কে হচ্ছেন হেফাজতের আমির


  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৮

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী মারা গেছেন মাত্রই এক দিন আগে। এরই মধ্যে সংগঠনের আমির কে হবেন, তা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে জল্পনা-কল্পনা। রাজধানী ঢাকা না চট্টগ্রাম থেকেই নির্বাচিত হবেন হেফাজতের আমির, তা নিয়েও সংগঠনের ভেতর চলছে বেশ আলোচনা।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতা মাওলানা মুনির হোসাইন বলেন, ইতিমধ্যে অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক ঘটনা গেছে। এখন মন্তব্য করা যাবে না। সামনে কাউন্সিল হবে, তখন কে আমিরের দায়িত্বে আসেন দেখা যাবে।

সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় যেটা ভালো হবে, সেটা দেশের জন্য সুন্দর হবে এবং সংগঠনের জন্য সুন্দর হবে। এদিকে হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) ও আল-হাইয়াতুল উল’য়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার প্রধান ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। আমৃত্যু তিনি এসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেছেন। গত শুক্রবার তার মৃত্যুর পর কওমি সংশ্লিষ্টদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই তিন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নেতৃত্বে কে আসবেন- তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

অপরদিকে হেফাজতের আমির নির্বাচন নিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতারা দ্বন্দ্বে জড়াতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। তবে আহমদ শফীর জানাজায় শরিক হতে ঢাকা থেকে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা শনিবার ভোররাতে তার মরদেহের সঙ্গে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় যান। সেখানে জানাজা ও দাফন শেষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শীর্ষ আলেমরা বৈঠক করেছেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর সঙ্গে। সেখানে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার কর্তৃত্ব ও হেফাজতের আমির নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যার আগে বিস্তর আলোচনা করেন তারা। এমনটি জানিয়েছেন জুনায়েদ বাবুনগরীর একজন বিশ্বস্ত ধর্মীয় নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে শফী সাহেবের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে অনেক নেতাই বিভিন্নভাবে হুজুরের মৃত্যুকে উপস্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শিগগিরই এসবের জট খুলবে বলে তিনি জানান।

এদিকে ঢাকা মহানগর হেফাজতের এক সিনিয়র নেতা বলেন, সহ-সভাপতিদের মধ্য থেকে যে কেউ হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। অপরদিকে হেফাজতের পরবর্তী আমিরের তালিকায় রয়েছেন হেফাজতে ইসলামের বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী, নায়েবে আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতি ওয়াক্কাস ও মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর নাম।

জানা গেছে, হেফাজতের আমির আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর সংগঠনের এক নম্বর সহ-সভাপতির ভারপ্রাপ্ত আমির হওয়ার কথা। বর্তমানে এক নম্বর সহ-সভাপতি পদে আছেন আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তিনি বয়সেও সবার বড়। তাকেই হেফাজতে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে আপাতত নেতৃত্বে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। যদি তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগ হন, তাহলে সহ-সভাপতিদের মধ্য থেকে যে কাউকেই ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। তবে আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে হেফাজতের নেতারা শিগগিরই জরুরি বৈঠক ডেকে ভারপ্রাপ্ত আমিরের বিষয়টি সুরাহা করবেন বলে জানা গেছে।

হেফাজতের এক নেতা জানান, সংগঠনের বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ছাড়াও সহ-সভাপতি ও ঢাকা মহানগর হেফাজতের সভাপতি মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীকে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা তাজুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাসের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, হেফাজত নেতাদের কোন্দল-গ্রুপিংয়ের কারণে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে জরুরি কাউন্সিলও করতে পারে সংগঠনটি। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলে সংগঠনের বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের নতুন আমির নির্বাচিত হতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

হেফাজতে ইসলামের পরবর্তী আমির কে হচ্ছেন- এ প্রশ্নে মানবকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলের মাধ্যমে আমির নিযুক্ত হবেন। একক কোনো সিদ্ধান্তে আমির নিয়োগ হবে না।’ এ সময় দেশের শীর্ষ আলেমরা তার সঙ্গে দেখা করছেন, বিজি আছেনÑবলে তিনি ফোন রেখে দেন।

জানা গেছে, আল্লামা শফীর মৃত্যুর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির দুই গ্রুপই নিজেদের শীর্ষ নেতাদের হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বে আশা করছেন। তাদের মধ্যে এক গ্রুপ আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানীর নেতৃত্বে রয়েছেন। এই গ্রুপে রয়েছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মহিউদ্দিন রুহি প্রমুখ।

অন্য গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হেফাজতের বর্তমান মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী। মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, সাবেক মন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা মামুনুল হকসহ কওমি ঘরানার অধিকাংশ আলেম ওলামা ও হেফাজতের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। সংগঠনটির দুই গ্রুপই চাইছে তাদের শীর্ষ নেতারাই হেফাজতের নেতৃত্বে আসুক। তবে, নিয়ম অনুযায়ী হেফাজতের এক নম্বর সহ-সভাপতি ভারপ্রাপ্ত আমির হওয়ার কথা। তবে সহ-সভাপতিদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত্ আমির নির্বাচনে মতানৈক্য দেখা গেলে জরুরি ভিত্তিতে হেফাজতের কাউন্সিল ডাকা হতে পারে। কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন আমির নির্বাচন করা হতে পারে।

নতুন আমির নির্বাচন প্রসঙ্গে এক দিন আগে হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী সাংবাদিকদের জানান, আল্লামা শফীর মৃত্যুতে হেফাজতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।

অন্যদিকে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে কওমি ঘরানার বৃহত্তম অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম গড়ে তোলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী। কওমি ঘরানার সব রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দলকে এক ব্যানারে নিয়ে আসতে সক্ষম হন তিনি।

১৩ দফা দাবি দিয়ে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ ও রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে আলোচনায় আসেন আল্লামা শফী। এর পর থেকেই তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলে খবরের শিরোনাম হন। পরবর্তী সময়ে সরকারের কাছ থেকে কওমি সনদের স্বীকৃতি আদায় করেন তিনি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগঠনটির আমির হিসেবে ছিলেন আহমদ শফী। তার মৃত্যুর কারণে এই সংগঠনটির প্রধান হিসেবে কেউ এখনো চূড়ান্ত না হলেও অনেকের নাম আলোচনায় আছে।

ঢাকার খ্যাতনামা একটি মাদ্রাসার শিক্ষক জানান, হেফাজতে ইসলাম নিয়ে ঢাকার আলেমদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। যেহেতু সাংগঠনিকভাবে এর প্রভাব-প্রতিপত্তি এখন প্রায় নেই, সে ক্ষেত্রে সংগঠনটির প্রধান নিয়ে ঢাকার আলেমদের মধ্যে আগ্রহ কম। তবে আমির হিসেবে জুনায়েদ বাবুনগরীকে দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে জানান এই তরুণ নেতা।

এর আগে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে অনেকটাই অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন আহমদ শফী। দফায়-দফায় তাকে চট্টগ্রামে ও ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। সর্বশেষ গত জুনে হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় সহকারী পরিচালকের পদ থেকে হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে দেয়ার পর থেকে আহমদ শফীকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। এরই মধ্যে জুলাইয়ে আহমদ শফী ও বাবুনগরী একসঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কথা জানান। এরপরও গত এক মাসে আবার পরিস্থিতি অবনতির দিকে যেতে থাকে। সর্বশেষ গত বুধবার হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় বিক্ষোভ করার পরিপ্রেক্ষিতে আনাস মাদানীকে মাদ্রাসা থেকে অপসারণ করা হয়। মহাপরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান আল্লামা আহমদ শফী।



poisha bazar

ads
ads