সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেনি বিএনপি

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৬:১৮

মজুমদার ইমরান: আগামী ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দিতে চায় সরকার। ওই সমাবেশে বিরোধী দল বিএনপিকে কোনো ধরনের বাধা দেয়া হবে না বলেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে আশ্বস্ত করেছে আওয়ামী লীগ। এমনকি ঢাকার সমাবেশকে  কেন্দ্র করে কোনো ধরনের পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হবে না বলেও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরকারের আশ্বাসের পরও  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিএনপি। তবে ভেন্যু নিয়ে বিএনপি আরও বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবে বলে সূত্র জানায়। গতকাল পর্যন্ত তারা নয়াপল্টনের দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেই সমাবেশের বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছে। এর স্বপক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরছেন বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে দলটির নেতারা  হঠাৎ সরকারের নমনীয় অবস্থানের পেছনে কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও তুলেছেন।

জানা গেছে, ১০ ডিসেম্বর নিয়ে সরকারের নমনীয় অবস্থানের পর দলের করণীয় ঠিক করতে গতকাল সোমবার দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতারা অনলাইন বৈঠক করেছেন। রাত নয়টার দিকে এই বৈঠক শুরু হয়ে গভীর রাতে শেষ হয়। বৈঠকে ভার্চুয়ালী লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন।

বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রমুখ অংশ নেন। 

গতকাল সোমবার রাত আটটার দিকে ঢাকার গণসমাবেশের ভেন্যু নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে টেলিফোনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম মানবকণ্ঠকে বলেন, ১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় তাহলে গণমাধ্যমে তা জানিয়ে দেয়া হবে। এরআগে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ জানান, ১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেই গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, ঢাকার সমাবেশ নিয়ে এখনও আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে জানতে পারছি, সরকার অন্য জায়গায় অনুমতি দিতে চায়। আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ হবে। এখানে অতীতেও আমরা অনেকগুলো বড় সমাবেশ করেছি। সুতরাং এখানে সমাবেশের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন জানে কীভাবে নয়াপল্টনে সমাবেশ হয়।

কেননা, সভা হচ্ছে আমাদের। সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার দায়িত্ব তো আমাদেরই। জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১২ অক্টোবর থেকে দেশের ১০ সাংগঠনিক বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকার বিভাগীয় গণসমাবেশের মাধ্যমে এই কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, ঢাকায় তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবেন। ওই সমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের ঘোষণা দেবেন।

ঢাকার সমাবেশকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনীতিতে উত্তাপ বিরাজ করছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই গত ১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিএনপি নয়াপল্টনে ১০ ডিসেম্বর গণসমাবেশ করার লিখিতভাবে অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। এরপর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, শর্তসাপেক্ষে আগামী ১০ ডিসেম্বর বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরও বিএনপি নয়াপল্টনেই সমাবেশ করার বিষয়ে অনড় অবস্থান নেন। গত রবিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকেও ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকার সমাবেশ নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্বিঘে্ন সমাবেশ করার কথা বলেন। কিন্তু এরপরও ঢাকার সমাবেশের স্থান নিয়ে জটিলতা কাটছেই না।

বিএনপি চায় নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয় ঘিরে সমাবেশ করতে। সরকার অনুমতি দিয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। অন্য সময় বিএনপি সোহরাওয়ার্দীতেই অনুমতি চায়, সরকার দেয় না। এবার পেয়েও কেন করতে চাইছে না সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে সমাবেশ কেন করতে চায় তা নিয়ে বিএনপির নেতারা তুলে ধরছেন নানান যুক্তি। নয়াপল্টনে অনুমতি চেয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাওয়ায় অবাক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান।

তিনি বলেন, ‘সরকার সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের অনুমতির কথা বললেও আমরা আগের অবস্থানেই আছি। আমাদের তো কোনোদিনই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেয় না, কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের সমাবেশের অনুমতি দেয়ায় অবাক লাগছে। আমাদের ভেন্যু পার্টি অফিসের সামনে। এটা আমাদের জন্য সুবিধা হয়, সেজন্য আমরা চেয়েছি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল যে পল্টনে মিটিং করেন কোনো সমস্যা নেই। এখন যদি কোনো কারণে বাধা আসে তাহলে সেটার কারণ বোধগম্য নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেক কিছু তৈরি হয়েছে। সেখানে আসলে তেমন কোনো মাঠ নেই। তিনি আরও বলেন, ‘আগে পল্টন ময়দান ছিল, যেখানে বিএনপি জনসমাবেশ করত সব সময়। পাকিস্তান আমল থেকে ওখানে সমাবেশ করা হতো, সে মাঠটা আর এখন রাখা হয়নি, সেটা খেলার মাঠ বানিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরে রেসকোর্স ছিল, রেসকোর্সে এখন অনেক অট্টালিকা হয়েছে। ওখানে একটা কোণার মধ্যে মিটিং করলে কেমন হবে? যেহেতু বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা আসবেন।

নয়াপল্টনে করলে লাভ কী আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে করলে ক্ষতিই বা কী? নয়াপল্টনে কর্মসূচি পালন করলে সড়ক বন্ধ থাকবে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়বে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, এখানে জেদাজেদির কিছু নেই, লাভ-ক্ষতির কিছু নেই। শনিবার ছুটির দিন। সব অফিস বন্ধ। নেতাকর্মীরা রিল্যাক্স মুডে সমাবেশে অংশ নিতে পারবেন। আশপাশে হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে প্রয়োজনীয় খাবার খেয়ে নিতে পারবেন। আমরা এখানে কর্মসূচি পালন করতে অভ্যস্ত। এখানে যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন তারাও অভিজ্ঞ। কীভাবে কাকে ডিল করতে হবে তারা জানেন। সব মিলিয়ে নয়াপল্টন আমরা চেয়েছি। আশা করি নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে পারব। এটা আমাদের বিভাগীয় কর্মসূচি। কাজেই নয়াপল্টনে নেতাকর্মীরা যে সুবিধা পাবেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেই সুবিধা পাবেন না।

১০ ডিসেম্বরের বিভাগীয় গণসমাবেশ নিয়ে বিএনপি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ভ‚মিকায় রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন। তিনি বলেন, তারা বলছে লাখ লাখ লোক আনবে। লাখ লাখ লোকের জায়গা দিতে হলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বেস্ট। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এখানে সমাবেশ করেছেন। নয়াপল্টনে রাস্তায় কয়েক হাজার লোক ধরবে? বিএনপি এতদিন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে যে তাদের সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি দেয়া হয় না, যে কারণে তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এবং নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করে। ভবিষ্যতে মহাসমাবেশের জন্য সরকার যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে অনুমতি না দেয়?

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar