জিএম কাদেরের সঙ্গে বসবেন রওশন


  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৬:২৭

জাতীয় পার্টি যাতে দ্বিধা-বিভক্তি না হয় ও ভুল বুঝাবুঝির অবসানের লক্ষ্যে শিগগিরই জিএম কাদেরের সঙ্গে বসবেন দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভাবি-দেবর ঐক্যবদ্ধ হয়েই জাতীয় পার্টিকে রক্ষা করবেন এবং নির্বাচনে অংশ নেবেন। অন্য রাজনৈতিক দল থেকে যাতে জাতীয় পার্টিতে অংশ নেন অনেকে সেই উদ্যোগও নেবেন তারা। সেই লক্ষ্য নিয়েই জিএম কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করতে চান রওশন এরশাদ। গতকাল রবিবার বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে রওশন এরশাদ কথা বলেন এবং দলকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন কৌশলের কথা জানান। তিনি বলেছেন, পার্টিকে বিভক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না। আমি সবসময় জাতীয় পার্টির ঐক্য চাই। পাঁচ মাস চিকিৎসার পর দেশে ফিরেছেন বিরোধীদলীয় এই নেতা। বিরোধী দলের এই উদ্যোগের কথা জানানোর পর দলের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটের দিকে থাই এয়ারওয়েজের একটি উড়োজাহাজে করে বিমানবন্দরে অবতরণ করেন রওশন এরশাদ। তার সঙ্গে থাইল্যাণ্ড থেকে এসেছেন কাজী মামুনুর রশীদ, ছেলে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ ও পুত্রবধূ মাহিমা সাদ। বিমানবন্দরে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভিআইপি লাউঞ্জ গেটে উপস্থিত দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থক ও সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন জাপার অভিভাবক রওশন এরশাদ।

তিনি বলেন, আগেও বলেছি, আজও বলছি আমি সবসময়ই জাতীয় পার্টির ঐক্য চাই। আপনারা জানেন আমার স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যদের কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। আমি দেখেছি গত ৩২ বছরে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ব্যাংককে রওশন এরশাদের চিকিৎসার সময় সহযোগিতা এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান এই বিরোধীদলীয় নেতা।

রওশন এরশাদ বলেন, আমি আবারও বলছি, পার্টিকে বিভক্ত করার প্রশ্নই উঠে না। বরং আমি জাতীয় পার্টির সব সদস্যকে খোলা মনে আহ্বান জানিয়েছি-যারা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান মঞ্জু, কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে চলে গেছেন এবং নিস্ক্রিয় হয়ে গেছেন, তাদের ফিরে আসার জন্য। ১৯৯১ হতে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টির কঠিন ও প্রতিকুল সময়, যারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন-তাদের আমাদের অবশ্যই যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। আমি ঢাকায় ফিরে এসেছি, আমি পার্টির সব এমপি, প্রেসিডিয়াম এবং অন্যান্যদের সঙ্গে যেকোনো বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবঝি দূর করতে বসবো। আমি নিশ্চিত, সেই ভুল বোঝাবুঝি দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ফিরতে পারবো। এসব ভুল বোঝাবুঝির জন্য এবং পার্টিকে দুর্বল করতে কিছু ষড়যন্ত্র হতে পারে। যেমনটি আমরা ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০১৪ সালে দেখেছি। আমরা সেই ষড়যন্ত্রগুলোকে নস্যাৎ করব এবং ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতীয় পার্টি গড়ে তুলবো।

এদিকে বেগম রওশন এরশাদের এই বক্তব্যের পর জাপা শিবিরে কিছুুটা স্বস্তি ফিরে আসে। আগের দিন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, উপদেষ্টা কমিটিসহ অনেক নেতাই বেগম রওশন এরশাদকে রিসিভ করার জন্য বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতারা না গেলেও ভিআইপি লাউঞ্জে বিরোধীদলীয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় জিএম কাদেরপন্থি নেতা জাপার কো চেয়ারম্যান এবিএম রুহল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়, প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু, নাসরিন জাহান রত্না এমপি ও জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য এম এ কুদ্দুস খান রওশনকে শুভেচ্ছা জানান। উপদেষ্টা কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য এম এ কুদ্দুস খান গতকাল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বলেন, বেগম রওশন ম্যাডাম একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, দলকে ভাঙ্গণের কবল থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি জিএম কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করে ভুল বুঝাবুঝির অবসান করবেন। এতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

বিএনপির শাসনামলে জাতীয় পার্টি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় আমাদের নেতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং আমি ও আমার নাবালক সন্তানসহ দলের হাজার হাজর নেতাকর্মী জেল খেটেছিলেন। তখন আমাদের জনসভাও করতে দেয়া হয়নি। ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে অনেক জনসভায় হামলা চালিয়ে কতশত নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই অন্ধকার দিনগুলো আমরা ভুলবো কি করে। তাছাড়া আমরা তাদের শাসনামলে হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অপতৎপরতা দেখেছি। জনগণ উন্নতি ও শান্তি জন্য পরিবর্তন চায়, যা জাতীয় পার্টিই দিতে পারে সেই শান্তি। অবশ্যই তা বিএনপি নয়। বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না।

রংপুর সিটি করপোরেসন নির্বাচন প্রসঙ্গে বেগম রওশন বলেন, মনে রাখবেন রংপুর জাতীয় পার্টি প্রাণ। এটা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি। তাই আসনটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে এবং জাতীয় পার্টির প্রতীক ‘লাঙল’ নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হবে এমন যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবো। এজন্য সব নেতা-কর্মীকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হবে, তার নির্বাচন ও বিজয়ের মধ্যদিয়ে জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী দল হিসেবে নতুন করে প্রতিষ্ঠা পাবে।

রওশন আরও জানান, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন বজায় রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দুর্নীতি, অর্থনীতিতে অব্যবস্থাপনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির মতো কিছু ক্রটি রয়েছে। আমি নিশ্চিত যে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে অবগত আছেন এবং আমি তাকে অনুরোধ করব এই বিষয়গুলোকে আরও ঘনিষ্টভাবে সমাধান করতে এবং তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের আরও বেশি আন্তরিক ও সক্রিয় হতে হবে। বর্তমান ভূ-রাজনীতি বিশেষ করে ইউক্রেনের যুদ্ধ গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশেও। তাই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত এবং সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত।

বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্ বলেন, এখন দলে কোনো বিবাদ থাকবে না। বেগম রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের এক টেবিলে বসার পর দল একটি সঠিক জায়গায় পৌঁছাবে। কোনো ষড়যন্ত্র কাজ হবে না। ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র শিগগিরই ধ্বংস হয়ে যাবে। অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, জিএম কাদেরের সঙ্গে বেগম রওশন এরশাদ কবে বৈঠক করবেন নির্দিষ্টিভাবে এখনো তারিখ ঠিক না হলেও বৈঠক যখন অনুষ্ঠিত হবে। তখন জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে করা সকল মামলা প্রত্যাহার করার জন্য নেতাদেরকে নির্দেশ বেগম রওশন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বলেন, দেবর-ভাবি মিলে গেলে আর কোনো অসুবিধা নেই।

এদিকে রওশন এরশাদের দেশে ফেরা ঘিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিন পর্যন্ত সড়কদ্বীপ ও রাস্তার দুই পাশে লাগানো হয়েছে রংবেরঙের ব্যানার। এ ছাড়া নগরজুড়ে লাগানো হয়েছে নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুন। দলীয় নেতাকর্মীদের নামে ছাপানো পোস্টারও লাগানো হয়েছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে। গতকাল রবিবার সকাল থেকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে অবস্থান নেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। রওশন এরশাদ ভিআইপি লাউঞ্জের বাইরে এলে মুহুর্মুহু স্লোগানে, করতালিতে তাকে স্বাগত জানান নেতাকর্মীরা। ভিআইপি লাউঞ্জে বিরোধীদলীয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, এসএমএম আলম, বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম মিলন, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যার অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, জাতীয় ছাত্র সমাজের সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান টিটু, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম নূরু, মনোয়ারা তাহেরা মানু, আমেনা হাসান প্রমুখ।    

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar