শাস্তির হুমকি উপেক্ষা করে আ.লীগে বিদ্রোহীর ছড়াছড়ি


poisha bazar

  • সাইফুল ইসলাম
  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৩:২৭

আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৫৮টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন। দলীয় প্রতীক নৌকার প্রার্থীর পাশাপাশি দলের ভেতর থেকেই অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এ নিয়ে অস্বস্তিতে আছে আওয়ামী লীগ। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাদের স্থায়ী বহিষ্কারসহ কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। তবে সেই হুমকিকে আমলে না নিয়ে পুরোদমে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিদ্রোহীরা। আর তাদের পালে হাওয়া দিচ্ছে দলের ভেতরকারই বড় একটি অংশ। ফলে ‘ঘরের শত্রæ বিভীষণ’দের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন দলীয় প্রার্থীরা। এক-দুজন নয়, এই সংখ্যা শতাধিক বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করছেন স্থানীয় অনেক নেতা। তাদের পেছনে থেকে গোপনে সমর্থন দিচ্ছেন অনেক সংসদ সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় প্রার্থী যদি স্থানীয় এমপির পছন্দের কেউ না হন, সে ক্ষেত্রে তার বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে এক এমনকি একাধিক প্রার্থীও।

রংপুর বিভাগের রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর ইউপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতীকে নির্বাচন করছেন মো. একরামুল হক। সেই ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মো. ইকবাল, শাহীনুর রহমান, আবুল হোসেন ও মফিজুল ইসলাম। একই উপজেলার চন্দনপাট ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. আমিনুর রহমানের প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষ্ণরঞ্জন বর্ম। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই উপজেলার সদ্যপুষ্কুরিনী ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মো. মকছেদুর রহমান। তার বিপক্ষে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সোহেল রানা।

রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার মথুরাপুর ইউপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মো. মাসুদ রানা। সেখানে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করছেন একই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মো. হেলাল উদ্দিন। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পোরজানা ইউপির নির্বাচনে মো. আনোয়ার হোসেন দলীয় মনোনয়ন পেলেও সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছাড়াছড়ি। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ করেছেন তাদের মধ্য থেকেও বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা রফিকুল ইসলাম রওশন (অটোরিকশা), রফিকুল ইসলাম শাহীন (ঘোড়া), আবুল কালাম (টেলিফোন), মাসুদ রানা (মোটরসাইকেল) ও নবী মণ্ডল (আনারস) নির্বাচন করছেন। তারা সবাই আওয়ামী লীগ নেতা। এক কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থানীয় এমপির রেষারেষিতে এখানে এত প্রার্থী বলে জানা গেছে।

খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর উপজেলার গড়াইটুপি ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোহা. শফিকুর রহমান। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা আ. মতিন আনারস প্রতীকে নির্বাচন করছেন। আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাউকি ইউপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মো. তরিকুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হোসেন (আনারস প্রতীক)।

বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার ফরাজগঞ্জ ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন মো. ফরহাদ হোসেন (মুরাদ)। সেখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজ এবং ফরহাদ হোসেন নাঈম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়া পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক মো. কামাল হোসেন রিপন নির্বাচন করছেন। তাকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ। সেই ইউপিতে আওয়ামী লীগ নেতা মারুফ হোসেন এবং আবুল হোসেন সরকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরি ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন মোহাম্মদ অলিউল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচন করছেন সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজ মোরল (চশমা), উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান (আনারস)। তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউপিতে বিদ্রোহী হিসেবে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া নেতা গোলাম কিবরিয়া (আনারস), আওয়ামী লীগের সমর্থক হায়দার আলী খান (চশমা) নির্বাচন করছেন। এখানে নৌকা পেয়েছেন সুখেন মজুমদার।

ময়মনসিংহ বিভাগের নান্দাইল উপজেলার শেরপুর ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন মিল্টন ভ‚ইয়া। সেখানে উপজেলা কৃষক লীগের আহ্বায়ক বজলুর রহমান (আনারস), ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিন (চশমা) এবং হারুনুর রশিদ (মোটরসাইকেল) নির্বাচন করছেন। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ধলামূলগাঁও ইউপিতে নির্বাচন করেছেন নৌকা প্রতীকে মো. আব্দুল হালিম খান। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আব্দুল আউয়াল, ওমর ফারুক, মো. আলতাব হোসেন, এনামুল হক, মো. তারা মিয়া, মাহমুদুল হাসান শিপন, মো. রেজওয়ানুর রহমান এবং হারুন রশিদ।

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউপির নির্বাচনে মো. আব্দুর রশীদ নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন। সেখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আবুল বাশার এবং উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কাউছার আহমেদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। গোপালগঞ্জ উপজেলার
লক্ষ্মীপাশা ইউপিতে বিদ্রোহী হিসেবে তৌহিদুল আহমদ এবং জেবুল আহমদ নির্বাচন করছেন। তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার চুন্টা ইউপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক পেয়েছেন শেখ মো. হাবিবুর রহমান। যুবলীগ নেতা হুমায়ুন আহমেদ (আনারস) নির্বাচন করছেন। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করছেন মাহফুজুর রহমান সেলিম। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এই ইউপি থেকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন মো. আ. করিম। ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর ইউপির নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী মো. শফিউল আজম। তার বিরুদ্ধে নির্বাচন করছেন সাবেক ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. আমান উল্লাহ। তার পক্ষে স্থানীয় নেতারাও কাজ করছেন। লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউপি নির্বানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান (মোটরসাইকেল)। সেখানে নৌকার কাণ্ডারী হিসেবে দলীয় প্রতীক পেয়েছেন এস.এম ইউনুচ। লোহাগাড়া ইউপিতে নৌকার প্রতীক পেয়েছেন মোহাম্মদ নূর’ ছফা। সেখানে স্বতন্ত্র হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা সাহাবুদ্দিন চৌধুরী (আনারস) প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া আধুনগর ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন মুহাম্মদ নুরুল কবির। সেই ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আইয়ুব মিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল হক বাবুল বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও আছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন আ. লতিফ মোল্লা। বিদ্রোহী হিসেবে সেই উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন শাহজাহান মোল্লা। তিনি শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।

এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা ভালো বিষয় না। এটি দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমি মনে করি, এই পথ পরিহার করে তারা (বিদ্রোহীরা) দলের শৃঙ্খলা মেনে দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করবেন।’

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...