয় করে বিদেশে গিয়ে সেই টাকা তুলতে না পারার মানসিক যাতনাও অনেককে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর কোলে।

আবার গাদাগাদি করে যেসব স্থানে তারা থাকছেন, সেখানেই সামান্য অসচেতনায় লেগে যাচ্ছে আগুন। অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত প্রবাসী এসব কর্মীকে সচেতন করার তেমন কোনো উদ্যোগ নেই নিয়োগকর্তা বা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)’র সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ চৌধুরী নোমান মানবকণ্ঠকে বলেন, বিদেশে মারা গেলে নিয়ম অনুযায়ী পোস্টমর্টেম বিদেশেই হয়। এটার কোনো বিকল্প নাই। পোস্টমর্টেম করে তারা যে রিপোর্ট দেয় সে রিপোর্টকেই বাধ্য হয়ে আমাদের মেনে নিতে হয়।

তিনি বলেন, যেসব ব্যক্তির মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ রয়েছে সে লাশগুলো যদি বাংলাদেশে আসার পর ফের পোস্টমর্টেম করা হয় এবং রিপোর্টে অন্য কিছু ধরা পড়ে তাহলে লাভ কি হবে?

মৃত্যুর জন্য যে দায়ি তাকে কি ধরা যাবে। আর সে রিপোর্ট কী তারা মেনে নিবে। বাংলাদেশের রিপোর্ট সে দেশের আদালত মেনে নেবে না। তারা তার দেশের রিপোর্টকেই মেনে নেবে।

তাহলে অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য নিয়োগকর্তাদের কিভাবে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা
যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য নিয়োগকর্তাকে অবশ্যই জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে।

কী কারনে এটি হয়েছে সে বিষয়টি খুঁজে বের করতে হবে। এ জন্য ক‚টনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। নিয়োগকর্তাকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে না পারলে বিষয়টি সুরাহা হবে না।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মানবকণ্ঠকে বলেন, বিগত এক যুগে প্রায় ৪০ হাজারে বেশি প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে। এর কারণ যদি বিশ্লেষণ করেন, দেখবেন বেশিরভাগ ব্রেন স্টোক, হার্ট অ্যাকাটে মারা যায়। কারন আত্মীয়স্বজন পরিবারহীন থাকে, ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ করে, থাকার পরিবেশ ভালো নয়, একরুমে গাদাগাদি করে থাকা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে এরচেয়ে বড় কারণ তারা যে টাকা খরচ করে বিদেশে যান, সে টাকা কিভাবে তুলবেন এই টেনশন সবসময় মাথায় কাজ করে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি অনুসন্ধান করে কেন মারা যায় এই কারণ খুঁজে বের করে এবং রোধ করার করণীয় ঠিক করার পাশাপাশি যাওয়ার আগে যথাযথভাবে বোঝানো হয় এবং যাওয়ার পরে বিপদে পড়লে কোথায় কি করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত বোঝালে মৃত্যুর হার কমে আসবে।


আগামীকাল পড়ুন : তারা কলঙ্ক মুছবেন কি দিয়ে

 

মানবকণ্ঠ/এসআর




Loading...
ads
ads





Loading...