মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আবদার ‘আপা যদি একটু বলতেন...’


  • সাইফুল ইসলাম
  • ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৮

দেশজুড়েই চলছে স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন সামনে। এ ধাপের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করতে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শেষ করেছে ক্ষমতাসীনরা। তবে মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার পরই জোর তদবির শুরু করেছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। স্থানীয় পর্যায়ের কেন্দ্রীয় নেতা, সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও দলের সিনিয়র নেতাদের বাসা কিংবা অফিসে ভিড়তে দেখা যায় তাদের।

‘আমার নামটা যদি একটু বলতেন’—মনোনয়নপ্রত্যাশীদের এমন আবদারই বেশি বলে জানান আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের একাধিক নেতা। আবার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অনেকের ব্যাপারে এরই মধ্যে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির কার্যালয়ে বলে জানা গেছে।

ক্ষমতাসীন দলটির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ‘আমরা মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য নই, এটা জানার পরও আমাদের কাছে তারা এসে বলেন— ‘আমার সম্পর্কে আপনি তো সবই জানেন, আপাকে (নেত্রীকে) একটু বলবেন। সংগঠনের জন্য কত যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, কত বার যে জেলে গেছি। আপনি যদি আমার ব্যাপারে একটু বলতেন, তাহলে মনে হয় মনোনয়নটা পেয়ে যেতাম।’

কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে নিজেদের ত্যাগ ও দলের প্রতি আনুগত্য বুঝানোরও চেষ্টা করেন তারা। তবে নিজেদের ইতিবাচক গুণগুলো তুলে ধরা ছাড়াও অন্য প্রার্থীদের ব্যাপারে ‘যা-তা’ বলতেও পিছপা হন না মনোনয়নপ্রত্যাশীরা—এমনটাও জানান দলটির নেতারা।

সারাদেশে ২য় ধাপে ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনসহ একটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ও বেশ কয়েকটি পৌরসভা নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির কাজ শেষ করেছে আওয়ামী লীগ। গত ২ অক্টোবর থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার তারিখ নির্ধারণ ছিল।

এই ধাপে জাতীয় সংসদের সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের উপনির্বাচন এবং দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট, নীলফামারী জেলার ডোমার, বগুড়া জেলার সোনাতলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, নড়াইল জেলার লোহাগড়া, কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া, নরসিংদী জেলার ঘোড়াশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা, ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

গত তিন দিনে ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ৪৪৫৮টি, পৌরসভার জন্য ৫৩টি, উপজেলার জন্য ১৯টি ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের জন্য ১১টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে।

এদিকে বিগত নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের প্রার্থীদের নাম পাঠিয়েছিল তৃণমূল। এবারো এ প্রক্রিয়ার ব্যতিক্রম হবে না। তবে কোনোভাবেই ‘বিতর্কিত ব্যক্তিদের’ নাম কেন্দ্রে না পাঠানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছে দলটি।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সঠিক প্রার্থী বাছাই করতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের একটি তালিকা কেন্দ্রে পাঠায় জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ। প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভার বিপরীতে তিনজন বা তার চেয়ে বেশি নাম পাঠানো হয়। এই তালিকা থেকেই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক কারা পাবেন—তা বাছাই করা হয়। তবে আগের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হতে দেখা যায় অনেককে।

তাদের দাবি, ‘যাদের প্রার্থী করা হয়েছিল, তা বিতর্কিত ও দলের জন্য ত্যাগী নয়।’ এ ধাপের নির্বাচনে এসব দিক দেখেশুনে যেন প্রার্থী করা হয়, তা গুরুত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা। কোথাও অনিয়ম হলে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান সিনিয়র নেতারা।

দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৮(৩)(ঙ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আগ্রহী প্রার্থীদের প্যানেল তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ বর্ধিত সভার আয়োজন করবে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থীদের একটি প্যানেল সুপারিশের জন্য কেন্দ্রে পাঠাবে। উক্ত প্যানেলটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের (মোট ৬ জন) যুক্তস্বাক্ষরে তফসিলে ঘোষিত সময়ের আগে আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা দিতে হয়।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর নাম পাঠাতে হবে। টাকা খেয়ে খারাপ লোকের নাম কেন্দ্রে পাঠাবেন না। খারাপ মানুষ দিয়ে রাজনীতি করলে দল নষ্ট হয়ে যাবে। দুঃসময়ে বসন্তের কোকিলরা দলে থাকবে না, ত্যাগীরাই সুখে-দুঃখে দলের পাশে থাকবে।’

মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও উত্সব: ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু থেকে দলে সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় ঘিরে চলেছে ফরম কেনার উত্সব। মনোনয়ন ফরম কেনা ও জমা দেয়ার সময় মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে উপস্থিত থাকেন স্থানীয় নেতারা। একেক প্রার্থীর সঙ্গে ন্যূনতম হলেও আট-দশজন থাকেন। সবাই মনোনয়ন ফরম ক্রয় করতে অফিসের ভেতরে না যেতে পারলেও বাইরে থেকেই করতালি, স্লোগান দিয়ে উত্সবে মেতে উঠেন।
সবার মুখেই থাকে হাসি। মনোনয়ন ফরম ক্রয় করে যেন দলীয় প্রতীকই হাতে পেয়েছেন—এমন আনন্দ ফুটে উঠে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মুখে। হাসি থাকে নেতাকর্মীদর মুখেও। ধানমণ্ডিতে অবস্থিত অফিসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গত পাঁচ দিন হাজারের অধিক মানুষের ভিড় ছিল। দলীয় মনোনয়ন ফরম ক্রয় করতে আসা আবুল হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কার্যক্রম এখন একটি উত্সবে পরিণত হয়েছে। আমাদের দলীয় মনোনয়ন কাকে দেয় আমরা জানি না। তবে যাকেই দল থেকে মনোনয়ন দেবে তাকেই আমরা সমর্থন করব। দলীয় মনোনয়ন ক্রয় আমাদের কাছে আনন্দের বিষয়।’

মনোনয়ন বোর্ড সভা আজ: আজ বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি। এই সভায় দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: দলীয় সভানেত্রীর ধানমণ্ডি কার্যালয় সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ধাপের ভোটে যারা নৌকা প্রতীক পেতে চান তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। এতে দেখা যায়, এমন ব্যক্তিরা মনোনয়ন চেয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার অভিযোগ রয়েছে।

আরো আছেন রাজাকারের নাতি, বিএনপির সাবেক নেতা, নারী নির্যাতনের মামলার আসামি, সাংবাদিক নির্যাতনকারী, দুর্নীতি কমিশন-দুদকের মামলার আসামিও। একই সঙ্গে হত্যা মামলার আসামি রয়েছেন। রয়েছেন দলীয় নেতাকর্মী নির্যাতনকারী নেতাকর্মীরাও।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্সের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শামসুল আলম। এতে প্রিন্সের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যাকারীদের মদদ প্রদানের অভিযোগ করেছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা রয়েছে। বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে নৌকা প্রতীক না দেয়ার জন্য দলীয় সভানেত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম হাওলাদারের স্বাক্ষর জাল করে কেন্দ্রে তালিকা জমা দেয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে সভাপতির কার্যালয়ে। তালিকায় জেলার সভাপতি একেএম আবদুল আউয়ালের স্বাক্ষরও রয়েছে। তবে জেলার সভাপতি এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি প্রথমে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেনকে জানিয়েছেন। পরে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে অবহিত করেছেন।

এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম হাওলাদার অভিযোগ করেন, জেলা থেকে যে তালিকা জমা দেয়া হয়েছে সে তালিকায় আমি স্বাক্ষর করিনি। বিষয়টি নিয়ে জেলা সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জেলা সভাপতি একেএম আবদুল আউয়ালকে একাধিকার ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

জামালপুর সদরের ২নং শরীফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম আলম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিধবা কার্ড করে দেয়ার প্রলোভনে টাকা নেয়া, গরিবের চাল বিক্রিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ফিরোজ খান। তার বিরুদ্ধেও লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ দেয়া হয়েছে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমানের কাছেও। লিখিত অভিযোগে রয়েছে, ফিরোজ খান নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি। একই সঙ্গে তিনি রাজাকার পরিবারের সদস্য।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার দোয়ারাবাজার ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আবুল মিয়া। আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা দেয়া একটি লিখিত অভিযোগে আবুল মিয়াকে রাজাকারের নাতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।



poisha bazar

ads
ads