‘কাউয়া’ খুঁজছে আওয়ামী লীগ


  • সাইফুল ইসলাম
  • ৩০ জুলাই ২০২১, ০৮:৩০

সংগঠনের সকল উপ-কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ‘কাউয়াদের’ খুঁজতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। তাদেরকে উপ-কমিটিতে সদস্য করার জন্য যারা ‘রেফারেন্স টোকেন’ দিয়েছেন তাদেরকেও জবাবদিহির মধ্যে আনতে যাচ্ছে দেশের প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটি।

সম্প্রতি মহিলা বিষয়ক ‘উপ-কমিটি থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীর বহিষ্কৃত হওয়ার পর সকল উপ-কমিটিতেই শুদ্ধি অভিযান চালানোর অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের এমন উদ্যোগের কথা জানা গেল।

এ ব্যাপারে দলটির সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য পদ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতে হবে। তারা বলেন, দুঃসময়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে যাদের সংশ্লিষ্টতা নেই, তাদেরকে উপ-কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মী ছাড়া কেউ এসব কমিটিতে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসার’ মতো সদস্য পদ পাবে না।

দলীয় সূত্রমতে, ২০১৯ সালের আগে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির বর্তমান ‘সদস্য’ পদের নাম ছিল ‘সহ-সম্পাদক’। সেসময় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এমন ব্যক্তিও সহ-সম্পাদক হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে। তিনি সহ-সম্পাদক পদবিধারীদের ব্যাপারে বিরক্তি ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘পার্টি অফিসে যার সঙ্গে ধাক্কা লাগে, সেই বলেন সহ-সম্পাদক। কিন্তু তারা যে উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক, এটা বলেন না। এই সহ-সম্পাদকের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে অনেকে নিজ জেলায় অনেক হুমকি-ধমকিও মারে। তাই আগামী সম্মেলনে সহ-সম্পাদকের সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে।’

তারপরই ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের ২১তম সম্মেলনে উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক পদ বিলুপ্ত করা হয়। নানা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে দলটি এই সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর উপ-কমিটিতে শুধু সদস্য রাখার বিধান করা হয়। তারপর একের পর এক ঘোষণা করা হয় বর্তমান সকল উপ-কমিটি। সেখানেও অনুপ্রবেশ করেছে ওবায়দুল কাদের কথিত ‘কাউয়ারা’। তিনিই এর আগে ‘বহিরাগতদের’ উদ্দেশ্য করে আওয়ামী লীগে ‘কাউয়া’ ঢুকেছে বলে বেশ কয়েকবার অভিযোগ করেছিলেন।

ক্ষমতাসীন দলটির গঠনতন্ত্রের ২৫-এর ১ ধারার ‘ঝ’ ও ‘ঞ’ উপধারায় উপ-কমিটি গঠন এবং তা তদারক ও সমন্বয়ের ক্ষমতা দলের সভাপতিকে দেয়া হয়েছে। সদস্য সংখ্যাও তিনিই নির্ধারণ করে দেবেন বলে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রীতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকরা সদস্যদের নাম প্রস্তাব করে থাকেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘যারা দলকে ব্যবহার করে স্বার্থ আদায় করে, সেই সকল স্বার্থান্বেষী মহলকে ছাড় দেয়া উচিত হবে না। জনগণের দল হলো আওয়ামী লীগ। জনগণের ভালোবাসার জায়গায় যারাই আঘাত আনার চেষ্টা করবে বা যাদের কর্মকাণ্ডে দলের জনপ্রিয়তা নষ্ট হবে তাদের কাউকেই রেহাই দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে দেখার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঠকবাজরা সব সময় ঠকবাজি করে, প্রতারণা করে। প্রতারকদের কাছ থেকে আমরাও কখনো কখনো প্রতারণার শিকার হই। এই জন্য আমি মনে করি, এসব থেকে দূরে থাকতে সকলের সহযোগিতা করা উচিত। আমাদের নেতা-কর্মীদেরও আরো সজাগ থাকতে হবে- যাতে স্বার্থান্বেষী মহল আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ণ করতে না পারে। সুপারিশকারীদের একটা জবাবদিহিতা রয়েছে। এইগুলো আলোচনা হচ্ছে, এ ধরণের কাজ কারা করে তাও বের হয়ে যায়। আমাদের সকলকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। আমরা কাকে সমর্থন করব, তার অতীত কী, তার বর্তমান কী, তার গতিবিধি কী -এ বিষয়গুলো জেনেশুনেই সমর্থন করতে হবে।’

দলীয় সূত্রে আরো জানা যায়, চিকিৎসার নামে প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ ও জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদকে নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০১৬ সালে গঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির ২৪নং সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ শাহেদ।

তারপর আবারো আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীরের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে উপ-কমিটি। ‘চাকরিজীবী লীগ’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করতে গিয়ে উপ-কমিটি থেকে সদস্য পদ হারান তিনি। তবে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলেও তিনি কী করে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটিতে স্থান পেলেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ব্যবসায়ী কোটায় উপ-কমিটির সদস্য পদ পেয়েছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘যাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, যাদের কারণে জননেত্রী শেখ হাসিনার সকল অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তাদেরকে কোনোভাবেই দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া উচিত না। এই ধরনের কেউ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২২ মার্চ সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভায় ‘কাউয়া’ কারা- এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ওই প্রতিনিধি সভায় কাদের বলেছিলেন, ‘প্রচার লীগ, তরুণ লীগ, কর্মজীবী লীগ, ডিজিটাল লীগ, হাইব্রিড লীগ আছে। কথা হাছা, সংগঠনে কাউয়া ঢুকছে। জায়গায় জায়গায় কাউয়া আছে। পেশাহীন পেশাজীবী দরকার নেই।’


poisha bazar

ads
ads