আ.লীগ নেতাদের ঘর-বাড়ি টার্গেটই ছিল হেফাজতের


poisha bazar

  • সাইফুল ইসলাম
  • ০৮ এপ্রিল ২০২১, ০৭:২০

আমরা ঘরে ছিলাম। হঠাৎ করেই ‘আল্লাহ হু আকবার’ বলেই প্রাইভেটকারটিতে পিটাতে থাকে। একজন নয়, বেশ কয়েকজনই একই কায়দায় গাড়িটির গ্লাসটা ভাঙ্গে। টিনের উপর জোরে জোরে পিটাতে থাকে। আমরা কিছু বুঝে উঠার আগে ঘরটির উপরে তাণ্ডব চালায় হেফাজতের লোকজন- এমনই ভাবে কান্নাকণ্ঠে আওয়ামী লীগের নেতাদের সামনে বলতে দেখা গেছে সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নুর স্ত্রীকে।

গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হক ও তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী আটক হয়। পরে হেফাজতের নেতাকর্মীরা মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বাড়ি ঘরে হামলা ভাঙচুর চালায়। সেই হামলায় নিজের চোখের সামনেই বারবার ভেসে আসছে বলেও জানান তিনি।

কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন রফিকুল ইসলাম নান্নু। হাতে মাস্ক থাকলেও এক কেন্দ্রীয় নেতার ইঙ্গিতে মুখে মাস্ক দেন নান্নু। কেন্দ্রীয় নেতারা জানতে চাইলে কান্না করে বলেন, ‘আমার বাড়িতে এসেই আমাকে খুঁজে। আমার প্রাইভেটকারে ভাঙচুর করে। আমি ঘরে অবস্থান না করলে আমাকেও মেরে ফেলত। চিৎকার করে বলতে থাকে, তাকে মারলেই যুবলীগ শেষ’। নান্নুর বাড়ির সামনের একটি দোকানে ভাঙচুর করেন হেফাজতের নেতারা। আওয়ামী লীগের নেতারা সেটাও পরিদর্শন করেন।

সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর করেন হেফাজতের কর্মীরা। এর প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দোকানের ভেতরে ছিলাম। দক্ষিণ দিক থেকে একটি মিছিল এসে প্রথমে আওয়ামী লীগের অফিসে হামলা চালায়। দরজা ভেঙে ভেতরে ডুকে। অবস্থান ভয়াবহ দেখে আমরা দোকানের সার্টার বন্ধ করে দেই। হেফাজতের কর্মীরা যাওয়ার সময় মনে হয় আমাদের দোকানের সার্টারের কয়েকটা পিটা দেয়। আমরা যারা এখানে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এখনো ভয়ে ভয়ে দিন পার করছি। কখন যে আবার হামলা করে কেউ বলতে পারে না।’

এরআগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের নেতৃত্বে ঢাকার অতি কাছে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় যান। সেখানে তারা হেফাজতের তাণ্ডব স্থল ও রিসোর্ট পরিদর্শন করেন। নেতাদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, মুক্তিযোদ্ধা বিযয়ক সম্পাদক মৃনাল কান্তি দাস এমপি, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কার্যনিবাহী সদস্য আনোয়ার হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এ এইচ মাসুদ দুলাল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

এ সময় কেন্দ্রীয় নেতাদের শুভেচ্ছা জানাতে কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় অবস্থান করতে দেখা গেছে। তারা নেতাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ আগত নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ধর্মের নামে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত, সারাদেশে জ্বালাও পোড়াও ভাঙচুর করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। এখন থেকে আওয়ামী লীগের প্রত্যকটি নেতাকর্মী নির্দেশ দিচ্ছি সরকারের পাশে থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে হবে। হেফাজতের হামলার শিকার হয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা প্রত্যককে সুনির্দিষ্টভাবে মামলা করুন। আমাদের উপর যে আঘাত করা হয়েছে, এই আঘাতের প্রতিঘাত করা হবে।

