মুক্তি পাচ্ছেন খালেদা জিয়া: ৬ মাসের জন্য দণ্ড স্থগিত

মুক্তি পাচ্ছেন খালেদা জিয়া: ৬ মাসের জন্য দণ্ড স্থগিত
খালেদা জিয়া - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৫ মার্চ ২০২০, ০০:২২

দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দণ্ড স্থগিত করে তাকে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার সদয় হয়ে দণ্ডাদেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শর্ত হলো- এই সময়ে খালেদা জিয়াকে ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না।

এদিকে ২৫ মাস সাজা ভোগের পর এমন এক সময়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত হলো, যখন নভেল করোনা ভাইরাসের মহামারীতে পুরো বিশ্বজুড়ে চলেছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, নানা বিধিনিষেধে বাংলাদেশও রয়েছে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায়। কারা তত্তাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া ‘করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করে আগের দিনও তার মুক্তির দাবি জানিয়েছিলেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি আছেন খালেদা জিয়া। প্রথমে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও গত বছর ১ এপ্রিল থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বছরখানেক ধরে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছেন।

দেশের সর্বোচ্চ এই চিকিৎসাকেন্দ্রেও বিএনপি নেত্রীর সুচিকিৎসা হচ্ছে না দাবি করে গত দুই বছরে বহুবার আদালতে গেছেন তার আইনজীবীরা। কিন্তু সেসব আবেদন কখনোই আদালতের সায় পায়নি। সে কারণে বিএনপি নেতারা বলে আসছিলেন, কেবল সরকার চাইলেই এখন খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা বলছিলেন, জামিনের এখতিয়ার আদালতের হাতে, এক্ষেত্রে সরকারের করার কিছু নেই। তবে পরিবার প্যারোলে মুক্তি চাইলে সেটা সরকার বিবেচনা করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে মার্চের শুরুতে খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তি চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার খবর আসে।

যদিও বিএনপি নেতারা বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাইছিলেন না। এদিকে তার তিন সপ্তাহ পর গতকাল মঙ্গলবার সরকারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১-এর উপধারা ১ ধারা অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার সাজার কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছে। তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সুপারিশ পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন তাকে মুক্তি দেবে, তখন থেকেই তা কার্যকর হবে।

আজ মুক্তি পেতে পারেন খালেদা জিয়া- স্বরাষ্ট্র সচিব: আইনি প্রক্রিয়াগুলো হলেও আজ বুধবারে দুপুরের মধ্যে তা শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, আশা করি দুপুরের মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে। খালেদা জিয়া কখন মুক্তি পাচ্ছেন জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু সাংবাদিকদের আইন মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তি সংক্রান্ত নির্দেশনা তারা পেয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন আইন দেখে একটি সামারি তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন হয়ে আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফিরে আসবে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারাগারে কাগজপত্র পাঠালে কারা কর্তৃপক্ষ মুক্তির ব্যবস্থা নেবে বলে জানান।

অপরদিকে বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তিতে খুশি দলটির শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করছেন, এটা পুরো জাতির জন্য একটি স্বস্তির সংবাদ। তবে এ মুক্তি অনেক দেরিতে হলো। আর ছয় মাস বাড়িতে থাকা ও বিদেশ যেতে না পারার যে শর্তারোপ করা হয়েছে, তাতে আপত্তি নেতাদের। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, যদি প্রয়োজন হয়, তবে খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে দেয়া উচিত। এটা তার অধিকার। কোনো নেতা বলেছেন, বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রিত না হলে তার আরো আগেই মুক্তি পেতেন খালেদা জিয়া। সরকারের সব কাজে ঢিলেমির অভিযোগও করেছেন কোনো কোনো নেতা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, সম্প্রতি মুক্তির জন্য নতুন করে কোনো আবেদন করা হয়নি। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। খন্দকার মোশাররফ আরো জানান, ‘আমরা সব সময়ই আশাবাদী ছিলাম। আগে আইনের মাধ্যমে হয়নি, পরিবার আবেদন করেছিল। এতদিন পরে সরকারের বোধোদয় হয়েছে। এটা আশ্চর্যের কিছু না, বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রিত না হলে আরো আগেই হতো।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে একটা স্বস্তির বিষয়। তিনি বলেন, ওনার শরীর ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরো জাতির মধ্যে একটা শঙ্কা কাজ করছিল। তার ওপরে এখন করোনার ভীতি তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার ঝুঁকি এবং জাতি যে ঝুঁকিতে পড়েছে, তা থেকে একটা স্বস্তি মিলবে। ওনার সুস্থ হয়ে ওঠাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমীর খসরু বলেন, ওনার স্বাস্থ্যের জন্য যদি দরকার হয়, তবে তাকে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ দিতেই হবে। সবাই তো বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করছে। তার জন্য আইন ভিন্ন হবে কেন? বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা সবাই এ সুযোগ নিয়েছেন। প্রতিনিয়ত গেছেন। এটা সাংবিধানিক অধিকার। শুধু তার না, সকলেরই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান খালেদা জিয়ার মুক্তিতে খুশি। তিনি বলেন, ‘ইটস ওকে’। আমরা তো মুক্তি চাচ্ছিলাম। এটা ভালো সিদ্ধান্ত, আমি খুশি। বিষয় হলো, বাসায় থাকতে হবে। বাইরে যেতে পারবেন না। এটা কেন করল, এটা বুঝতে পারছি না। খালেদা জিয়া এমনিতেই মুক্তি পেতেন বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, উনি মুক্তি পেতেনই। এটা প্রমাণ হলো যে সরকারই আটকে রেখেছিল। তারাই মুক্তি দিল, যা হয়ত আদালতেই হতো। বিএনপি এক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে গতকাল সোমবার থেকে গুঞ্জন শুনতে পান অনেকেই। কিন্তু মুক্তির বিষয়টি কেউ আগে আঁচ করতে পারেননি। তবে নেতাকর্মীরা খুশি হয়েছেন।

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম সরকার চাইলে খালেদা জিয়াকে ফৌজদারি আইন অনুসারে মুক্তি দিতে পারে। বহুদিন পরে হলেও সরকার সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে মুক্তি দিচ্ছে। সাজা স্থগিত থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া পূর্ণ পুলিশি নিরাপত্তায় থাকবেন কিনা জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের এ সিনিয়র আইনজীবী জানান, সাজা স্থগিত থাকা অবস্থায় পুলিশি নিরাপত্তার কোনো বিধান আইনে নেই। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তার (খালেদা জিয়া) জন্য পুলিশি নিরাপত্তা রাখা হবে।

নিজের জীবন বাঁচান, ভিড় জমাবেন না -রিজভী: খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তের খবর পেয়ে বিএসএমএমইউতে বিএনপি নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়ায় নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে আকস্মিকভাবেই মঙ্গলবার মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।

এই খবর শুনে রিজভীসহ প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী জড়ো হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে। অর্ধ শতাধিক সাংবাদিকও উপস্থিত হন সেখানে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রিজভীও নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিন। নিজের জীবন বাঁচানোর দিক দেখতে হবে। এখানে অহেতুক ভিড় করবেন না।

সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার বোন: বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বোন সেলিমা ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। আর কারাগার থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ফিরোজায় ধোয়ামোছা শেষ, খালেদা জিয়াকে বরণের প্রস্তুতি: টানা ২ বছর ১ মাস ১৫ দিন পর আড়মোড়া ভাঙছে গুলশান ২-এর ৭৯ নম্বর রোডের ১ নম্বর বাড়িটির। আজ বা কালকের মধ্যে মুক্তি পেয়ে এই বাড়িতেই ফিরবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। দুই বছর পর খালেদা জিয়ার আগমনের আগাম খবরে শুরু হয়েছে ধোয়ামোছার কাজ। গৃহপরিচারিকার কাজে যুক্ত পাঁচজন আর নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ১৬ জনের ব্যস্ততা ফিরেছে ফিরোজায়। গতকাল শেষবেলায় সরেজমিন বাড়িটি ঘুরে দেখা যায়, আশপাশে স্বল্পসংখ্যক মানুষ ভিড় করছেন। প্রিয় নেত্রীর মুক্তির খবরে ভিড় জমাতে চাইলেও নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন করোনা ভাইরাসের বিশেষ পরিস্থিতির কথা ভেবে।

মানবকণ্ঠ/এআইএস

 




Loading...
ads






Loading...