খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেয়ার চলছে প্রস্তুতি


  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ০৮ মে ২০২১, ১০:২৪

খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিতে লন্ডন (যুক্তরাজ্য) ছাড়াও সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরসহ চিকিৎসা পাওয়া যায়- এমন সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বিএনপি ও তার পরিবার। যুক্তরাজ্য খালেদা জিয়ার ভিসার আবেদন বিবেচনা করবে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে সেদেশটির হাইকমিশনের একজন মুখপাত্র। অন্য দেশগুলোর ভিসা পেতেও সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সরকারের অনুমতি পেলেই ভিসা চূড়ান্তকরণের বিষয়টি আরো ত্বরিত গতিতে হবে বলে জানিয়েছে খালেদা জিয়ার পরিবার। তবে সরকার বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিলেও খালেদা জিয়া বর্তমান শারীরিক অবস্থায় দীর্ঘ উড়োজাহাজ ভ্রমণের ধকল সামলাতে পারবেন কি না, সেই সংশয় ওঠেছে।

বিএনপি নেত্রীকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দিতে চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসকরা এ সংশয় প্রকাশ করেছেন। খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল টিমের সদস্য অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন অবশ্য শুক্রবার জানান, সরকারের অনুমতি পেলেই খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার বিষয়ে মেডিক্যাল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।

রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালের বাইরে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানাতে এলে বিদেশ নেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ডা. জাহিদ বলেন, ‘এখন এটি সরকারের বিষয়, তারা কবে নাগাদ উনাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে। যখন অনুমতি আসবে, তখন হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ড এই ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’

বিমানে ভ্রমণের মতো শারীরিক অবস্থা বিএনপি চেয়ারপারসনের আছে কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সরকারের অনুমতির পরেই এ বিষয়ে মেডিক্যাল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।’

৭৬ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ডা. জাহিদ বলেন, ‘আজকেও মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা উনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যে চিকিৎসা গতদিনও ছিল, সেই চিকিৎসাই বোর্ড অব্যাহত রেখেছেন।’

তাছাড়া যেসব দেশে খালেদা জিয়াকে নেয়ার চেষ্টা চলছে, করোনার কারণে সেই সব দেশে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে কড়াকড়িও একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তার পরিবারের সদস্যরা। ৫ মে বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দার তার বোন খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার আবেদন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি নিয়ে যান। পরে রাতেই চিঠিটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় মতামতের জন্য। ৬ মে বৃহস্পতিবার বিকালে সে চিঠি আইনমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব।

মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, প্রক্রিয়াটি যাচাই করা হবে। আজ কোনো সিদ্ধান্ত হবে না। এখন বিএনপির শীর্ষ নেতা ও বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা টিমের সদস্যরা সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।

একটি সূত্র বলছে, আবেদনে উল্লেখ করা মানবিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাতে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়ার চেষ্টা করছে। খালেদা জিয়ার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৯ সালে এবং এরপর আর এটি নবায়ন করা হয়নি। এখন দু’দিন আগে তার পক্ষে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ পাসপোর্ট নবায়নের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশে এখন নাগরিকদের ই-পাসপোর্ট দেয়া হয়। পুরনো পদ্ধতির মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দেয়া এখন একেবারে সীমিত করে আনা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা বলছেন।

বিএনপির একজন নেতা জানান, ই-পাসপোর্ট করানোর জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট, চোখের স্ক্যান এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর সরবরাহ করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু খালেদা জিয়া এখন হাসপাতালে থাকায় তার পক্ষ এগুলো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তার ক্ষেত্রে এসব শর্ত শিথিল করে কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়াকে পুরনো ধরনের মেশিন রিডেবল পাসপোর্টই নবায়ন করে দিচ্ছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে বলে তার পরিবারকে জানানো হয়েছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার ভিসার আবেদন বিবেচনা করবে যুক্তরাজ্য। যদিও প্রক্রিয়াগত কারণে ভিসা পেতে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। বর্তমানে ভিসা প্রক্রিয়া করার প্রতিষ্ঠান ভিএফএস বন্ধ আছে। কাল রবিবার কিংবা সোমবার ভিএফএস কেন্দ্র খোলা হবে। তারপর ভিসা প্রক্রিয়া হতে পারে।

ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো ইন্ডিভিজুয়াল কেসের ক্ষেত্রে আমরা মন্তব্য করি না। যদি খালেদা জিয়া ভিসার জন্য আবেদন করে থাকেন তাহলে সেই বিষয়টি যুক্তরাজ্য সরকার বিবেচনা করে দেখবে।

এদিকে ভিএসএফের কার্যক্রম চালু করা সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেছেন, ভিএফএস গ্লোবাল (বাংলাদেশ) লিমিটেডের কার্যক্রমকে জরুরি পরিষেবা হিসেবে বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনপূর্বক অনতিবিলম্বে চালু রাখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আগামীকাল রবিবার বা সোমবার এ সংস্থা কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অপরদিকে খালেদার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতির বাইরেও বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তার পরিবারের একজন সদস্য জানিয়েছেন, একদিকে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের যাওয়ার ব্যাপারে নানা বিধিনিষেধ আছে, অন্যদিকে বর্তমান শারীরিক অবস্থায় খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে বিমানে যেতে পারবেন কিনা- সে ব্যাপারে চিকিৎসকরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। যদিও তার চিকিৎসক তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, নানামুখী সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তারা এমন প্রস্তুতি নিচ্ছেন যাতে বাংলাদেশ সরকার অনুমতি দেয়ার ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়া যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি পাওয়ার বিষয়টিতে তার পরিবার এবং দল অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকার বিষয়টি ইতিবাচক এবং মানবিক দৃষ্টিতে দেখার কথা বললেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত লিখিত অনুমতি দেয়নি।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার পরিবার তাকে প্রথম লন্ডনে নিতে আগ্রহী। তার পরিবারের একজন সদস্য জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে নেয়ার বিষয়ে সেখানে আলোচনা চালাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের বিশ্ব-পরিস্থিতিতে এই মুহূর্তে লন্ডনের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। চিকিৎসার জন্য সেখানে খালেদা জিয়াকে নিতে হলে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া, তার ভ্রমণ সংক্রান্ত বিষয়েও কিছু প্রক্রিয়া এখনো বাকি। ফলে সরকারিভাবে অনুমতি পাওয়ার পরই এ কাজগুলো সম্পন্ন হবে।

লন্ডনের বিকল্প হিসাবে সিঙ্গাপুরে নেয়ার বিষয়ও পরিবারের চিন্তায় রয়েছে। তবে এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ থেকে যাত্রী যাওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এখন সৌদি আরব অথবা খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য সুবিধাজনক কোনো দেশ হতে পারে, তেমন বিকল্প দেশের কথাও এখন তার পরিবার এবং দলের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

তবে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন- এমন ব্যক্তির সৌদি আরবে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ মানার নিয়ম রয়েছে। ঢাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্য এবং সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ফরেন রিলেশন্স কমিটির অন্যতম সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার এখনো পারমিশন দেয়নি। সরকার পারমিশন দেয়ার পরই আমাদের যা যা করণীয় তা করতে পারব। হাইকমিশনে যাওয়া, যে দেশে যাবেন, সে দেশে যোগাযোগ করা ইত্যাদি কার্যক্রম আমরা শুরু করতে পারব। তবে আগে সরকারের পারমিশন লাগবে। এটার ওপর সবকিছু ডিপেন্ডস করছে।


poisha bazar

ads
ads