তিনি বলেন, আঘাত এসেছে, সময় হয়েছে প্রতিঘাত করার, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ধর্মের নামে হেফাজত অধর্মের কাজ করছে, রিসোর্টে নারী নিয়ে ধরা পড়েছে হেফাজতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হক। তাকে রিসোর্ট থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীরা যে ভাবে আওয়ামী লীগ অফিস, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানাই।

মাহবুবুল আলম হানিফ এমপি ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের মামলা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, হেফাজত বিএনপি জামায়াতের যেসব সন্ত্রাসী এসব ভাঙচুর জ্বালাও পোড়াও করেছে তাদের সুনির্দিষ্ট নাম ঠিকানা সংগ্রহ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবারের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে নিয়ে আসামি করুন।

তিনি বলেন, যেসব ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মের নামে দেশে অরাজক পরিস্থিত সৃষ্টি করেছে তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করব। ধর্মের নাম করে অধর্মের কাজ করছে। এসব ব্যবসায়ীদের হাত থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা করা মানে সকল নেতাকর্মীর বাড়িঘরে হামলা করা, যারা এই কাজ করেছে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে এই করোনাকালীন সময় মাস্ক পরে মানুষকে সহায়তা করুন।

এরপর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা হেফাজতের হামলা ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা প্রধান কার্যালয়, সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নূর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি, তার শ্বশুরবাড়ি, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি শাহ মো. সোহাগ রনির বাড়ি পরিদর্শন করেন।

হেফাজতের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থল পরিদর্শন ও আহত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার শেষে সোনারগাঁও চৌরাস্তায় একটি স্থানীয় হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। সেখানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বক্তব্য রাখেন।

সেখানে হানিফ বলেন, হেফাজত মুত্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছে। তারা জাতির পিতাকে অশ্রদ্ধা করেছে। বিএনপি ও জামায়াত ধর্ম ব্যবসায়ীকে হেফাজতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। তাদের তাণ্ডবের নিন্দা জানাই। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের আশস্ত করে বলাতে চাই, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের দলীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, যারা ধর্ম ব্যবসায়ীর সাথে জড়িত, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সোনারগাঁয়ে হামলার সাথে জড়িত প্রত্যকের নাম ঠিকানা বের করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। যারা এখনো মামলা দায়ের করেননি, তারা মামলা করবেন। আইনের ভিত্তিতে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য দূর করব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, কে কোন দল করলেন সেটা বিষয় না। যারা হামলা করেছে তারা নাশকতার সঙ্গে জড়িত। তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেই দাবি জানাব।

সংবাদ সম্মেলনে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ওরা যখন ধানবীয় অপকর্ম শুরু করেছে, মানুষকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া, রেললাইনে আগুন দেয়া, থানায় আক্রমণ করা, সরকারি গণগ্রন্থকার পুড়িয়ে দেয়া, ভ‚মি অফিস পুড়িয়ে ফেলা ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে ফেলাসহ এই অপকর্ম করে যখন উম্মাদ হয়ে যায়। তাদের শুধু টাগের্ট করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপরে। তারা মূলত বাংলাদেশ বিরোধী। এই অপশক্তি অপকর্মের পরে রিসোর্টে এসে আরাম আয়েশের জন্য তামাশা করতে এসেছে। এদের বিরোধে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সকলে সম্মিলিতভাবে এদেরকে প্রতিহিত করতে হবে। আমরা কোনোক্রমেই এই অপশক্তির হাতে আমার প্রিয় বাংলাদেশকে ছাড়ব না।

তিনি বলেন, ’৭১ স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের হায়নাদার বাহিনী যেভাবে এদেশের মানুষের উপরে, যান-মাল, সম্পত্তি, সরকারি সম্পত্তি, নারী, পুরুষ ও শিশু যেমন কাউকে বাদ দেয়নি, এরাও একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এরা দেশবিরোধী, এরা পাকিস্তানি আইএস আরের এজেন্ট।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত, সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সামসুল ইসলাম ভূঁইয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম, সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম, যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নুসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

 






ads
ads