অর্ধশত এমপির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২৩ জুন ২০২১, ১০:২৩

দেশের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের সেই এমপিরাই ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করে তা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। গড়ে তুলছেন কানাডার বেগম পাড়ার মতো অনেক পাড়া। আর এসবের জন্য ঘুষ গ্রহণ তো আছেই, করছেন জুয়া ও নেশার কারবার।

এ পর্যন্ত সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত এমপির বিরুদ্ধে উঠেছে এমন অনিয়মের অভিযোগ। এবার এসব অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটনে জোর তৎপরতা শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরইমধ্যে অভিযুক্তদের ৬ জনের বিরুদ্ধে জারি করা হচ্ছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রধান তিন দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ও সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপিরা এসব অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন বেশি। তবে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া ছোট দলের এমপিরাও পিছিয়ে নেই। কম বেশি তারাও ঝুঁকছেন অপরাধে।

তথ্যমতে, এ পর্যন্ত সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত এমপির বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ। এদের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। এরইমধ্যে তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত পরশু নতুন করে জাতীয় সংসদের হুইপ চট্টগ্রামের পটিয়ার এমপি শামসুল হক চৌধুরী, ভোলা-৩ আসনের নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সুনামগঞ্জ-১ আসনের মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আবেদনে দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাদের শত শত কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে বড় বড় ঠিকাদারি কাজ নেয়া। বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্যাসিনো ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকা অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্জন করে বিদেশে পাচার এবং জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।’

তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমতি চাওয়া হয় জজ আদালতের কাছে। দুদকের পক্ষে আবেদনের ওপর শুনানি করেন মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর। শুনানি শেষে আদালত তা মঞ্জুর করে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নিতে নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে দুদক সচিব মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার মঙ্গলবার বলেন, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনে এমপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এ নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। এটি আগেই ছিল। আদালত এখন এটির অনুমোদন দিয়েছেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের এমপি সামশুল হক চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ ২২ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল গত বছরই। সে বারের তালিকায় তাদের সঙ্গে গণপূর্ত অধিদফতরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হাই এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার, ঠিকাদার জি কে শামীম, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা খালেদ মাহমুদ ভঁইয়া, মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, তার সহযোগী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান, গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও তার ভাই গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রুপন ভ‚ঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী কাজী আনিছুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ ও লোকমান হোসেন ভ‚ঁইয়ার স্ত্রী নাবিলা লোকমান, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ, কাকরাইলের জাকির এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাকির হোসেন ও সেগুনবাগিচার শফিক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শফিকুল ইসলাম ছিলেন।

ওই সময় দুদকের দেয়া চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দেশে মানি লন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধানে বিষয়টির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে দুদক জেনেছে অভিযোগসংশ্লিষ্টরা দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাই তারা যাতে দেশ ছেড়ে যেতে না পারেন সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’

অবশ্য এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন এমপিরা। অভিযুক্ত সুনামগঞ্জের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন দাবি করেছেন, তার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। তিনি নিজেই দুর্নীতির ?বিরুদ্ধে সোচ্চার জানিয়ে বলেন, ‘একটি পক্ষ থেকে রাজনৈতিকভাবে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে। আমার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। বিদেশে আমার কোনো বাড়ি নেই।’ অভিযুক্ত অন্য এমপিদের বক্তব্য প্রায় একই।

জানা গেছে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, খাস জমি দখল, ঘুষ গ্রহণ, কমিশন, চাঁদাবাজিসহ নানা দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বর্তমান সংসদের ১১ জন এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরো ১০ জন সাবেক সংসদ সদস্যকে নিয়েও চলছে অনুসন্ধান।

বর্তমান এমপিদের মধ্যে যাদের নিয়ে অনুসন্ধান চলছে, তারা হলেন- আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরী, মাহফুজুর রহমান মিতা, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সামশুল হক চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাবু, পঙ্কজ দেবনাথ, আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। এ ছাড়া বিকল্পধারার মাহি বি চৌধুরী। আর স্বতন্ত্র এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল ও তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ হয়েছে। এরইমধ্যে পাপুল সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন।

এদিকে সাবেক এমপিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বি এম মোজাম্মেল হক, কামরুল আশরাফ খান পোটন, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, শামসুল হক ভূঁইয়াকে নিয়ে খাতা খোলা হয়েছিল দুদকে। এ তালিকায় বিএনপি নেতাদের মধ্যে রয়েছেন রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. শাহজাহান, আব্দুল মোমিন তালুকদার, শহিদুজ্জামান বেল্টু। জাতীয় পার্টির এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নামও রয়েছে এর মধ্যে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সংসদের ১১ জনের অনুসন্ধানের শুরুটা ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় থেকেই হয়েছিল। সাবেক এমপিদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল অন্তত তিন বছর আগে থেকে। রাজশাহী-১ আসনের এমপি ও সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরীকে নিয়ে দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, খাস জমি ইজারায় দুর্নীতি, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ অন্তত ২০ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে আসে।

১০ থেকে ২০ শতাংশ ঘুষ নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে চট্টগ্রাম-৩ আসনের এমপি মাহফুজুর রহমান মিতাকে নিয়ে শুরু হয় দুদকের অনুসন্ধান। ওই সময় দুদকের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকায় উঠে আসে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবু ও বরিশাল-৪ আসনের পঙ্কজ দেবনাথের নাম। তাদের সম্পদের পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি ও বিকল্পধারার নেতা মাহী বি চৌধুরীকে নিয়ে শুরু হয় অনুসন্ধান।

একই অভিযোগে ভোলা-৪ আসনের এমপি আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়। সাবেক এমপিদের মধ্যে বিএনপির রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আসাদুল হাবিব দুলু ও শাহজাহানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, শরীয়তপুর-১ আসনের সাবেক এমপি মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চলছে।


poisha bazar

ads
ads