রাজশাহীতে করোনার ঝুঁকি নিয়েও ৩০ উপজেলায় ত্রিবার্ষিক সম্মেলন!


  • সাইফুল ইসলাম হাফিজ
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৩৫,  আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৪৮

আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের আর মাত্র বছরখানেক বাকি। এর মধ্যে সকল সাংগঠনিক বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন সম্পন্ন করার তাগিদ রয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে। করোনার কারণে অনেক সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা সম্মেলন না করতে পারলেও হাতেগোনা কয়েকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করেছেন সম্মেলন। এমনই একটি সাংগঠনিক বিভাগ হচ্ছে ‘রাজশাহী’। করোনার মধ্যে সেই বিভাগের অর্ধেকের কাছাকাছি জেলা-উপজেলা ও মহানগরের সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে।

তবে নাটোর আর পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে বিব্রত এই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এই নিয়ে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে কমিটি ভেঙে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করে দায়িত্ব দেয়া হবে।

রাজশাহী বিভাগের আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলা রয়েছে ৮টি, একটি মহানগর ও ৮৩টি উপজেলাসহ অসংখ্য ওয়ার্ড রয়েছে। এরইমধ্যে বর্তমান কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩টি জেলা, একটি মহনগর ও ৩০টি উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করেছেন। সেখানে নতুন নেতৃত্বও দেয়া হয়েছে। রাজশাহী জেলা, রাজশাহী মহানগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাট জেলা সম্মেলন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করেছিলেন। সেটির মেয়াদ বর্তমানেও রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগের আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা এরইমধ্যে ৩০ উপজেলায় সম্মেলন করেছেন। সেগুলো হলও রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন (১৪ নভেম্বর ’২০), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা (২ মার্চ ’২০), গোমস্তাপুর উপজেলা (২৪ ফেব্রুয়ারি ’২০), ভোলাহাট উপজেলা (২৯ ফেব্রুয়ারি ’২০), শিবগঞ্জ উপজেলা (২৩ ফেব্রুয়ারি ’২০), নাচোল উপজেলা (২৫ ফেব্রুয়ারি ’২০), নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলা (১৯ ডিসেম্বর ’২০), রানীনগর উপজেলা (২৫ ফেব্রুয়ারি ’২১), আত্রাই উপজেলা (২৮ ফেব্রুয়ারি ’২১০, পোরশা উপজেলা (২২ মার্চ ’২১), বদলগাছী উপজেলা (২৩ মার্চ ’২১), সাপাহার উপজেলা (২৪ মার্চ ’২১), নিয়ামতপুর উপজেলার (৩০ মার্চ ’২১), সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলা (২৯ অক্টোবর ’২০), কামারখন্দ উপজেলা (১৩ ফেব্রুয়ারি ’২১), তারাশ উপজেলা (১৪ ফেব্রুয়ারি ’২১), উল্লাপাড়া উপজেলা (২৭ ফেব্রুয়ারি ’২১), চৌহালী উপজেলা (১৪ মার্চ ’২১), বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা (২৫ ডিসেম্বর ’২০), দুপচাঁচিয়া উপজেলা (২ জানুয়ারি ’২১), সোনাতলা উপজেলা (১৩ মার্চ ’২১), পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলা (৯ মার্চ ’২১), ফরিদপুর উপজেলা (১৮ জুন ’২১), চাটমোহর উপজেলা (১৮ জুন ’২১)। জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলা (১০ মার্চ ’২১), আক্কেলপুর উপজেলা (১১ মার্চ ’২১), নাটোরের সদর উপজেলা (৯ ডিসেম্বর ’১৯), নাটোর পৌর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন (২৮ সেপ্টেম্বর ’১৯), নলডাঙ্গা উপজেলা (৮ ডিসেম্বর ’১৯) ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে এখনও অর্ধশতাধিক উপজেলার সম্মেলন করা হয়নি। এছাড়া নওগাঁ, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা সম্মেলনও সম্পন্ন হয়নি।

গতকাল মঙ্গলবার ধানমণ্ডিতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভাগীয় টিমের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আগামী ২০ ও ২১ নভেম্বর যথাক্রমে পাবনা ও নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনসহ রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান জানান, আওয়ামী লীগের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে, প্রতিটি থানায় একটি সাংগঠনিক ইউনিট হবে। পাবনা জেলার আতাইকুলা ও আমিন বাজার দুটি নতুন থানা হওয়ায় সেগুলোকে সাংগঠনিক ইউনিট ঘোষণা করা হয়েছে। নবগঠিত আতাইকুলা ও আমিন বাজার শাখায় শিগগিরই আহ্বায়ক কমিটি করে দেয়া হবে। তারা সব প্রস্তুতি নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করবেন।

