‘শীর্ষ পদ’ চাওয়ায় পুড়ল কপাল


poisha bazar

  • সাইফুল ইসলাম
  • ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৫২

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ‘শীর্ষ পদ’ চাওয়া অধিকাংশ নেতার অবশেষে উল্টো কপাল পুড়েছে। শীর্ষ পদ দাবি করে বিপদে পড়েছেন তারা। কারণ নতুন কমিটির কোথাও রাখা হয়নি তাদের।

বিশেষ করে সংগঠনের চেয়ারম্যান, সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে সম্মেলনের আগে যারা আলোচনায় ছিলেন তাদের বাদ রেখেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপকভাবে গ্রুপিং শুরু হয়েছে। যারা পদ পাননি তাদের বক্তব্য হচ্ছে কোনো নেতা সংগঠনের সহ-সভাপতি কিংবা যুগ্ম সম্পাদক থাকলে তারা পরবর্তীতে সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদের চাইতেই পারেন। এই চাওয়ার মধ্যে কোনো অনৈতিক কিছু নেই। তাদের মন্তব্য হচ্ছে, শীর্ষ পদ চাওয়ার কারণেই কপাল পুড়েছে শীর্ষস্থানীয় এই নেতাদের।

সূত্র জানায়, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের শেষ দুই মাসে। ২ নভেম্বর কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ২৩ নভেম্বর যুবলীগের কাউন্সিল এবং ২৯ নভেম্বর আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংগঠনগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং যুবলীগের চেয়ারম্যান পদের নাম ঘোষণা করা হয়। নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণার আগে কিন্তু সংগঠনগুলোর সিনিয়র, অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতারা শীর্ষ পদের জন্য আশা করেছেন। অনেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। বরং যারা তদবির করেছেন কিংবা বড় পদ পাওয়ার জন্য লবিং-তদবির করেছেন, কমিটির কোনো পদে তাদের রাখা হয়নি।

তবে তাদের মধ্য থেকে কারো কারো আশা পূরণ হয়েছে। আবার কারো আশা এখনো পূরণ হয়নি। শীর্ষ পদ না পেলেও সেই সময়ে আলোচনায় থাকা নেতারা অপেক্ষায় ছিলেন কমপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হবে তাদের। কিন্তু সম্প্রতি যে কমিটি দেয়া হয়েছে সেখানে তাদের কোনো পদ দেয়া হয়নি।

গত অক্টোবর থেকে চলতি নভেম্বর মাসে বেশ কয়েকটি সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে ‘শীর্ষ পদ’ চাওয়া অনেককে রাখা হয়নি। তবে এখনো অনেক সংগঠনের কিছু ‘পদ’ শূন্য রয়েছে। সেসব শূন্য পদে এসব আলোচিত ও যোগ্য নেতাদের রাখা হবে কি না সেই অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ পদ চাওয়া এক নেতা বলেন, ‘আমি সংগঠনের সহ-সভাপতি ছিলাম। আমি তো সংগঠনের সভাপতি কিংবা চেয়ারম্যান পদ চাইতেই পারি। দেয়া, না-দেয়া তো নেত্রীর (শেখ হাসিনা) বিষয়। সংগঠনের শীর্ষ পদে তো দুজন জায়গা পাবেন। বাকিদের তো সংগঠনের কোথাও না কোথাও রাখা হবে। কিন্তু এবার তা করা হয়নি। তাহলে এত বছরের রাজনীতি কী এখানেই শেষ? নাকি শূন্য পদের দিকে চেয়ে থাকব-বুঝতে পারছি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনে অনেক নেতাকে দেখিনি। তারাও এখন বড় নেতা।’

যুবলীগ: বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে স্বাধীনতার সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনির হাতে গড়া সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ২৩ নভেম্বর। ওই দিন বেলা ১১টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলন উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেই সময় যুবলীগের একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য শীর্ষ দুই পদের একটি পেতে তদবির চালিয়ে গেছেন। অনেকেই আবার শীর্ষ পদের জন্য আলোচনায়ও ছিলেন। তবে যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়েই সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করা হয়।

এ ছাড়া সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক হন প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলাম। কংগ্রেসের দ্বিতীয় পর্বে যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম ঘোষণা করা হয়। সেই কমিটির প্রায় ১১ মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় গত ১৪ নভেম্বর।

সেখানে রাখা হয়নি গত কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুস সাত্তার মাসুদ, মো. ফারুক হোসেন, আতাউর রহমান আতা, অ্যাডভোকেট বেলাল হোসাইন, ইঞ্জিনিয়ার নিখিল গুহ; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হাসান তুহিনকে। এ ছাড়া জায়গা পাননি সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলামও। অথচ তারাই সেই সময় শীর্ষ পদের জন্য বেশ আলোচনায় ছিলেন। এখন পদ না পেয়েও আলোচনায় রয়েছেন তারা।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ: বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত বছরের ১৬ নভেম্বর। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর দ্বিতীয় অধিবেশন বেলা ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতি নির্মল চন্দ্র গুহ ও সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবুর নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাদের নাম ঘোষণার আগেও এই দুটি শীর্ষ পদে বসতে চেয়েছিলেন অনেকেই। আলোচনায় এগিয়ে ছিলেন সংগঠনটির অনেক সিনিয়র নেতা। অথচ তাদের অনেকেই কমিটিতে জায়গা পাননি।

সভাপতি পদের জন্য দৌড়ে ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি মতিউর রহমান মতি, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মঈন উদ্দিন মহিন, এক-এগারোর সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সোহেল রানা টিপু প্রমুখ। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে ছিলেন সহ-সভাপতি গোলাম সরওয়ার মামুন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ শাকিব বাদশা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন, পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক আবুল ফজল রাজু প্রমুখ। তারা সংগঠনের শীর্ষ পদ চেয়েছিলেন। গত ১৯ অক্টোবর ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। সেই কমিটিতে শীর্ষ পদ চাওয়া অনেককেই রাখা হয়নি।

মৎস্যজীবী লীগ: গত বছরের ২৯ নভেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মৎস্যজীবী লীগের সম্মেলন। এই সম্মেলনের মধ্যদিয়ে মৎস্যজীবী লীগ স্বীকৃতি পায় আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের তালিকায়।

সম্মেলনে বীর মুক্তিযোদ্ধা সায়ীদুর রহমানকে সভাপতি এবং শেখ আজগর নস্করকে সাধারণ সম্পাদক করে মৎস্যজীবী লীগের দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তাদের নাম ঘোষণার আগেও সংগঠনটির সভাপতির দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন নারায়ণ চন্দ্র, অ্যাড. হারুণ-অর-রশিদ।

আর সাধারণ সম্পাদকের দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন সহ-সভাপতি খন্দকার আজিজুল হক হীরা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেদওয়ান খান বোরহান। গত ১৯ অক্টোবর ১১১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সেই কমিটিতে স্থান পাননি সম্মেলনের আগে আলোচনায় আসা নেতারাই।






ads