সমঝোতা ও আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ

সহিংসতা আরও বাড়ার শঙ্কা

রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে ইইউর উদ্বেগ


  • শাহীন করিম
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:২০

প্রায় ১৬ মাস সময় বাকি থাকতেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে রাজনীতির মাঠ। রাজধানী থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে এর উত্তাপ। আন্দোলন বেগবান ও দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা করতে বিএনপি নানা কর্মসূচি দিচ্ছে। আবার এ নিয়ে সরকারদলীয় লোকজনের সঙ্গে ঘটছে সংঘর্ষ। এসব ঘটনাকে দেশের রাজনীতিতে কিছুটা অশনিসংকেত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক সমজোতা, নেতৃবন্দের সহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকলে রাজনীতির মাঠে শুরু হওয়া সহিংসতা সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়তে পারে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি-জামায়াত আরো মারমুখী হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে সেজন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দলগুলোর মধ্যে সুস্থ রাজনীতি করার অভাবেই সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এতে জানমালের ক্ষতি হওয়া ছাড়াও দেশের অর্থনীতি নাজুক হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করতে হলে এক বছর আগ থেকেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা উচিত। এটার মূল দায়িত্ব সরকারের। চলমান পরিবেশ বজায় থাকলে ভবিষ্যতে সহিংসতা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। সকল পক্ষকে গণতান্ত্রিক চর্চা ও মূল্যবোধের ওপর গুর’ত্বারোপ করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যসহ জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনগণের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর দেড়েক আগে এমন বিষয়কে ইস্যু করে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তারা সরকার পতনসহ জীবনযাত্রার ব্যয় স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে মিছিল-সমাবেশ করছে। যেখানে হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি গুলিতে মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটছে। মিছিল, সভা-সমাবেশকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও মৃত্যুর জন্য সরকারদলীয় নেতাদের দোষারোপ করছেন বিএনপির নেতারা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই বিএনপির সমাবেশে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

সর্বশেষ শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লায় দলীয় কর্মসূচি চলাকালে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়েছেন বিএনপি কেন্ত্রীয় নেতা বরকত উল্লাহ বুলু ও তার স্ত্রীসহ আরও কয়েকজন। প্রায় একই সময় রাজধানীর বনানীতে বিএনপির কেন্ত্রীয় নেতা সেলিমা রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও তাবিথ আউয়ালসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। এর আগে সরকার দলের নেতাকর্মী ও পুলিশি হামলায় পল্লবীতে বিএনপির কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়। বিএনপির প্রতি¯¤াবার্ষিকীর দিন নারায়ণগজ্ঞে পুলিশের গুলিতে এক যুবদল কর্মী নিহত ও আরও অনেকে আহত হন। দেশের আরও কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটে। এর আগে গত ৩০ জুলাই ভোলায় বিএনপির কর্মসূচিতে গুলি করে পুলিশ। যেখানে দুই নেতা নিহতের পাশাপাশি অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধ হন। এভাবে গত জুলাই মাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও পুলিশের সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে বছর খানেক আগেই পরিবেশ তৈরী করতে হয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের চেয়ে সরকারি দলের দায়িত্ব বেশি। এখন থেকেই যদি পরিবেশ রাজনৈতিকভাবে খারাপ হয়, তাহলে নির্বাচন আসতে না আসতেই আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। একই প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক মানবকণ্ঠকে বলেন, ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বর্জন করে সেটিকে বানচাল করতে আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াওসহ সব ধরণের অপকৌশল নিয়েছিল। নির্বাচনে পোলিং এজেন্টকে হত্যা, স্কুল কলেজ পুড়িয়ে দিয়েছিল, সেই অবস্থায়ও সংবিধান সংহত রাখতে নির্বাচন হয়েছিল।

তিনি বলেন, বর্তমান পেক্ষাপটে তত্ববধায়ক কিংরা নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে যদিও বিএনপি জোট অনড় থাকে, আর সরকারের যদি সেই সুযোগ না থাকে, তাহলে সংহিসতা বাড়তে পারে। উভয়পক্ষ মাঠে থাকার চেষ্টা করলে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সংকটের সমাধান নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা ও প্রত্যেকে গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ মূল কথা। গণতন্ত্রের মুল্যবোধ রক্ষায় সকল পক্ষকে সচেষ্ট হতে হবে। অতীতের মতো তৃতীয় কোন শক্তি ক্ষমতায় আসতে পারে বলে আমি মনে করছি না।

একই বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক মানবকণ্ঠ বলেন, সরকারি দল সিন্ধান্ত নিয়েছে নয়াপল্টনে অফিসে ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ছাড়া আর কোথায় বিএনপিকে মাঠে নামতে দেবে না। বর্তমানের চেষ্টা চলতে থাকলে ইটপাটকেল ও লাঠিসোঠার ভেতরে ভবিষ্যতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার পথে কতৃত্ববাদী সরকার হাটে না। অতএব ফলাফলে কতৃত্ববাদী সরকার সফল হলে এই সরকার আরও অনেক বছর থাকবে। বর্তমান পন্থায় সরকার ব্যর্থ হলে আমরা কঠিন সহিংসতা ও হানাহানি বেড়ে যাবে। জনগন ভোগান্তির মধ্যে পড়বে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এক টুইট বার্তায় বলা হয়, ক‚টনৈতিক অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইইউ এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইইউ পরবর্তী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হওয়া রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের সময় অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছে ইইউ।

নির্বাচন নিয়ে নানা হুঙ্কার প্রতিনিয়তই দিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির নেতারা। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিরোধীদের রাজপথে মোকাবিলা করার হুমকি দিতে ছাড়ছেন না। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বেশ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে রাজনীতির মাঠ গরম হচ্ছে। হামলা-মামলার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর বড় সমাবেশ করেছে বিএনপি। একই দিন দেশের বিভিন্ন জেলায়ও দলটির কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ থেকে সরকারি দলকে মোকাবেলায় প্রতিরোধ গড়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার অনেক আগ থেকেই সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহলও।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের নির্বাচন ও রাজনীতির সংস্কৃতি বদলে গেছে। এখন রাজনীতি জনস্বার্থে হয় না, হয় ব্যক্তিস্বার্থে। এজন্য মারামারি, টাকা-পয়সা খরচ বা ভোট কেন্দ্র দখলসহ যেকোনো উপায়ে সবাই ক্ষমতায় যেতে চায়। এর বাইরে উভয় দলে এক শ্রেণির অতি উৎসাহী নেতাকর্মী রয়েছেন। যাদের কারণেও ঘটছে সহিংস ঘটনা। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী জোটকে আরও সহনশীল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar