স্থানীয় নেতা-এমপি কোন্দলে মাঠ পর্যায়ে আ.লীগে দ্বন্দ্ব


  • সাইফুল ইসলাম
  • ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৩:২৯

জেলা-উপজেলা কমিটির সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কোন্দলের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য যোগ্য ব্যক্তির নাম পাচ্ছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলটির তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী গ্রুপ তৈরি হওয়ায় বিরোধীবলয়ে যোগ্য লোক থাকলেও তার নাম কেন্দ্রে না পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা কমিটির নেতারা যাচাই না করেই নিজেদের পক্ষের একক ব্যক্তির নাম রেজ্যুলেশন করে কেন্দ্রে পাঠানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দল থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে যারা অভিযুক্ত তাদের নামও তৃণমূলের পাঠানো ওই রেজ্যুলেশনে থাকে বলে জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে অনেক স্থানেই মনোনয়ন দেয়ার পরও প্রার্থী পরিবর্তন করেছে ক্ষমতাসীন দলটির মনোনয়ন বোর্ড।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড জেলা ও উপজেলা কমিটি থেকে পাঠানো নামের তালিকা থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে। জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করছে আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করেছে মনোনয়ন বোর্ড। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাটোর জেলা লালপুর উপজেলাধীন বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের উপজেলা থেকে ১২ জনের নাম রেজ্যুলেশন করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এতে ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মো. মিজানুর রহমানের নাম বাদ পড়ে। পরে জেলা থেকে তার নাম যোগ করা হয়। তবে এই ইউপিতে নৌকার প্রার্থী দেয়া হয়েছে মোসা. পারভীন আকতার বানুকে। তিনি বর্তমানে উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এরই মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যান প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য মনোনয়ন বোর্ডের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

জানা যায়, নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলামের সঙ্গে লালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দলীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কোন্দল চলে আসছে। নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্যের অনুসারী হওয়ায় বর্তমান চেয়ারম্যানের নাম রেজ্যুলেশনে দেয়নি বলে স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে একই উপজেলার চংধুপইল ইউপির জন্য নৌকার মাঝি করা হয়েছে মো. রেজাউল করিমকে। অভিযোগ আছে, তিনি ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রচারণার জন্য রাখা নৌকা প্রতীক ভেঙে ফেলেছিলেন। এই এলাকার নিমতলা বাজারে নৌকার পক্ষের নির্বাচনী অফিসে ঢুকে নেতাকর্মীদের মারধর, অফিস ভাঙচুর, নৌকার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ কারণে তখন তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও করা হয়। এসব অভিযোগ এনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দিয়েছেন চংধুপইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মোজাম্মেল হক।

এদিকে প্রতিবেশী দরিদ্রদের জন্য ত্রাণ সহায়তা চাইতে ৩৩৩ নম্বরে কল করায় লালপুর উপজেলার অর্জুনপুর বরমহাটি (এবি) ইউনিয়নের আঙ্গারিপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলামকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে। এ কারণে চেয়ারম্যানকে শোকজও করেছিল উপজেলা প্রশাসন। সেই কৃষক মামলাও করেছিলেন। তবু এবার অভিযুক্ত আবদুস সাত্তারই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন।

৫৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন মো. আব্দুল আজিজ হাওলাদার। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৪নং দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তিনি। তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়নের জন্য চারজনের একটি তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছিল উপজেলা আওয়ামী লীগ। সেই তালিকার ১ নম্বরে ছিল আব্দুল আজিজ হাওলাদারের নাম। তবে তিনি নন, মনোনয়ন পেয়েছেন রাজাকার সন্তান এবং সাবেক বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন খান। তিনি মাত্র চার মাস আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। দলে যোগ দিয়েই পেয়ে গেছেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ।

গত ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক স্বাক্ষরিত কাগজে তাকে ৪নং দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন খানের বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। তিনি মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। প্রভাবশালী এক আওয়ামী লীগ নেতার যোগসাজশে দলে যোগ দেয়ার চার মাসের মাথায় ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে যান তিনি। তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে পাঠানো মনোনয়ন তালিকায় নাম ছিল না খুলনার তেরখাদা উপজেলার সদর ইউনিয়নের এফএম অহিদুজ্জামানের। অভিযোগ আছে, উপজেলার সবচেয়ে বড় রাজাকার পরিবারের সন্তান তিনি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কারও হয়েছিলেন তিনি। তবে সবকিছুর পরে তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে খুলনার তেরখাদা উপজেলার সদর ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনের মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি।

বিতর্কিত ব্যক্তিকে নৌকা না দিতে মানববন্ধন: ফেনীর পশুরামের মির্জানগর ইউপিতে জামায়াত-শিবিরের পৃষ্ঠপোষক বিতর্কিত ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন না দিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছে ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ। গত শনিবার দুপুরে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ মানববন্ধনে ইউনিয়নের শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলী আকবর ভূঁইয়া, উপজেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম চৌধুরী, জেলা যুবলীগের সদস্য ফখরুল ইসলাম ফারুক, ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবু ইউসুফ, সাবেক ছাত্রনেতা নুরুল আলম বক্তৃতা করেন।


poisha bazar

ads
ads