আগামী ২৯ অক্টোবর ইশ্বরদী, ২৪ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, ২৫ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, ২৯ সেপ্টেম্বর পাবনার ঈশ্বরদী, ৩০ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা উপজেলা সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে পাবনার নতুন দুই সাংগঠনিক থানার আহ্বায়ক কমিটি এবং নওগার দুই উপজেলার সম্মেলনের সম্ভাব্য তারিখ ১৬/১৭ অক্টোবর বলে জানানো হয়।

বর্তমান কমিটির মেয়াদকালের মধ্যে বাকি সব উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘করোনার কারণে আমাদের সম্মেলনের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। করোনা না হলে এত দিনে অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা সম্মেলন করা শেষ হয়ে যেত। তবে আমি মনে করি, আগামী নভেম্বরের ভেতরে ৩০টি উপজেলার সম্মেলন করতে পারব। ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি সব সম্মেলন করতে পারব। আমার টিমের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজের প্রতি যে আন্তরিকতা এবং মানসিকতা রয়েছে তার ভিত্তিতে আমরা বাকি সব উপজেলা, জেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সম্মেলন করে পারব। এর জন্য অবশ্যই জেলার নেতাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

এদিকে গত ৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রায় এক বছর পর দলের কার্যনির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাজশাহী বিভাগের দুই জেলার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়। নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল এমপির দ্বন্দ্ব নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন দুই নেতা দুই মেরুতে অবস্থান করছেন। এর আগে সভাপতি আবদুল কুদ্দুস অভিযোগ করেছিলেন সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল তাকে নাটোর শহরে ঢুকতে দেন না। এ ছাড়াও শিমুলের সঙ্গে জেলার অন্য এমপিদেরও সম্পর্ক ভাল নয় বলেও বিভাগীয় সাংগঠনিক রিপোর্টে উঠে আসে। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপির একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আলোচনা করা হয়। নাটোর ও পাবনা জেলার কোন্দল নিরসনের জন্য দ্রুত সম্মেলন দিতে নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘ওখানে (নাটোর) তো তারা দুজনেই এমপি। দুজনের একজন সভাপতি, আরেকজন সেক্রেটারি। তারপরও নিজেদের মধ্যে এত ঝামেলা কেন? দ্বন্দ্ব কেন? প্রয়োজনে ওখানে কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়ে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করে সম্মেলন আয়োজন করো।’

জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘দ্বন্দ্ব সব জায়গাতেই আছে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, এটা থাকবেই। পাবনা-নাটোরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে একটু দূরত্ব হয়েছে। এ জন্য আমরা সম্মেলনের তারিখ দিয়েছি। এই সম্মেলনের ভেতর দিয়ে তাদের দূরত্ব কমে যাবে। লিডারশিপ যে হবে এটা কোনো বিষয় না। এখন যারা আছে তারাও থাকতে পারে। আবার পরিবর্তনও হতে পারে। এটা তাদের কর্মকাণ্ডের উপর নেত্রী (শেখ হাসিনা) সিদ্ধান্ত দেবে বা দল সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে কাউকে বাদ দেয়ার জন্য বা কাউকে রাখার জন্য এই সম্মেলন না। এই সম্মেলন হচ্ছে দলকে গতিশীল করার জন্য। দীর্ঘদিন কর্মকাণ্ড স্থগিত হয়ে আছে। দলকে গতিশীল করা সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।’

সম্মেলন করতে গিয়ে কোন বিষয়টার মুখোমুখি হতে হয় এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘অনেক সময় সম্মেলন করতে চান না নেতারা। এই বেশ চলছে তো, নেতৃত্বে আমরা আছি তো, যদি নেতৃত্ব চলে যায়...। তারা সম্মেলন করতে চায় না এটা একটা সমস্যা। আরেকটি বিষয় হচ্ছে নেতা নির্বাচনে খুব ঝামেলায় পড়তে হয়। তবে নেতা নির্বাচনের জন্য আমি ‘কাউন্সিলর’ পদ্ধতি অবলম্বন করি, প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ৩১ জন করে কাউন্সিলর থাকে। তারা ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত করে। অথবা জেলা-উপজেলার নেতৃবৃন্দ, এমপি-নেতারা মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে ম্যানেজ করে দুজনকে দিতে পারলে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করি।’

মানবকণ্ঠ/আরআই


poisha bazar

ads
ads