দায়িত্বে থাকতে লবিং করছেন ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক


  • সাইফুল ইসলাম
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:০৯

মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা না করে দ্বাদশ নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের দায়িত্বে থাকতে চান সংগঠনটির বর্তমান কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য।

আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সম্ভাব্য সব জায়গায় জোর লবিংও চালাচ্ছেন তারা। এমনকি আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতার পরামর্শে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত নেতাদের কাছেও প্রতিনিয়ত হাজিরা দিচ্ছেন ওই দুই নেতা। তারা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও লবিং করছেন, যেন কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের সভাপতির কাছে তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিবেদন পৌঁছাতে না পারে- এমন অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন দিলে ছাত্রলীগ সভাপতি নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য রিসিভ করেননি।

নানা অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এর সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে। ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এর কিছু দিন পর ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি সংগঠনটির ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ভারমুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়ার পরই বদলে যায় তাদের মনমানসিকতা। শোভন-রাব্বানীর পথেই শুরু হয় তাদের চলা। অভিযোগ পাওয়া যায়, রাতারাতি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ির মালিক হন তারা।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, জেলা কমিটি, এমনকি উপজেলা কমিটি থেকেও নিচ্ছেন বিপুল পরিমাণে অর্থ। এসব কমিটিতে আওয়ামীবিরোধী পরিবার, বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলার আসামি এবং অছাত্ররা পদ পাচ্ছেন। বিবাহিত, অছাত্র, মাদক ব্যবসায়ী, ছাত্রশিবির-ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের দিয়ে করা হচ্ছে কমিটি ছাত্রলীগের কমিটি। এসব কমিটি সংগঠনের ভেতরে প্রেস রিলিজ কমিটি হিসেবে আখ্যা পেয়েছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষ থেকে ‘প্রেস রিলিজ’ কমিটি দিতে বার বার নিষেধ করা হলেও তারা মানছেন না সেই নির্দেশনা। এ ছাড়া ঢাকাতে রাজনীতি করা নেতাদের জেলাতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও উঠেছে। এতে জেলা পর্যায়েও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে কমিটি করার বিষয়টি আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাযনির্বাহী বৈঠকে তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম।

ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে মির্জা আজম বলেন, ‘নেত্রী, সহযোগী সংগঠন নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে, বিশেষ করে ছাত্রলীগ জেলায় জেলায় কমিটি দিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না তারা কী পরিমাণ অর্থ নিয়ে কমিটি দিচ্ছে। আপা, তারা লাখ টাকা নয়, কোটি টাকা নিয়ে কমিটি দিচ্ছে।’

ছাত্রলীগের কক্সবাজার, সিলেট জেলা ও মহানগর, ময়মনসিংহ জেলা ও সাতক্ষীরা জেলা কমিটি গঠনের পরই অর্থ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

উল্লেখ্য, দুই বছর মেয়াদি ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই। ইতোমধ্যে নির্ধারিত সময় পার করে বর্তমান কমিটি এখন এক বছর ৬ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ। অথচ বিধান থাকলেও বর্ধিত বা সাধারণ সভা এখন পর্যন্ত আহ্বান করার উদ্যোগ নেয়নি বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা সংগঠনকে গঠনতান্ত্রিক নিয়মে চালাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তারা কোনো প্রকার সভা, জরুরি সভা কিংবা বর্ধিত সভা করতে পারেননি। গঠনতান্ত্রিক নিয়মের বাইরে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। জেলা কিংবা উপজেলার সম্মেলন ব্যতীত নতুন কমিটি অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। গঠনতন্ত্র হিসেবে ছাত্রলীগের মেয়াদ ২ বছর। তারা সেটাও পূরণ করেছে। এই দুই বছর ছাত্রলীগকে কোনোভাবেই পরিচালিত করতে পারেননি। সেই জায়গায় তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

ফরিদপুর জেলা কমিটিতে যথেষ্ট অনিয়ম রয়েছে। সেখানে যুবদল নেতা, শিবির, বিবাহিতরা কমিটিতে আছেন। ফরিদপুরের কমিটিও প্রেস রিলিজের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। হয়তো কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার সুপারিশেই ফরিদপুরের কমিটি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় বিসমিল্লাহ টাওয়ারে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন সংগঠনের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। ব্যবহার করেন প্রিমিও আপডেট ভার্সনের বিলাসবহুল গাড়ি।

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ঢাকার বিভিন্ন ইউনিটসহ জেলা-উপজেলার নেতারা ভিড় করেন জয়ের বাসার নিচে। স্থানীয় দোকানি ও বিসমিল্লাহ টাওয়ারের অন্যান্য বাসিন্দার এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একইভাবে মগবাজারের ইস্কাটন এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য?্য। ব্যবহার করেন নোহা আপডেট ভার্সনের বিলাসবহুল গাড়ি।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোহান খান মানবকণ্ঠ বলেন, ‘বর্তমান ছাত্রলীগের উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় সমমান কমিটিগুলোর প্রায় সবই ভঙ্গুর। সংগঠনের ৯০ শতাংশ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। আর জেলা কমিটিগুলো যেভাবে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে দিচ্ছে এর প্রভাব উপজেলা, পৌর শাখার ওপরে পড়েছে। বর্তমান ছাত্রলীগ সাংগঠনিক জায়গায় নেই। ছাত্রলীগ এখন প্রেস রিলিজ নির্ভর কমিটি হচ্ছে। এই কারণে তৃণমূল খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটার জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দায়ী।’

তিনি আরো বলেন, বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে এদের (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) আগ্রাসিভাব আরো বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এখন পর্যন্ত একটি বর্ধিত সভা হয়নি। সকল জেলার সাংগঠনিক রিপোর্ট নিয়ে যে সভা করবে এটা তারা করতে পারেনি। এটা তাদের ব্যর্থতা। আমরা সাধারণ সভা বা জরুরি সভা করতে পারেনি। এ জায়গাও তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। স্বেচ্ছাচারির সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ ব্যবহারকারী বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সংগঠনের চেন অব কমান্ড না থাকার কারণে কোনো অনুষ্ঠান করলেও বিশৃঙ্খলা হয়। আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল করার জন্য যে প্রস্তুতি সভা করার দরকার তারা কিন্তু তাও করেনি। এটা ছাত্রলীগের জন্য লজ্জাজনক। কেন্দ্র যেভাবে কমিটি ভাঙছে, আর সিভি দিতে বলছে, এভাবে যদি কমিটি হয়, তাহলে এর প্রভাব ছাত্রলীগের জেলা, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়নে গিয়ে পড়বে। ওরাও কাগজে লেখে কমিটি দেবে। এক্ষেত্রে অনিয়ম হয়, এতে সুযোগ-সুবিধার ব্যাপার থাকে।’

আরো জানা গেছে, ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতার মধ্যে একজন চান না সম্মেলন হোক। তিনি এই কমিটির ভাঙতে নারাজ। তার পরামর্শে বর্তমান ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সময়-অসময়ে অফিস কিংবা বাসায় হাজিরা দিচ্ছেন। নেতাদের বাসাও বড় বড় মাছ পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে তা দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বাসা নয়। কারো পছন্দের লোকজনকে দিয়ে জেলা কমিটি করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন, যাতে ছাত্রলীগ নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা বলেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনের সহসভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের বর্তমান পরিস্থিতি হচ্ছেÑ নেতারা গঠনতান্ত্রিক গতিশীল কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে তারা রেষারেষি (রেষারেষি বলতে একে অপরের প্রতি দোষারোপ) রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। কারণ হচ্ছে, সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক গঠনতন্ত্রের যে চর্চা তা রাখে নাই। বরং যারাই গঠনতন্ত্রের চর্চা রাখতে যায়, সাংগঠনিক গতিশীলের কথা বলে তাদের বিভিন্নভাবে অপবাদ দেয়া হয়। এই অপবাদগুলো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাদের ঘনিষ্ঠদের দিয়ে দেন। এসব কারণে সংগঠনে স্থবিরতা বিরাজ করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এত বড় সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতেই পারে। কিন্তু অভিযোগের প্রেক্ষিতে যখন কোনো ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন করা না হয়, তখন সেই অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা নিরূপণ কিভাবে হবে। তখন ধরেই নেবেন অভিযোগগুলো সত্য বলেই তদন্ত হয়নি।’


poisha bazar


ads