কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি- প্রায় ১৪শ হলেও দপ্তরের দাবি ৩০০ পদ বিতরণ

শেষবেলায় ছাত্রলীগে গণহারে পদ বিতরণ

ফেসবুকে ভাইরাল ‘শূন্য পদে মনোনীত চিঠি’


  • সাইফুল ইসলাম
  • ০৩ আগস্ট ২০২২, ১৫:১৯

শোকের মাস আগস্ট গেলেই হতে যাচ্ছে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন। আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সম্মেলন করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। বর্তমান কমিটির শেষবেলায় এসে গণহারে পদ বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। শোকের মাস আগস্টের শুরুতে প্রায় ১৪শ পদ বিতরণ করার অভিযোগ করেছেন সংগঠনটির সিনিয়র নেতারা। গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের মতো লোকদের পদে পদায়ন করা হয়। এছাড়া ছাত্রলীগের একটি ‘শূন্য পদে মনোনীত চিঠি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই সেই চিঠিটি ডাউনলোড দিয়ে নিজের নাম ও পদ লিখে নিজেকে কেন্দ্রীয় নেতা দাবি করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে সেটি এডিট করা হয়েছে দাবি করেছেন সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক।

ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, শেষসময়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যেভাবে কমিটি বিলি করছেন, তাদের পছন্দের লোকদের পদ-পদবি দিচ্ছেন। তারা সংগঠনের শেষ পেরেকটা মারছে। এটা তাদের উচিত হয় নাই। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং শেখ হাসিনার আমানতের সঙ্গে একেবারে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে যতটুকু তথ্য আছে এতে প্রায় ১৪শ’র মতো পদ তারা বিলি করেছেন। এরকম একটা খবর আমাদের কাছে আসছে। আমরা সিনিয়ররা অতিশিগগিরই বসবো। অবশ্যই আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চার জাতীয় নেতাকে অবগত করব।

জানা গেছে, আগস্ট মাস (শোকের মাস) শুরু হওয়ার আগে রবিবার রাতে একদিনে জেলা, জেলা সমমনা ও উপজেলা মিলে ১১টি ইউনিটে কোথাও পূর্ণাঙ্গ ও কোথাও আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। একইসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ইউনিটে শীর্ষ পদে আসতে না পারা পদপ্রত্যাশীসহ প্রায় ৩০০ জনকে বিভিন্ন উপ-সম্পাদক, সহ-সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্বাহী সংসদের বর্ধিত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কমিটি ঘোষণাকৃত ইউনিটগুলো হল- ঝিনাইদহ জেলা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নরসিংদী জেলা, ল²ীপুর জেলা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম জেলা উত্তর, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঝিনাইদহ সদর এবং চকরিয়া উপজেলা।

দলীয় সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের ‘গঠনতান্ত্রিক মেয়াদের’ শেষ সময়ে এসে কোনো তালিকা ছাড়াই গণহারে পদ দেয়া হচ্ছে। গত ৩১ জুলাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন করে পদ দেয়া হয়েছে অন্তত ৩০০ জনকে। তার সঙ্গে ‘শূন্য পদে মনোনীত’ ছাত্রলীগের প্যাডে একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর ও সিল দেয়া রয়েছে। সেই প্যাডে অনেকেই নিজের নাম ও পছন্দমতো পদ লেখে ফেসবুকে দেন।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, গঠনতন্ত্র মেনে তারা শূন্য পদের বিপরীতে এসব পদ দিচ্ছেন। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা এখন কত দাঁড়িয়েছে, তা ছাত্রলীগের নেতারা বলতে পারেননি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বলেন, সম্প্রতি অনেক বিষয়ে ছাত্রলীগের একাধিক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটিগুলো হওয়ার পর থেকে পদবঞ্চিতদের বর্ধিত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু তখন পদ না দিয়ে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে গণহারে পদ দেয়ার মাধ্যমে সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের পছন্দের লোকদের পদ দিচ্ছেন।

জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ইন্দ্রনীল দেব শর্মা রনি বলেন, যারা পদ পেয়েছেন তাদের মধ্য থেকে যে কোনো একটি চিঠিকে বø্যাংক তৈরি করা হয়েছে। এটা ষড়যন্ত্র করে কেউ করেছে। আমরা একজনকে বহিষ্কার করেছি। ৩১ তারিখ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেককেই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ঢাকার বাইরেও ৪০টার মতো পদ দেয়া হয়েছে। কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা ৩০০ কাছাকাছি হবে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি প্রকাশের প্রায় ১০ মাস পর ২০১৯ সালের ১৩ মে সংগঠনটির ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটি ঘোষণা করেন সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। কমিটিতে পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সেদিন সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে রেজওয়ানুল ও রাব্বানীর অনুসারীরা তাদের ওপর হামলা চালান। এতে সংগঠনের কয়েকজন নারী নেতাসহ ১০-১২ জন আহত হন। এরপর বিতর্কিতদের বাদ দেয়াসহ চার দফা দাবিতে কয়েক দফায় অবস্থান কর্মসূচি ও অনশন করেন পদবঞ্চিতরা।

নৈতিক স্খলন, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদা দাবিসহ নানা অভিযোগে একই বছরের সেপ্টেম্বরে রেজওয়ানুল ও রাব্বানীকে পদচ্যুত করা হয়। তাদের পর ছাত্রলীগের দায়িত্ব পান আল নাহিয়ান খান ও লেখক ভট্টাচার্য। একই বছরের ২১ ডিসেম্বর ৩২ নেতা-নেত্রীকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ দেন আল নাহিয়ান ও লেখক। ওই ৩২ জনের মধ্যে ২১ জনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। আর ১১ জন পদ থেকে অব্যাহতি নিতে নিজেরাই আবেদন করেছিলেন। এর এক বছর এক মাসের বেশি সময় পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সেই ৩২ পদসহ শূন্য হওয়া মোট ৬৮টি পদ পূরণ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে বার বার কল দিলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar