পাক-ভারতের অস্ত্র এবং কাশ্মীরের বন্দী জীবন

- ছবি: সংগৃহীত।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১০ আগস্ট ২০১৯, ২০:০৫

১৩৩৯ সালে মুসলিম শাসক শাহ মীরের হাত ধরে কাশ্মীরে ইসলামের বিস্তার শুরু হয়। আর ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে অন্যান্য ধর্মের প্রভাব। এ সময় হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে মুসলিম অনুশাসনের সংমিশ্রণে জন্ম নেয় কাশ্মীরি সুফিবাদ। প্রায় ৫০০ বছর মুসলিম শাসনের পর ১৮১৯ সালের শেষাংশে রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে কাশ্মীর দখল করে শিখরা। ১৮৪৬ সালে কাম্মীরের তৎকালীন রাজা ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে যান। রাজ্যটি তখন ইংরেজদের হস্তগত হয়। এ সময় ব্রিটিশদের কাছ থেকে ৭৫ লাখ রুপি এবং কিছু বার্ষিক চাঁদার বিনিময়ে কাশ্মীর কিনে নেন গোলাব সিংহ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত গোলাপ সিংহের বংশধরেরাই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক।

১৯৪৭। ভারত ভাগের শর্ত ছিল, দেশীয় রাজ্যের রাজারা চাইলে স্বাধীন থেকে নিজেদের শাসনকাজ পরিচালনা করতে পারবেন। আবার চাইলে ভারত বা পাকিস্তানে যার সঙ্গে ইচ্ছে যোগ দিতে পারবেন। ভারত ভাগের সময় কাশ্মীরের জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশই ছিল মুসলিম। কিন্তু তাদের শাসক ছিলেন হিন্দু রাজা হরি সিংহ। তিনি চাইছিলেন ভারতের সঙ্গে থাকতে। কিন্তু কাশ্মীরের জনগণের বিরাট একটি অংশ চাইছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে। এমনই এক দোলাচলে ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তানের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর আক্রমণ করল।

শুরু হয় যুদ্ধ। কাশ্মীরের রাজা হরি সিংহ ভারতের তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সহায়তা চাইলেন। বিনিময়ে ২৬ অক্টোবর একটি চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। তাতে উল্লেখ ছিল, হরি সিংহের কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যোগ দেবেন। এই চুক্তির ভিত্তিতে ভারতীয় সেনারা এলো কাশ্মীরে। অপরদিকে কাশ্মীরের পাকিস্তান প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করল পাকিস্তানি সৈন্যরা। শুরু হলো যুদ্ধ, শুরু হলো সাধারণ কাশ্মীরীদের যন্ত্রণা। প্রায় চার বছর কেটে গেল যুদ্ধে।

১৯৫২ সাল। জাতিসংঘ যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব হলো। বলা হলো কাশ্মীর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য প্রত্যাহার করতে। সেই সাথে গণভোটের আয়োজনের কথাও বলা হলো। ভারত প্রথমে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হলো। কিন্তু গণভোট আয়োজনে রাজি হলো না। কারণ ভারতের ধারণা ছিল, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরে গণভোট দিলে তারা পাকিস্তানের পক্ষেই যোগ দেবে। অন্যদিকে পাকিস্তানও কাশ্মীর থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হলো না। এতে কাশ্মীরে উভয় দেশের সৈন্যই মোতায়েন রইল।

১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তান আবারও যুদ্ধে লিপ্ত হলো কাশ্মীর নিয়ে।

১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারা সংযোজিত হয়। ওই ধারা অনুসারে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। একই সঙ্গে কাশ্মীরে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না। এছাড়া রাজ্যের স্থায়ী অধিবাসী ছাড়া সেখানে জমি ক্রয়, রাজ্যের চাকরিতে আবেদন ইত্যাদিও নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের কোনো নারী রাজ্যের বাইরে কাউকে বিয়ে করলে তিনি সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন।

কিন্তু কাশ্মীরবাসীর প্রতি ভারতের সংবিধান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নানা অজুহাতে ধীরে ধীরে সেসব রহিত হতে থাকে। ১৯৯০ সাল থেকে ভারতের সেনাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বাড়াবাড়ি ফলে ১৯৯৮ সালে সেখানে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম হয়। এ বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আরো কঠোর অবস্থানে যায়। ফলশ্রুতিতে আরো অশান্ত হয়ে ওঠে কাশ্মীর উপত্যকা।

বিগত নির্বাচনের সময় বিজেপি ঘোষণা করেছিল, ক্ষমতায় গেলে ৩৭০ ধারা বাতিল করা হবে। ক্ষমতায় আসার পরে সেই ঘোষণা রক্ষার্থে দেশটির রাষ্ট্রপতি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বিজেপির সেই পরিকল্পনাই বাস্তবে রূপ দিলেন।

এদিকে পাকিস্তান মনে করে- “কাশ্মীর কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়, বরং এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার এক বিতর্কিত ভূখন্ড। আর কাশ্মীরের ওপর পাকিস্তানের দাবি সব সময়ই অনেক বেশি। কারণ রক্তে, মাংসে, জীবনযাপনে, সংস্কৃতিতে কিংবা ভূগোল আর ইতিহাসে তারা পাকিস্তানের মানুষের অনেক কাছের।”
প্রায় ৪২ বছর আগে জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘে এসবই বলেছিলেন। ভুট্টোর এই ঘোষণার পর বহু বছর চলে গেছে, দেশটিতে এসেছে বহু শাসক, কিন্তু পাকিস্তানের ওই নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু কী চান কাশ্মীরের মানুষ?
৩৭০ ধারা বাতিলের এই সিদ্ধান্তের পরিণাম কী হবে, এখনই তা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, গোটা উপত্যকায় জারি করা হয়েছে কারফিউ, এই মুহূর্তে থমথমে সব কিছু। এর আগে ৩৭০ ধারা বাতিল হতে পারে এমন জল্পনায় রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা নষ্ট করে দেওয়া হলে তা দেশের পক্ষে অমঙ্গলজনক হবে।

সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে, জম্মু-কাশ্মীর দ্বিখন্ডিত হয়ে মর্যাদা হারাল পৃথক রাজ্যের। এখন কাশ্মীরের আর পৃথক সংবিধানও থাকবে না। এতোদিন আলাদা আইনকানুন দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের নাগরিকত্ব, সম্পদের মালিকানা, মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। এখন অন্য রাজ্যের জনগণ ও সম্পদ ক্রয় করতে পারবে। ফলে কমে যেতে পারে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সরকারি দপ্তরের চাকুরিগুলোতে সকলের প্রবেশাধিকার উম্মুক্ত হল।

এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদীর সরকারের এই উদ্যোগ ভারত বিভক্তি ও উগ্রবাদকে উৎসাহিত করবে। কাশ্মীর যেমন উত্তপ্ত হবে তেমনিভাবে উৎসাহিত হবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী গ্রুপগুলো।

অতএব, সামনের দিনগুলোতে ঐক্যবদ্ধ ভারত নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। আর ভারতকে কেন্দ্র করে অস্থির হতে পারে দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলাও।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...