পরিকল্পনাহীনভাবে চলছে বিএনপির রাজনীতি!


poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৫১

পরিকল্পনাহীনভাবে যেন চলছে বিএনপির রাজনীতি। রাজপথের আন্দোলনে নিকট অতীতে দেখা যায়নি দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের। তবে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছয় মাসের জামিন বৃদ্ধিতে দলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে সংগঠন নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে সারা দেশের বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।

অতীতের মতো বর্তমানে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপিতে আবার দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। গত দুই সপ্তাহ যাবৎ তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে যাচ্ছেন।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে যেসব নেতাকে বিশ্বাস করে দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের বেশির ভাগই রাজপথের আন্দোলন-কর্মসূচিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ফলে সংগঠনের তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেননা অতীতে যেসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে, তাতে ঘুরেফিরে চেনা মুখগুলোই দেখা গেছে।

দলের তৃণমূলের দাবি, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বেশির ভাগ প্রভাবশালী নেতাদেরই চোখে পড়েনি। ৫৯২ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির পরিচিত এবং মুষ্টিমেয় নেতাদেরই কেবল বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যায়। অনেকে আসেন দৈবক্রমে। এমতাবস্থায় খালেদা জিয়ার স্থায়ী জামিনে আগামী দিনের মুক্তি আন্দোলনে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের রাজপথে সক্রিয়ভাবে দেখতে চায় বিএনপির তৃণমূল।

তাদের ভাষ্য, পরিকল্পনাহীন বিএনপির রাজনীতির কারণে নেত্রীকে আন্দোলনের মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারেননি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে জামিন দেয় সরকার।

কেন্দ্রীয় নেতাদের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান বলেন, ‘আমরা তৃণমূলের পক্ষে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অতীতেও রাজপথে ছিলাম, এখনো আছি। দেশনেত্রীর স্থায়ী মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনে থাকব। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের তৎপরতা না থাকলে তো তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মনোবল হারিয়ে ফেলবেন। ফলে সেই নেতাদের আরো বেশি সক্রিয়ভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেয়া দরকার।’

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় কেন্দ্রীয় নেতাদের তেমন কোনো সক্রিয় তৎপরতা না থাকায় আন্দোলনে সফলতা আসেনি। আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তা হবে দলের জন্য আত্মঘাতী।’

নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘তৃণমূল সবসময়ই দলের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে কর্মসূচি সফল করেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের তৎপরতা আরো বেশি হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা যদি বড় মিছিল বা সমাবেশের অগ্রভাগে থাকেন তাহলে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা আরো উজ্জীবিত হন।’

এদিকে গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানো হয়। মুক্তির ক্ষেত্রে আগে যেসব শর্ত ছিল সেগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। নিজ বাসায় থেকে তাকে চিকিৎসা নিতে হবে। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানোয় দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

তবে স্থায়ী জামিন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি না দেয়ায় দলের নেতাদের মধ্যে হতাশাও বিরাজ করছে। দলের সিনিয়র নেতারা খালেদা জিয়ার বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার শর্ত শিথিল করারও দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে দায় সরকারকেই নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।

অপরদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছে বলা যাবে না, কার্যত তিনি গৃহ-অন্তরীণ। এখন তাকে মুক্ত করাই আমাদের এক নম্বর কাজ। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের নেত্রী, দীর্ঘকাল তিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাকে বের করে আনাটা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।’

দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নানা কারণে বেশ কিছুদিন ধরে খালেদা জিয়ার স্থায়ী জামিন ও বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন দলের নেতা-কর্মীরা। বিশেষ করে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে সরকার কিছুটা নমনীয় হবেন বলে আশা করেছিলেন তারা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগের বিষয়টিও তাদের আশাবাদী করেছিল।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, খালেদা জিয়া বিদেশে গিয়ে তার নানামুখী রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে পারেন। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিদেশিদের সঙ্গেও বৈঠক করতে পারেন বলে মনে করছেন তারা। এমন নানা হিসাব-নিকাশ কষেই খালেদাকে বিদেশে না যাওয়ার শর্ত দেয়া হয়েছে।

এদিকে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এর কয়েক মাস পর জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলের স্থায়ী কমিটির ১৯ সদস্যের মধ্যে আটটি পদই প্রকারান্তরে এখনো ফাঁকা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। তিনজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ।

মামলা জটিলতায় ভারতে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। অন্যরা সভা-সমাবেশে অংশ নিলেও মিছিলের অগ্রভাগে থাকেন না। আর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ৭৩ জন, ভাইস চেয়ারম্যান ৩৫ জন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব একজন ও যুগ্ম মহাসচিব সাতজন। বিভিন্ন বিষয়ে সম্পাদকীয় ১৬৩টি পদের মধ্যে পাঁচটি শূন্য। নতুন পুরনো মিলে নির্বাহী কমিটির সদস্য ২৯৩ জন।

বিএনপির চলমান কর্মসূচিগুলোতে এ বিশাল কমিটির অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকেই ঘুরেফিরে দেখা যায়। বাকিদের মধ্যে কিছু আসেন মাঝে মাঝে বা ঢাকায় কোনো কোনো কর্মসূচিতে তাদের কালেভদ্রে দেখা মেলে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে চলেছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মাঝে মাঝে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে রাজপথে মিছিলও করেন তিনি। এর বাইরে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, কৃষকদলের নেতাকর্মীদের মাঝে-মধ্যে রাজপথে দেখা গেলেও অংশ নেন না দায়িত্বশীল নেতারা। ফলে দলটিতে নেই চেইন অব কমান্ড।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘অতীতের রাজনীতি আর বর্তমানের রাজনীতি এক নয়। ক্ষমতাসীন অবৈধ সরকার দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে নষ্ট করে দিয়েছে। দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি নেই। অনেক তরুণ-যুবককেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুম ও পঙ্গু করেছে, মেরে ফেলেছে। আমাদের স্থায়ী কমিটির অনেকেই বয়স্ক এবং কেউ কেউ অসুস্থ। এর পরও তারা সভা-সমাবেশে অংশ নেন। যারা আছেন তারা এ বয়সে রাজপথে এসে অপমানিত হতে চান না। তরুণদের অনেকে গুম ও নিখোঁজ হওয়ার ভয়ে কর্মসূচিতে আসেন না। তার পরও চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে যেভাবে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে তা আশাব্যঞ্জক। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বেশি দিন থাকবে না। এর পরিবর্তন অবশ্যই হবে ইনশাআল্লাহ।’

অন্যদিকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, নজরুল ইসলাম খানসহ কাউকে দেখা যায় না রাজপথে। ফলে তৃণমূলের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

তারা বলছেন, কর্মী-সমর্থকরা কাঁদেন খালেদা জিয়ার জন্য আর নেতারা কাঁদেন নিজের জন্য। এ পরিস্থিতিতে কিন্তু নেত্রীর স্থায়ী জামিনের কোনো লক্ষণ নেই। আজকে দলের ভেতর যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। খালেদা জিয়া যাদের বিশ্বাস করে দায়িত্ব দিয়েছেন, চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে তাদের কোনো তৎপরতা নেই।





ads