ত্যাগীদের থেকে দূরে এমপিরা


poisha bazar

  • সাইফুল ইসলাম হাফিজ
  • ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১৭:১২

সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূলে বাড়ছে দূরত্ব। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

দলীয় কমিটি গঠনে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে দলের হাইব্রিড ও কাছের লোকদের পদে ভূষিত এবং বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে সহযোগিতা করায় স্থানীয় নেতা ও এমপিদের সঙ্গে তৃণমূলের বিরোধ বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিরোধেই তৃণমূলে প্রকাশ্যে দেখা দিয়েছে এমপি গ্রুপ বনাম অ্যান্টি এমপি গ্রুপ। গত এগারো বছরের অধিক সময় ক্ষমতা থাকলেও ত্যাগীদের সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মাঝেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে বলে দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেও মূল্যায়িত না হওয়া, কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী-হাইব্রিডদের কারণে ত্যাগীদের কোণঠাসা করা, নেতা-কর্মীদের অপকর্মের কারণে দলের বদনাম হওয়া, স্থানীয় পর্যায়ে এমপি লীগ, ভাইলীগ তৈরি হওয়ায় প্রতিনিয়ত দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ বাড়ছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়া ও প্রশাসন নির্ভরতার কারণে চিন্তিত দলের হাই-কমান্ড ও শুভাকাঙ্ক্ষী মহল। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দফতর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতর, দুদকে তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগের স্তূপ জমা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক নেতার বিরুদ্ধে অন্য নেতার মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনও হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান সমাধান নেই, বরং দলের বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করা ব্যক্তিদের সাধারণ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এছাড়া তৃণমূলে দলীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখছেন দলীয় সংসদ সদস্যরা। তবে কেউ কেউ দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ না নিলেও নেতাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছেন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। কয়েকজন সংবাদ সম্মেলনও করেছেন।

এদিকে ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বললেন, ‘ভাই! আর পারি না। নয় বছর দলের নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে এমপি সাহেব ব্যস্ত নিজের স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে। একজনকে বানিয়েছেন মেয়র, আরেকজনকে দিয়েছেন দলের দেখভালের দায়িত্ব। এখানে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা মূল্যহীন।’

এ অবস্থা শুধু ঢাকার পার্শ্ববর্তী উপজেলায় নয়, দেশের শতাধিক আসন-এলাকায়ও একই চিত্র। কর্মীদের মূল্যায়ন নেই। আত্মীয়করণ আর ব্যক্তিকরণ নিয়েই ব্যস্ত এমপিরা। দলের নেতা-কর্মীদের পরিবর্তনে নবাগতদের প্রাধান্য সব ক্ষেত্রে। ফলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এমপিদের দূরত্ব বাড়ছে।

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহর বিরোধ লেগেই আছে। এই দুই নেতার পক্ষে-বিপক্ষের সমর্থকের মধ্যে বিভিন্ন সময় হামলা, মামলা ও বিরোধের ঘটনাও ঘটেছে। এই দুই নেতা আওয়ামী লীগ করলেও তাদের মধ্যে বিভিন্ন নির্বাচনের সময় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। এ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে একজন জনসভা ডাক দিলে আরেকজনও জনসভার ডাক দেন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা ও ইউনিয়ন নির্বাচন আসলেই তাদের সমর্থকদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ এক গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে বলেন, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান চৌধুরী নিক্সন শুধু প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই নন, আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীদেরও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন।

অন্যদিকে বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু তার আসনের নেতাদের সাথে ভালো সর্ম্পক নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন যাতে না দেয় তা নিয়েও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। এমনকি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সংসদ ভবনের বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে এই আহ্বান জানিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুই মনোনয়ন পেয়েছেন। এই আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে গ্রুপিং রাজনীতি বন্ধ হবে না বলে তৃণমূল নেতারা জানান।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলা কমিটি গঠন নিয়েও নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। বিশেষ করে নোয়াখালী জেলা কমিটিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের পদ দেয়ায় আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বিরাজ করছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরীকে প্রস্তাবিত কমিটিতে যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক পদ দেয়ায় ব্যাপকভাব সমালোচনা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র শহীদউল্লাহ খান সোহেল বলেন, প্রস্তাবিত কমিটিতে এক সময় জামায়াত থাকলেও পরে বিএনপিতে চলে গেছে। এখন আবার সেই লোকজন জেলা কমিটিতে স্থান পেয়েছে। গত কমিটির সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক— এমনকি সম্পাদকমণ্ডলীর দায়িত্ব পালন করেছে এমন অনেক ত্যাগী নেতাকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘গত এগারো বছর দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় অনেক জায়গায় বিশেষ বলয় সৃষ্টি হয়েছে। সভানেত্রী এ বলয় ভেঙে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

 






ads