নাসিক নির্বাচন

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে বাকযুদ্ধ

অনিয়ম ঠেকাতে মাঠে ১৪ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১২ জানুয়ারি ২০২২, ১২:১৩

শেষ সময়ে অনেকটা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জ সিটি (নাসিক) নির্বাচনী মাঠ। চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। আবার অনেক সময় মুখোমুখি হয়ে গেলে তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ সবার দাবি হলেও সাধারণ ভোটারসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন সহিংসতার। ইউপি নির্বাচনে ভোটকালীন এবং ভোটপরবর্তী সহিংসতার প্রভাব নাসিক নির্বাচনে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। তবে প্রশাসন বলছে, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক রং বিবেচনায় আসবে না। সহিংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কাজে আসবে না। 

এদিকে ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই আলোচনায় উঠে আসছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অর্থাৎ সমান সুযোগ তৈরির বিষয়টি। প্রচারণার শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেয়নি বলে অভিযোগ করছেন বিএনপি থেকে পদ হারানো স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার। বিরোধী মতের লোকদের পুলিশি হয়রানি, প্রচার-প্রচারণায় বাধা, হামলা, মামলার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট করা এবং নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেন তিনি। তবে আইভীর দাবি, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের মতো কোনো লোক তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নেই। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে জানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তার থেকে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

দুই প্রার্থীর এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়ে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, নাসিক নির্বাচনের পরিস্থিতি ইসি পর্যবেক্ষণ করছে। সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতে কমিশনের নির্দেশনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম সব প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করে নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাও নারায়ণগঞ্জ পরিদর্শনে রয়েছেন জানিয়ে কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আজ বুধবার নারায়ণগঞ্জে নিযুক্ত প্রিসাইডিং অফিসার এবং নির্বাচনে দায়িত্ব পালনরত নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানেই তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিবেন। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হবে বলেও আশাবাদী তারা। যথাসময়ে ভোট হবে জানিয়ে নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে ১৪ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে মাঠে নামানো হয়েছে বলেও জানান তারা।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জ এখন সরগরম। অলিগলি, চায়ের দোকান সর্বত্রই আলোচনায় নাসিকের ভোট। মহানগরীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এ উত্তাপ। নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার একে অপরের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও সেই উত্তাপে নতুন মাত্রা এনেছেন শামীম ওসমান এমপি। মাঠে না থাকার পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জেলার প্রভাবশালী এ নেতা। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর সোমবার নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেন তিনি। নৌকার পক্ষে মাঠে নামার ঘোষণা দিলেও সমালোচনার ইঙ্গিত ছিল আইভীকে ঘিরে। ছাড় দেননি তৈমুর আলম খন্দকারকেও। সব মিলিয়ে শামীম ওসমান ও দুই মেয়র প্রার্থীর বাকযুদ্ধে অনেকটা টালমাটাল ভোটের মাঠ। 

স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার প্রচারণার শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেয়নি বলে অভিযোগ করে বলেন, তার কর্মী-সমর্থকদের পুলিশ বাড়িতে ঘুমাতে দিচ্ছে না। এ জন্য তিনি দায়ী করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। এ ছাড়া সরকার ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে তুলেছেন ক্ষমতার অপব্যহার ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।

গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে সবাইকে অবগত করা হয়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর ২০ হাজার নেতাকর্মীর একটা র?্যালিতে আমার সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে সে সমাবেশে যাইনি। কিন্তু আমার বার বার অভিযোগের পরও ক্ষমতাসীন দল এমপি ও বড় বড় নেতাদের এনে উস্কানিমূলক ও ভয়ভীতি ছড়ানোর মতো কথাবার্তা বলেন। একজন বলেছেন, তৈমুরকে মাঠে নামতে দেয়া হবে না। আরেকজন অতি দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন- তৈমুর ঘুঘু দেখেছে ফাঁদ দেখেনি। তিনি ২৪ ঘণ্টায় আমাকে রেজাল্ট দেখানোর কথা বলেছেন। এ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই আমি ঘুঘু ও ঘুঘুর ফাঁদ দেখা শুরু করেছি।

কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে তাদের নির্বাচনবিমূখ করতে হামলা, মামলা, গ্রেফতার চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি আমার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক। তার হাতে দায়িত্ব ছিল এজেন্ট ও নির্বাচন সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা ও সহযোগিতা করা। রবিকে গ্রেফতার করার পর তৎক্ষণাৎ এসপি অফিসে যাই। তিনি অফিসে নেই। টেলিফোনে বললাম রবিকে গ্রেফতার করা হয়েছে কেন? তারা বললেন তার নামে ওয়ারেন্ট আছে।

