আ.লীগে ফের শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন: মানবকণ্ঠের সঙ্গে শেখ শহীদুল ইসলাম

মানবকণ্ঠ
শেখ শহীদুল ইসলাম - ফাইল ছবি

  • সাইফুল ইসলাম
  • ২৩ জুন ২০২০, ১০:২০

বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করতে বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক করণীয় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ও জাতীয় পার্টির (জেপির) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২৩ জুন বা করোনার পর আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের মতো ত্যাগ এবং পরীক্ষিত কর্মীদের দলে মূল্যায়ন করতে হবে। দলকে পেশিশক্তি ও লোভী মানুষমুক্ত করতে হবে এবং দলে যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা নাই, তাদের দল থেকে বের করে দেয়া উচিত। তখনই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে চলবে। জনগণের সম্পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে।

গতকাল মানবকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে শেখ শহীদুল ইসলাম এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ক্যাসিনো ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছেন। তার মানে তিনি একটি শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এ অভিযান যখন চলছিল তখনই করোনা সংকট সৃষ্টি হয়। আমার মনে হয়, সেখানে একটা ছেদ ফেলেছে। দেশ ও জাতি যখন এই করোনা থেকে মুক্ত হবে তখন আবারো আওয়ামী লীগের মধ্যে শেখ হাসিনা একটা শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করবেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক সেই সময়ের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছাকাছি থাকার, জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি দেখেছি এই সংগঠনটাকে বঙ্গবন্ধু কিভাবে গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে ১৯৫৭ সালে যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এসে তিনজনকে ডাকালেন, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। তখন শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হননি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বললেন, তাদের একজনকে ক্ষমতা/মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দল গোছাতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৬২ সাল থেকে আমি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে থাকি। সেই সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছিল। এরপর যখন সামরিক শাসন উঠে যায়, তখন ১৯৬৪ সালে গ্রিন রোডের আমবাগানে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক হন। ওই সময় উনি আওয়ামী লীগ সংগঠিত করেছেন। ত্যাগী. নিষ্ঠাবান, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব কর্মীদের তিনি বিভিন্ন জায়গা অবস্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানে সর্ববৃহৎ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক এই সভাপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে তিনবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা নিয়ে অন্যান্য দলের নেতাদের কাছে গিয়েছিলেন, তারা কেউ গ্রহণ করেননি। তখন তিনি সরাসরি জনগণের কাছে চলে গেলেন। ৬ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ভেতর থেকে রাষ্ট্রনায়কের পর্যায় উপনীত হন। এই ৬ দফাকে মোকাবিলা করার জন্য আইয়ূব খান হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘অস্ত্রের ভাষায় এটাকে মোকাবিলা করা হবে’। এরপর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়।

তখন আওয়ামী লীগের মুখপত্র ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। সেই ইত্তেফাককে বাজেয়াপ্ত করা হয়। সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলার ষড়যন্ত্রের মামলার আসামি করা হয়। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে মূলত বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নতুন ধাপে নিয়ে যায়। যেটা আওয়ামী লীগের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে দাঁড়ায়। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কর্মসূচিরই ৭ জুন একটা সংগ্রামী রোল ছিল। ৭ জুন ব্যাপকভাবে সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। সরকার গুলি চালায়। তারপরও ৬ দফা অব্যাহত থাকে। অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। তৎকালীন সরকার ঘোষণা দেন, ‘এই সরকার যতদিন আছে ততদিন শেখ মুজিবকে কারাগারে থাকতে হবে।’ কিন্তু ১৯৬৯ সালে ৬ দফার সমন্বয়ে বর্ধিত হয়ে ১১ দফা। সেটা ছাত্রসমাজের আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হয়। এ সময় আমাদের গ্রেফতার করা হয়। আমরা তখন ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মী। এ সময় আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও ১১ দফার দাবিতে এদেশে একটা বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। যা গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাও প্রত্যাহার করা হয়। জাতির জনক মুক্তি পান। তিনি ৬ দফার কর্মসূচি নিয়ে সামনে অগ্রসর হন। যা ১৯৭০ সালে তাকে একটি অবিস্মরণীয় বিজয় এনে দেয়। আওয়ামী লীগের পক্ষে এই বিজয়ের বিরাট একটা প্রভাব ছিল।


জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সাবেক সদস্য শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একটা চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে এসে যায়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। ’৭০ নির্বাচন তার প্রমাণ বহন করে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী ও নেতারা তাদের আসনে বসতে দেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণেই (রেসকোর্স ময়দানে) তার দলের পক্ষ থেকে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতার কথাই বলেন। জনগণের জন্য কী করণীয় তাও নির্দিষ্ট করে দেন। ১৯৭১ সালের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের আগে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু আর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাজউদ্দীন আহম্মদ শপথ গ্রহণ করেন। মুজিবনগর সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। ভারতের সহযোগিতায় আমরা ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত করি। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষের রাজনীতি করতেন। বঙ্গবন্ধু শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে ও সম্পদের সুষম বণ্টনের পক্ষে, জনগণের অধিকারের কথা বলতেন। তিনি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, আশ্রয়ের সুনিশ্চিত করার কথা বলতেন। ‘দুঃখী মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি করতেন বঙ্গবন্ধু। সেই রাজনীতিতে আমরা সংশ্লিষ্ট ছিলাম। ১৯৭৪ সালের আওয়ামী লীগের যে কাউন্সিল অধিবেশন হয়, সেখানে আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হই। ওই সময় আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু যে রাজনীতি করতেন, সেই রাজনীতি হলো, ‘মানুষের কল্যাণের রাজনীতি। জাতি উন্নয়নের রাজনীতি’। বঙ্গবন্ধুর কাছে সবচেয়ে মর্যাদার ব্যক্তি হচ্ছেন তিনি, ‘যার ত্যাগ সবচাইতে বেশি। যিনি দেশ ও দলকে ভালোবাসেন।’ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষের আস্থা ছিল। তিনি জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছিলন।

সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারকে হত্যার মধ্যদিয়ে একটি পরিবারকে হত্যা করা হয়নি, আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ সেটাকে হত্যা করা হয়েছে। সেটাকে বিপরীতমুখী করে ফেলা হয়েছে। সুদীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। আমরা তখন জাতীয় পার্টির আওয়ামী লীগকে সমর্থন দান করি এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হয়। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, সামরিক শাসনের আমলে রাজনীতিতে কতগুলো দিক পরিবর্তন। সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে অনেক পরিবর্তন হয়। যারা রাজনৈতিক যোগ্য নন, তাদের রাজনীতির ভিতরে ঢোকানো হয়। ব্যবসায়ী, সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং কিছুসংখ্যক (যারা সমাজে পরিচিত টাউট, বাটপাড়, ধনী ব্যক্তি, পেশিশক্তি) ব্যক্তিরা রাজনীতিতে আসন গড়ে বসে। সেই রাজনীতির ধারা থেকে স্বাভাবিকভাবে আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগও নিজেকে সেভাবে মুক্ত করতে পারেনি।

বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে যে জাতীয় সংসদ বঙ্গবন্ধু করেছিল বা ১৯৭০ সালে যেখানে শতকরা আশিভাগ ছিল রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এখন দেখা যায়, শতকরা সত্তর ভাগের মতো ব্যবসায়ীরা সংসদ সদস্য হয়েছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো আমাদের অর্থনীতি কিছুটা লুটপাটের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। আমাদের এখানে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কেলেঙ্কারি সংগঠিত হয়েছে। যা বঙ্গবন্ধুর আমলে চিন্তাও করা যায়নি। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে পেশিশক্তি ও অর্থবানরা কোনো না কোনোভাবে একটা স্থান করে নেয়ার চেষ্টা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সফলকামও হন।

মানবকণ্ঠ/এইচকে



poisha bazar

ads
ads