নৌকার পক্ষে নেই অনেক এমপি!


  • সাইফুল ইসলাম
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৫

কেন্দ্রের কঠোর হুঁশিয়ারি সত্তে¡ও স্থানীয় সরকারের কয়েকটি নির্বাচনে বিদ্রোহীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক এমপির বিরুদ্ধে। স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে কোনো কোনো এমপির এমন কর্মকাণ্ডে নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা হারতে পারেন- এমন আশঙ্কা করছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা। এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অভিযোগ আরো গুরুতর।

তাদের দাবি, নির্বাচনে নৌকার প্রতীকের প্রার্থীকে হারাতে ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন ক্ষমতাসীন দলের ওইসব সংসদ সদস্য। এমন অভিযোগ করেছেন নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আমজাদ হোসেন বাচ্চুসহ আরো অনেক প্রার্থী।

আমজাদ হোসেন বাচ্চু স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের দলের এমপি আমার জন্য কাজ তো করছেন না বরং তার অনুসারীরাও কাজ করেন না। তার সব লোক স্বতন্ত্র প্রার্থী (মোবাইল প্রতীকের) জন্য কাজ করছেন।’

আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ৫ম দফা পৌরসভা নির্বাচন হবে। একই দিন বেশ কয়েকটি উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি নিজেদের অনুক‚লে নিতে হিসাব-নিকাশ করে প্রার্থীদের সমর্থন দেয় স্থানীয় এমপিরা। প্রকাশ্যে না দিলেও স্থানীয় এমপির সমর্থন কোন প্রার্থীর পক্ষে যাচ্ছে তা অনেকটাই আঁচ করা যায় বলে দাবি করেছেন তৃণমূল নেতারা।

জানা যায়, নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন আশরাফ হোসেন সরকার। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে তার বদলে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে আমজাদ হোসেন বাচ্চুকে। তিনি নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অন্যদিকে আশরাফ হোসেন সরকার নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মতিন সরকারের ছোট ভাই ও শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি। তিনি নরসিংদীর সাবেক পৌর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি।

এদিকে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হচ্ছেন আবুল কালাম আজাদ। একই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন এ এফ এম তারেক। তিনি সাত বছর আগে এই উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ছিলেন। এ এফ এম তারেক কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের আওয়ামী লীগের এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের চাচা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুন্সীর ছোট ভাই।

২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এ এফ এম তারেক দোয়াত-কলম প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০১৯ সালে দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জয়নুল আবেদীন। গত ৩ ডিসেম্বর তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে ওই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়। শূন্য ওই পদে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে। এই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির প্রার্থী চাচা এ এফ এম তারেকের পক্ষে স্থানীয় এমপি মোহাম্মদ ফখরুলে বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, ‘স্থানীয় এমপি নৌকা ডুবাতে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ভয়ভীতি ও প্রলোভন দিয়ে আমার পক্ষে কাজ করা থেকে বিরত রেখেছে। আমার প্রশ্ন, নৌকার এমপি হয়ে কিভাবে নৌকার বিরোধিতা করেন? ভোটের দিন এমপি প্রভাব না খাটালে মানুষ ভোট কেন্দ্রে আসতে পারলে আমি বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ।’

মাদারীপুর সদর পৌরসভায় মনোনয়ন পাওয়ার কথা ছিল স্থানীয় এমপির ভাইয়ের। কিন্তু তা না পাওয়ায় তিনি নৌকার বিপক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নৌকার প্রার্থী খালিদ হোসেন ইয়াদ সংসদ সদস্যকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে বলেন, ‘স্থানীয় এমপির সমর্থকদের ভূমিকা রহস্যজনক।’

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা নির্বাচেনও নৌকার প্রার্থী শাহিদুল ইসলাম শহিদের পক্ষে স্থানীয় এক এমপির ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে এ পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীকে কোনো নির্দেশনা না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। হবিগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা যুব লীগের সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন হবিগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য যিনি মন্ত্রিসভায় রয়েছেন, তিনি ওই বিদ্রোহীকে মদদ দিচ্ছেন।

যশোরের কেশবপুর পৌরসভায় নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন রফিকুল ইসলাম। তবে স্থানীয় এক এমপির অনুসারীদের ওই প্রার্থীর পক্ষে মাঠে দেখা না যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘যারা দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন এবং এখনো মাঠে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্পষ্ট। বিদ্রোহীদের যারা মদদ অথবা উসকানি দিচ্ছেন তাদেরও একই শাস্তি পেতে হবে।’

ওবায়দুল কাদের এসব বিদ্রোহী ও উসকানিদাতাকে অনতিবিলম্ব সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘না হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত না মেনে যারা পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, তারা চরম বেয়াদব। বেয়াদব সন্তানদের যেমন কেউ পছন্দ করেন না, তেমনি আওয়ামী লীগও বেয়াদবদের পছন্দ করে না। আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত যারা বরখেলাপ করেছেন, তারা আর কখনো নৌকার মনোনয়ন পাবেন না। তারা আওয়ামী লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হবেন।’

 



poisha bazar

ads
ads