তৈমুর বলেন, মনিরুল যদি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হয়েই থাকে তাহলে এতদিন ওয়ারেন্ট কার্যকর হয়নি কেন? যেদিন আমি মনোনয়ন কিনেছিলাম সেদিন সে পাশে ছিল। যেদিন জমা দেই সেদিনও ছিল, যেদিন বাছাই হয় সেদিনও সে পাশে ছিল। প্রতীক বরাদ্দের দিনও আমার সঙ্গে ছিল। এতদিন হল না, এখন কার্যকর হল কেন? জোসেফের বাড়িতে অভিযান হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট নেই। মাইকম্যান ও চেয়ারম্যান কামালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরও কোনো ওয়ারেন্ট নেই।

ইসির সমালোচনা করে তিনি বলেন, আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এখন পর্যন্ত তিনটি চিঠি দেয়া হয়েছে। একটি চিঠিরও উত্তর মেলেনি।  ইসি কোনো পদক্ষেপও নেয়নি। এভাবে যদি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তার লোকজনকে হয়রানি করে তাহলে তো অন্যান্য দল নির্বাচন বর্জন করবে।

তৈমুরের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আইভী। তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার মতো কোনো লোক তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নেই। প্রশাসন নিজেদের মতো কাজ করছে বলেও দাবি টানা দুইবারের এই মেয়য়ের।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বেশি সুবিধা পাচ্ছেন জানিয়ে আইভী বলেন, ‘আমার চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন তৈমুর আলম খন্দকার কাকা। আমি তাকে অনুরোধ করবো কারো প্ররোচনায় প্রভাবিত না হয়ে ভোট চাইতে। আপনার ভোট আপনি চান, আমার ভোট আমি চাই। দুজন যে যার মতো ভোট চাইবো।

তিনি বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে। আমার কর্মীরা কখনও ওভারএক্সেস করেনি এবং আমিও আইন ভঙ্গ করিনি। আমি উনাকে (তৈমুর) বলতে চাই তিনি যেন ওভার রোল প্লে না করে। তিনিও যেন সঠিকভাবে থাকেন।

এদিকে নাসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বন্দরনগরী। প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মেয়র ছাড়া কাউন্সিলর পদেও দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। অনেক ওয়ার্ডে দুই পক্ষের একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় নির্বাচন সহিংসতায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে শঙ্কার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্র গঠিত নির্বাচন পরিচালনা

কমিটির সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে আইভীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয় হবে। এটা নিয়ে কোনো ধরনের দুরভিসন্ধি করার কোনো সুযোগ নেই। ভোটের পরিবেশও ভালো আছে। ভোটারদের মধ্যে কোনো শঙ্কা নেই।

তবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, প্রচার-প্রচারণায় বাঁধা দিচ্ছে, পুলিশি হয়রানি করা হচ্ছে। এভাবে তো শান্তিপূর্ণ ভোট হতে পারে না। তৈমুর আলম খন্দকার বিজয়ী হবেন জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপিতে কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই। আমাদের অনেক নেতাকর্মী তৈমুর আলম খন্দকারের পক্ষে কাজ করছেন। সুষ্ঠু ভোট হলে তার বিজয় নিশ্চিত।

নির্ধারিত দিনেই ভোট: সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচন নির্ধারিত দিনেই হবে বলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে বলা হয়েছে। ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ গতকাল মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়ে বলেন, নাসিক নির্বাচন আয়োজন না করার মতো পরিস্থিতি হয়নি। তাই নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ইসি।

এর আগে করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে উন্মুক্ত স্থানে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করাসহ ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। আগামী ১৩ জানুয়ারি থেকে এ বিধিনিষেধ কার্যকর হবে বলে জারি করা হয়েছে। অথচ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রচারণা চালানোর শেষ দিন ১৪ জানুয়ারি এবং ভোটগ্রহণ ১৬ জানুয়ারি। এ কারণেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল।

এদিকে ইসির যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (জনসংযোগ) এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, বুধবার নাসিক নির্বাচনে নিয়োগ পাওয়া প্রিসাইডিং অফিসার, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা।

জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের আইন শাখার সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনটি গতকাল মঙ্গলবার জারি করে ইসি।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০ এর বিধি ৮৬-তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন, আইন ও বিচার বিভাগ, আইন ও বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পেনাল কোডের অধীনে তারা মামলা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিচার কাজ পরিচালনা করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি ভোট সুষ্ঠু করতে ১৪ জন্য জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে।


poisha bazar


ads