নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আলোচনার মূল ইস্যু

বিএনপিকে নিয়েই ‘বিশেষ সংলাপ’ চায় ইসি

সব দলকে এক টেবিলে বসানোর পরিকল্পনা


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০৪ আগস্ট ২০২২, ১৫:০০

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে সংলাপে বসার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় সেরে নিয়েছে কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যন্ত্রটির তীব্র বিরোধিতাকারী রাজপথের অন্যতম বড় দল বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েও ওই সংলাপে অংশগ্রহণ করাতে পারেনি নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি। এরপর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরির লক্ষ্যে গত ১৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত চলা রাজনৈতিক সংলাপে দলটিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত যোগাযোগও করা হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। কিন্তু নির্দলীয় সরকারের দাবিতে অনড় থাকা বিএনপি তাদের সতীর্থদের নিয়ে সেই সংলাপও বর্জন করে। ফলে অংশগ্রহণমূলক ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বুলি আওড়ানো সাংবিধানিক সংস্থা ইসি ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে পড়ে যায় অনিশ্চয়তায়।

ইসি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিএনপির মতো বড় একটি দলকে বাইরে রেখে নির্বাচনের মতো বিশাল একটি কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা অনেকাংশেই সম্ভবপর হবে না। সেইসঙ্গে সর্বজনগ্রাহ্য ও অংশগ্রহণমূলক ভোট করতে না পারার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হতে পারে আগের কমিশনের মতো। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বারবারই সংস্থাটি তাগিদ দিতে থাকে চলমান রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবে সুরাহা করার। তবে ইসির এই তাগিদ বিএনপি শিবিরের কর্ণপাত হবে না- এটি অনেকটাই স্পষ্ট। তাই এবার শেষ চেষ্টাটুকুও করতে চায় কমিশন। শিগগিরই একটি বিশেষ সংলাপ আয়োজন করে তাতে অন্যসব দলের সঙ্গে একই টেবিলে বিএনপিকেও বসানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। রাজনৈতিক সংলাপে আসা প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনা করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য তৈরি করা রোডম্যাপের খসড়া চ‚ড়ান্ত করার পাশাপাশি ওই সংলাপে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মতামতও নেয়ার চেষ্টা করা হবে। বিশেষ এই সংলাপে বিএনপির অংশগ্রহণ থাকবে বলেও আশাবাদী কমিশন।

নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর এ বিষয়ে জানান, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো নিয়ে তারা এরইমধ্যে পর্যালোচনা শুরু করে দিয়েছেন। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই  রোডম্যাপের খসড়াটি প্রস্তুত করা হবে। এরপর ফের গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ জন ও দলগুলোকে ডাকা হবে। এক্ষেত্রে ডাকা হবে সংলাপে সাড়া না দেয়া বিএনপিকেও। বিএনপির নির্বাচনে না আসার ঘোষণাকে রাজনৈতিক সংকট হিসেবেই দেখছে ইসি। এবং এ সংকট মোকাবিলা রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। আর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়েও তারা কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান এ নির্বাচন কমিশনার। তিনি জানান, বিশেষ সংলাপটি অনুষ্ঠিত হবে দিনব্যাপী। সেখানে সবাই এক মঞ্চেই থাকবেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেক গ্রুপ থেকে ৪-৫ জন করে অংশ নেবে। সংলাপে নির্বাচনী রোডম্যাপ উপস্থাপন করে অংশীজনের কাছ থেকে মতামত নেয়া হবে। এরপর সংসদ নির্বাচনের চ‚ড়ান্ত রোডম্যাপ প্রণয়ন করবে নির্বাচন কমিশন।

অবশ্য বিএনপি ইসির এই প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেবে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে শুরু থেকেই কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না দলটি। ইসি গঠনে সার্চ কমিটি গঠনে কোনো নাম প্রস্তাব করেনি বিএনপি। সেই থেকে ইসি বিষয়ে তাদের অনাগ্রহের বিয়য়টি শুরু। এরপর ইসি গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আনুষ্ঠানিক সংলাপ বর্জন করে দলটি। সর্বশেষ ইভিএম নিয়ে ইসির মতবিনিময়েও অংশ নেয়নি বিএনপি। রাষ্ট্রপতির সংলাপের সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠক করে বলেছে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ছাড়া শুধু নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সংলাপকে অর্থহীন বলে মনে করে বিএনপি। তাই তারা অর্থহীন কোনো সংলাপে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর নতুন কমিশন গঠিত হলে তাদের ডাকা দুই দফা সংলাপও বর্জন করে দলটি। 

বিএনপি নেতারা মনে করেন, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন কোনো বিষয় নয়। মূল বিষয় নির্বাচনকালীন সরকার। শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সেটি কোনোভাবেই সুষ্ঠু করতে পারবে না ইসি। তাই নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সংলাপে যেতে ইচ্ছুক নন তারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে বলে আসছি যে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এটা প্রমাণিত সত্য। তাই আমরা এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া আমরা নির্বাচনে যাব না। এ বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আমরা আলোচনা বা সংলাপও করতে চাই না।’

এদিকে দিনব্যাপী অনুষ্ঠেয় বিশেষ সংলাপে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের এক মঞ্চে বসানোর পরিকল্পনা করছে ইসি। ৫টি গ্রæপ, একসঙ্গে বসে আলোচনা হবে। প্রত্যেক গ্রুপ থেকে কয়েকজন করে আসবে। এক্ষেত্রে যে দাবিগুলো খুব বেশি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। ওই সংলাপে নির্বাচনের রোডম্যাপ উপস্থাপন করে সবার কাছ থেকে মতামত নেয়া হবে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা চলছে। বাস্তবায়নের এখতিয়ার অনুযায়ী প্রস্তাবগুলো ভাগ করা হচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত সংলাপে তিন ধরনের সুপারিশ এসেছে। কিছু কিছু সুপারিশ আছে সংবিধান ও আইনের মধ্য থেকে করতে হবে। কিছু কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আর কিছু আছে ইসির এখতিয়ারের মধ্যে নয়। এসব নিয়ে কীভাবে কী করা যায়, তাই আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে।

সূত্র জানায়, যেসব সুপারিশ ইসির এখতিয়ারভুক্ত এবং যেগুলো নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে নেইÑ এমন প্রস্তাব আলাদা করা হচ্ছে। যেগুলোর বাস্তবায়ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, সংবিধান ও আইন সংশোধন করতে হবে-আলাদা করা হচ্ছে সেগুলোও। প্রস্তাবের ধরন অনুযায়ী রোডম্যাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব বাস্তবায়নে কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, এতে সম্পৃক্ত কারা প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর এ বিষয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো নিয়ে তারা পর্যালোচনা করছেন। প্রস্তাবগুলো নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পেপার তৈরি করা হবে। এরপর আবারও গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞজন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষ সংলাপ হবে। তিনি বলেন, বিশেষ সংলাপে রোডম্যাপের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, সুবিধা-অসুবিধা, অর্থসংক্রান্ত বিষয়, লোকবল, চ্যালেঞ্জ প্রভৃতি উল্লেখ থাকবে। যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করতে পারি, তা নিয়েও আলোচনা হবে।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar