নয়াপল্টনেই সমাবেশ করতে অনড় অবস্থানে বিএনপি

১০ ডিসেম্বর এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা: ফখরুল


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৩ নভেম্বর ২০২২, ১৫:৪৫,  আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২২, ১৫:৫০

মজুমদার ইমরান: আগামী ১০ ডিসেম্বর ঘিরে দিন দিন রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। কি ঘটবে ১০ ডিসেম্বর তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ-আলোচনা। দিনটি ঘিরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদল বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে, বিবৃতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায় ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে গণসমাবেশ করতে অনড় অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলটি অন্য কোনো বিকল্প ভেন্যুতে সমাবেশ করতে রাজি নয়।

গত ১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বিএনপি নয়াপল্টনে ১০ ডিসেম্বর গণসমাবেশ করার লিখিতভাবে অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। এদিকে ডিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বিএনপির আবেদন পেলেও এখনো অনুমতি দেয়নি। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের পর বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতির বিষয়টি জানানো হবে। তবে সেটি কবে নাগাদ জানানো হতে পারে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

ডিএমপির একটি সূত্র জানায়, নয়াপল্টনে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি প্রশাসন। গণসমাবেশকে সামনে রেখে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। জানা গেছে, বিএনপিকে অনুমতি দিলেও একবারে শেষ পর্যায়ে এসে অনুমতি দেয়া হতে পারে। যাতে বিএনপি নেতাকর্মীরা লোকসমাগম করতে বেশি সময় না পায়।

একটি সূত্র জানায়, বিএনপিকে বড় জমায়েত করার জন্য পুলিশ বিকল্প জায়গার প্রস্তাব দিতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজধানীর পূর্বাচল বাণিজ্যমেলার মাঠে অথবা টঙ্গী ইজতেমা মাঠে সমাবেশ করতে বলা হতে পারে। যদিও নয়াপল্টন ছাড়া অন্যকোনো বিকল্পস্থানে সমাবেশ করার কথা নাকচ করে দিয়েছেন বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল সালাম।

তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, আমরা ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে গণসমাবেশ করতে চাই। সেজন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি অনুমতি পাব। নয়াপল্টনেই সমাবেশ হবে। এর বাইরে বিকল্প কোনো ভেন্যুতে আমরা সমাবেশ করব না। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির সমাবেশ ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ করছে, বাধা সৃষ্টি করছে। তাই নয়াপল্টনে সমাবেশ করলে সরকারি দল তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারবে না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জোর দিয়ে বলেছেন ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গণসমাবেশ ঘোষিত স্থানেই (নয়াপল্টন) অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই- কুমিল্লায় ২৬ নভেম্বর, রাজশাহীতে ৩ ডিসেম্বর ও ঢাকায় ১০ ডিসেম্বর তারিখ বিভাগীয় সমাবেশ নির্ধারিত দিনে ঘোষিত স্থানেই অনুষ্ঠিত হবে। এসব সমাবেশে সরকারকে বাধা না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, সরকারের উচিত হবে সমাবেশগুলোতে বাধা না দেয়া এবং নিজেদের এভাবে একেবারে হাস্যকর অবস্থানে না নিয়ে যাওয়া। যখন তারা বলে- আমরা সুন্দর ব্যবস্থা করছি, সমাবেশকে সমর্থন করছি, সহযোগিতা করছি, তখন লোকে হাসে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, ঢাকার বাইরের বিভাগীয় সমাবেশগুলোর আগে গণপরিবহন বন্ধ করাসহ দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও ধরপাকড় চালিয়েছে সরকারি দল। পথে পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গণসমাবেশকে সামনে রেখেও সরকার নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বরং ঢাকায় প্রতিবন্ধকতা আরও বাড়াবে। এসব মাথায় রেখেই ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। নয়াপল্টনে ভেন্যু হলে এখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তেমন কোনো বাধা, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। 

