হার্ডলাইনে আ.লীগ, আগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছাড় নয়


poisha bazar

  • সাইফুল ইসলাম
  • ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:২১

দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর থাকলেও কখনো সরাসরি শাস্তি দেয়নি আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ দেখা দিলেও সব সময় পার পেয়ে যায় বিদ্রোহীরা। তবে এবার আর নয়। আসন্ন পৌরসভা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের বিষয়ে ছিল কঠোর। বিদ্রোহীরা মনোনয়ন পেলেও পরে আবার প্রত্যাহার করে অন্যকে মনোনয়ন দিতে দেখা গেছে। এই শাস্তি তৃণমূলে আস্থা বেড়েছে। তবে এখনো আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অর্ধশতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে।

প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হবে ২৫ পৌরসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে ১০৫ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ২৫ জনকে চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত গত শনিবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের এক সভায় হয়। ওই সভার সভাপতিত্ব করেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। সভায় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে একটি পৌরসভার মেয়র বেশ জনপ্রিয় বলে আলোচনা ওঠে। তিনি গতবার নৌকার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। কিন্তু মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক সদস্য বলেন, বিদ্রোহীদের ছাড় দিলে দলে শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। নৌকার বিরোধিতাকারী যতই জনপ্রিয় হোন না কেন, তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে না।

সভায় বিদ্রোহীদের নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা করা হয়। বিদ্রোহীরা যেন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে না পারেন সেই দিকে নজর রাখার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন দলের সভাপতি। বহু আলাপ-আলোচনার পর ওই সভায় ২৫ প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করা হয়। যদিও তাদের মধ্যে তিনজন বিদ্রোহী মনোনয়ন পেয়েছিলেন। মনোনয়ন দেয়া পরে কেন্দ্রের মধ্যে অভিযোগ আসলে সাথে সাথে তিনটি পৌরসভার প্রার্থী পরিবর্তন করেন রাজনৈতিক দলটি। মনোনয়ন দেয়ার পর বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর প্রার্থী পরিবর্তন করাকে বিদ্রোহীদের জন্য ‘কঠোর বার্তা’ বললেন কেন্দ্রীয় নেতারা। আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক সায়েম খান বলেন, ২৫টি পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তিনজনকে পরিবর্তন করা হয়েছে।

দলীয় সূত্র মতে, চূয়াডাঙ্গা সদর পৌরসভায় মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দারের ভাই রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দারকে। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও। এর মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে অভিযোগ আসে, তিনি গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন না করে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তবে তিনি হেরেছিলেন। কিন্তু হারলেও বিদ্রোহী হওয়ার অপরাধে তাকে বাদ দিয়ে গত সোমবার নতুন করে জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনি পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। একইভাবে মনোনয়ন বদল করা হয়েছে নেত্রকোনো জেলার মদন পৌরসভার মেয়র প্রার্থীকে।

সোমবার সকালে আবদুল হান্নান তালুকদার শামীমকে বাদ দিয়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আবদুল হান্নান তালুকদার গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়ে মেয়র হয়েছিলেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার খবর কেন্দ্রে পৌঁছালে তাকেও পরিবর্তন করে যুবলীগ নেতা সাইফকে মনোনয়ন দেয়া হয়। মনোনয়ন পরিবর্তন করা হয়েছে কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভায়ও। শুরুতে আল মাছুম মুর্শেদকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। তাকে বাদ দিয়ে এখন দলের প্রার্থী করা হয়েছে বর্তমান মেয়র তারিকুল ইসলামকে। আল মাছুম মুর্শেদ দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অমান্য করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন।

জানা যায়, গত নির্বাচনের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কারণে তিনজনকে পরিবর্তন করার পরও এখন ২৫ পৌরসভায় নির্বাচনে অর্ধশতাধিক প্রার্থী বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন। তাদের মধ্যে পাবনার চাটমোহর পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন সাখাকে চ্যালেঞ্জ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান মেয়র উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মির্জা রেজাউল করিম দুলাল। রাজশাহীর পুঠিয়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল রবি। রবিকে ঠেকাতে দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

তারা হলেন- যুবলীগের নেতা গোলাম আজম নয়ন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম টিটু। কাটাখালী পৌরসভায় স্বস্তিতে নেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্বাস আলী। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দুজন। তারা হলেন- পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সামা, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মোতালেব। চুয়াডাঙ্গা পৌর নির্বাচনে প্রথমে মনোনয়ন পান এমপি সোলায়মান জোয়াদ্দারের ভাই রিয়াজুল কবির জোয়াদ্দার।

পরে প্রার্থী পরিবর্তন করে মনোনয়ন দেয়া হয় জাহাঙ্গীর আলম মালিককে। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শরীফ হোসেন। কুড়িগ্রাম পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মো. কাজিউল ইসলাম। দলের প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিদ্রোহী হয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান সাজু। বরগুনার বেতাগী পৌরসভায় নৌকার প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র এবিএম গোলাম কবির। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহামুদুল হাসান মহসিন। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিশ্বজিৎ রায়। তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান মেয়র খালেক মিয়া।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মানবকণ্ঠকে বলেন, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনসহ সব নির্বাচনের জন্য এটা একটা ফলপ্রসূ নির্বাচনী সিদ্ধান্ত। যারা নৌকার বিরোধিতা করেছে তাদের নৌকা দেয়া হবে না। নৌকার বিরোধী করে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করা তিনজনকেই মনোনীত করে পরে বাদ দেয়া হয়েছে। এটা একটা বার্তা। নৌকার বিরোধিতা অতীতে যারা করেছে তারা ভবিষ্যতের জন্য সংশোধন হয়ে যাবে। যে কোনো নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করলেই তাকেই আর নৌকা দেয়া হবে না ।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, দলীয় প্রার্থী পরিবর্তন তৃণমূলের জন্য একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী না হয়। দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্তা থাকে, বিশ্বাস থাকে, অবিচল থাকে। এটাই হচ্ছে বার্তা।

 






ads