খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে ‘ফিরোজায়’

খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে ‘ফিরোজায়’ - প্রতিনিধি

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৫ মার্চ ২০২০, ২৩:৪৪,  আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০, ০৯:১১

দুই বছর এক মাস ১৬ দিন পর কারাগার থেকে বিএনপি চেয়ারপার্সন  খালেদা জিয়া গতকাল বুধবার মুক্তি পেয়েছেন। ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের জিম্মায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাকে। ছোট ভাইয়ের একটি প্রাইভেট কারে করে রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাসভবন ‘ফিরোজা’র বাসায় রয়েছেন তিনি।

গত মঙ্গলবার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে দুই শর্তে খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। বাকি প্রক্রিয়া শেষ করে গতকাল বিকেল সোয়া ৪টায় বিএসএমএমইউ হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। গত বছরের এপ্রিল থেকে কারাবন্দি খালেদা জিয়া এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এদিকে মুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন। এ সময় তার ব্যবহৃত জিনিসপত্রও গাড়িতে তোলা হয়। সোয়া ৪টার সময় হুইল চেয়ারে করে বেরিয়ে আসেন খলেদা জিয়া। ভাইয়ের গাড়িতে চড়েন তিনি। শামীম ইস্কান্দার ছাড়াও খালেদা জিয়ার মুক্তির সময় বিএসএমএমইউ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এছাড়া ডা. হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত মেডিকেল টিমের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। আর চেয়ারপার্সনের মুক্তির খবরে দুপুরের আগ থেকেই হাসপাতালের সামনে ভিড় জমিয়েছিলেন নেতাকর্মীরা। খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসতেই স্লোগান দিতে থাকেন তারা।

অপরদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির খবরে মঙ্গলবার বিকেল থেকেই খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় প্রাণচা ল্য ফিরে আসে। খালেদা জিয়ার বসবাসের জন্য নতুন করে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তোলা হয় ভবনটি। সেখানে কর্তব্যরতরা জানিয়েছেন, এমনিতেই ভবনটি নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা হলেও এখন সেটি খালেদা জিয়ার বসবাসের জন্য একদম পরিপাটি করে রাখা হয়েছে।

এর আগে, মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক তার নিজ বাসভবনে এক ব্রিফিংয়ে জানান, সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত রেখে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য তাকে দুই শর্ত মেনে চলতে হবে থাকতে হবে নিজ বাসভবনে, দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এরপর আইন মন্ত্রণালয় থেকে সে বিষয়ক চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে বুধবার খালেদা জিয়ার কারামুক্তির নির্বাহী আদেশ পৌঁছে দেয়া হয় কারা মহাপরিদর্শকের কাছে।

 সেখান থেকে জেল সুপার হয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আদেশটি পেলে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সেদিনই তাকে কারাগারে নেয়া হয়। সেই থেকে তিনি কারাবন্দি। এ মামলায় হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর এক রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেছেন। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এ ছাড়া জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে ৭ বছর কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। এরপর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়া। এই আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন।

অন্যদিকে সাড়ে ২৫ মাস আগে রাজধানীর গুলশানের বাসভবন ফিরোজা’ থেকে সর্বশেষ বেরিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ড পাওয়ায় আর সেই বাসায় ফেরা হয়নি। তারপর থেকে ছিলেন পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার এবং সর্বশেষ কারান্তরীণ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)। বিশেষ বিবেচনায় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ায় সাড়ে ২৫ মাস পর সেই ‘ফিরোজায়’ ফিরেছেন খালেদা জিয়া।

এ সময় খালেদার বাসভবনের সামনে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন। এর আগে বিকেল ৪টার পর কারান্তরীণ খালেদাকে মুক্তি দেয়া হলে তিনি বিএসএমএইউ প্রাঙ্গণে রাখা গাড়িতে ওঠেন। এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বিএনপি নেতারা খালেদার মুক্তির জোর দাবি তোলেন। বিশ্বজুড়ে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে করোনা ভাইরাসে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সেজন্য ৭৫ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে দ্রæতই মুক্তি দেয়া প্রয়োজন বলে মতামত দেন তারা।

মাস্ক-চশমা পরেই বের হলেন খালেদা জিয়া: হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরা খালেদা জিয়াকে দেখা গেছে পুরনো সেই চশমায়। করোনা থেকে বাঁচতে মুখে ছিল মাস্কও। এ দিকে দীর্ঘদিন পর নেত্রীর মুক্তির খবরে হাসপাতালে ভিড় জমান দলের হাজারও নেতাকর্মী। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকে অপেক্ষা করেন খালেদা জিয়াকে একনজর দেখতে। করোনা ভাইরাস বিষয়ে সচেতনতার কথা বলে পুলিশ সদস্যরা বারবার সতর্ক করলেও কোনোভাবেই নেতাকর্মীদের সেই ভিড় কমানো যায়নি।

অবশেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাইক হাতে নেতাকর্মীদের ভিড় কমানোর ঘোষণা দিলে এতেও কোনো কাজ হয়নি। খালেদা জিয়া গাড়িতে ওঠার সময় গাড়ির চারপাশ ঘিরে নেতাকর্মীরা ‘খালেদা, খালেদা, জিয়া, জিয়া, আমার মা, আমার মা’ সেøাগান দিতে থাকেন। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘২ বছর পর নেত্রীর মুক্তি আমাদের জন্য খুব আবেগের। আমরা একনজর ওনাকে দেখতে এসেছি। বাসায় ফেরার পর আত্মীয়-স্বজনরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তার মতামত জানবেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই চ‚ড়ান্ত হবে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। তাদের সিদ্ধান্ত  চিকিৎসকের পরামর্শে খালেদা জিয়া এখন হোমকোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।

গতকাল এক বৈঠকে পরিবারের সদস্যদের অনেকে তাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা করার পক্ষে মত দেন। আবার অনেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে সরাসরি হাসপাতালে নেয়ার পক্ষে মত দেন। এক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ইউনাইডেটে ভর্তির কথা বলেন তারা। তবে এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার মতামতকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে লন্ডন থেকে স্কাইপে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন, তারেক রহমান।

খোশ মেজাজে আছেন খালেদা জিয়া: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবিন ব্লকে চিকিৎসাধীন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া খোশ মেজাজে ছিলেন।

বিএসএমএমইউতে প্রিজন সেলের একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কেবিন ব্লকের একটি কক্ষে একজন গৃহপরিচারিকাসহ দীর্ঘদিন বন্দিজীবন এবং বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তার মেজাজ সব সময় চড়া থাকে। মুখে সরাসরি কিছু না বললেও তিনি আচার-আচরণে তা সব সময় বুঝিয়ে থাকেন।

কিন্তু বন্দিদশা থেকে মুক্তির খবরে আজ তার মেজাজ একেবারেই চড়া নেই। তিনি খুব প্রশান্তিতে ছিলেন বলে মনে হলো। মুক্তি পাওয়ার খবরটি তিনি আগে থেকেই জেনেছেন ভাবভঙ্গিতে মনে হলো। অন্যদিকে দলটির একজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন আগামী ২০ দিন দলের কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে তিনি কথা বলবেন না।

 

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...