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আগামী ১০ ডিসেম্বর নাকি সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। দেশটা কি কারও বাপের রাজত্ব নাকি। দশ তারিখে এখানেই (নয়াপল্টনে) সমাবেশ হবে। এটা জনগণের ঘোষণা। আসল ঘোষণা আসবে ১০ তারিখে। সেদিন থেকে শুরু হবে এক দফার আন্দোলন।  মির্জা ফখরুল বলেন, এক দফা এক দাবি হাসিনা তুই কবে যাবি। এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। যেতে হবে... এবং শান্তিপূর্ণভাবে চলে যান। এ সময় আওয়ামী লীগের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আমাদের দাবি পরিষ্কার। বলেছি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে, আমাদের শাওন, নুরে আলম, আব্দুর রহিমের হত্যার প্রতিবাদে, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে, দেশের ৩৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এই সমাবেশ। এখানে কোনো প্রকার ছাড় নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রদল নেতা নয়ন হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এই সমাবেশের আয়োজন করে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু এবং উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হকে সঞ্চালনায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানুল্লাহ আমান, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম, যুবদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা সাতটি সমাবেশ করেছি প্রতিটি সমাবেশে বাধা দিয়েছে এরা কত বড় ভীরু, কাপুরুষ। গাড়ি বন্ধ করে দেয়, লঞ্চ বন্ধ করে দেয়, লেগুনা বন্ধ করে দেয়Ñ এমন কি অটোরিকশা ভ্যানও ঠেকায় পথে পথে বিএনপি কর্মীদেরও বাধা দেয় তাতে কি সমাবেশ বন্ধ করতে পেরেছে? তিন ঘণ্টার সমাবেশকে তোমরা তিন দিন বানিয়েছো। আমরা কোনো নিষেধাজ্ঞা চাই না, এটা দেশের জন্য লজ্জার। কিন্তু এই লজ্জার জন্য দায়ী কে একমাত্র শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সরকার।

জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় সরকারের সুশাসনের চিত্র ফুটে উঠেছে: এর আগে সকালে সরকার সমর্থকদের হামলায় আহত দলের সাবেক সংসদ রুমানা মাহমুদকে দেখার পর রাজধানীর ফার্মগেটে সাংবাদিকদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঢাকায় দুই জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ‘সরকারের গভার্ন্যান্সের (সুশাসন) চিত্র’ ফুটে উঠেছে।

তিনি বলেন, চারদিকে তাকালে চোর আর চোর চুরি; চারদিকে তাকালে গুণ্ডামি; চারদিকে তাকালে মারামারি। তারা এত কিছু করছেন, এক দিনমজুরকে গুলি করে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে দিতে পারছেন। আর আপনাদের (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) সামনে দিয়ে জঙ্গি উধাও হয়ে যাচ্ছে। বুঝতেই পারেন তাদের (সরকার) গভর্ন্যান্স। কোন জায়গায় তারা গভার্ন্যান্সকে নিয়ে এসেছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশ এক গভীর সংকটে পড়ে গেছে, একেবারে খাদের কিনারায় এসে গেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, আরেক দিকে রাজনৈতিক সংকট। এর সমাধান না করলে এ দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। আমরা আশা করছি দেশে সত্যিকার অর্থে একটা অন্তর্বর্তীকালীন কেয়ারটেকার সরকারের কাছে ক্ষমতা দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে সরকার। অন্যথায়  এ সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা আমরা দেখি না।’

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দেশ ও জাতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে বলে আমি মনে করি। এটা একটা ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট। যদি নির্বাচন ঠিকমতো না হয়, নির্বাচনে যদি জনপ্রতিনিধি সঠিকভাবে নির্বাচিত না হয়, সে দেশ কিভাবে চলবে? ‘আপনারা পাশের দেশগুলোর দিকে দেখেন। ভারতের কি কম সমস্যা আছে? ভারতে নির্বাচন হচ্ছে, সবাই সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। নেপালে একেবারে বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলগুলো, সোশ্যালিস্ট, রেভ্যুলেশনারি, লিবারেল ডেমোক্রেন্সি ইলেকশন করছে এবং সবাই নির্বাচনে যাচ্ছে। সেখানে নির্বাচনে যাওয়ার পরিবেশ আছে। দুর্ভাগ্যজনক আমরা সেটা করতে পারি নাই। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে আওয়ামী লীগ এই সংকট সৃষ্টি করেছে।’

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar