নির্বাচনী উত্তাপে সরগরম ঢাকা

মানবকণ্ঠ
ছবি - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১০:০৯

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রতীক নিয়ে প্রচারের তৃতীয় দিনেই ছড়াতে শুরু করেছে উত্তাপ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মাঠের অন্যতম বড় দল বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা এরইমধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ফলে শৈত্যপ্রবাহে হিমশীতল হয়ে যাওয়া ঢাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনী উত্তাপে। এদিকে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ পরিবর্তন নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ৩০ জানুয়ারিই দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল রোববার বিকেলে কমিশন বৈঠক শেষে এ তথ্য জানিয়েছে ইসি।

সরগরম ঢাকার মাঠ: চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা ও নির্বাচনী প্রচারণায় বাঁধা দেয়ার অভিযোগ তুলেছে দুই সিটিতেই। ঢাকা উত্তরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলছেন, রোববার দুপুরে মিরপুর-১ নম্বরের উত্তর বিশিলে শাহ আলী মাজারের সামনে পুলিশের সামনেই তার প্রচার মিছিলে হামলা করেছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। অন্যদিকে দক্ষিণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস অভিযোগ করেছেন, আগের দিন সন্ধ্যায় রামকৃষ্ণ মিশন রোডে তার গণসংযোগে হামলা করেছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। বিএনপি মনোনীত দক্ষিণের প্রার্থী ইশরাক হোসেনও অভিযোগ করেছেন তার নেতাকর্মীদের ওপর হামলার। তার বাসার সামনে থাকা কয়েকটি গাড়ির কাচ ভাঙচুর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগ থেকে জানা গেছে, তাবিথ আউয়াল গতকাল সকালে মিরপুরে শাহ আলীর মাজার জিয়ারতের পর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গণসংযোগ শুরু করেন। তখন মাজারের সামনেই দুটি পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই হামলার জন্য আওয়ামী লীগ কর্মীদের দায়ী করে তাবিথ বলেন, শাহ আলী মাজারের সামনে প্রচারের সময় জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়। পুলিশের সামনেই আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।

তাবিথ বলেন, ২০১৫ সালে হামলার আশঙ্কায় আমি নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছিলাম। তখন আমাকে পুলিশ প্রটেকশন দিয়েছিল। কিন্তু এবার পুলিশের সামনেই হামলার শিকার হলাম। তবে নিজে আক্রান্ত হলেও শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালিয়ে যাবেন বলে জানান তাবিথ আউয়াল। এদিকে দক্ষিণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফজলে নূর তাপস শান্তিনগর কাঁচাবাজার থেকে তৃতীয় দিনের নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরুর আগে সাংবাদিকদের সামনে হামলার অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আরকে মিশন রোডে নির্বাচনী প্রচারের একপর্যায়ে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইশরাক হোসেনের বাসাতেও আমি গিয়েছি। সেখানে সকলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, ভোট প্রার্থনা করেছি। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমরা সেখান থেকে চলে আসার পর সন্ধ্যার দিকে তারা অতর্কিত আমাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীসহ গণসংযোগে যারা ছিল তাদের ওপর আক্রমণ করেছে। এটা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।

তাপস বলেন, আমরা চাই সম্প্র্রীতির রাজনীতি, পরিবর্তনের রাজনীতি। আমরা এই রাজনীতির সূচনা করতে চাই। আমরা আশা করব সকলে আমার সাথে সেই সূচনায় অংশগ্রহণ করবে। আমরা একটা সুন্দর, সম্প্র্রীতির রাজনীতি ঢাকাবাসীকে উপহার দেব।

আর এ বিষয়ে জনগণের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাচ্ছেন দাবি করে তিনি বলেন, যে পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি, আমাদের প্রাণের ঢাকা, ভালোবাসার ঢাকাকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা এবং সর্বোপরি উন্নত ঢাকা গড়ে তোলার জন্য, ঢাকাবাসী সেটা সাদরে গ্রহণ করেছে। এজন্য স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাচ্ছি। আমরা খুবই আশাবাদী যে ঢাকাবাসী আমাদের পক্ষে রায় দেবে।

ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি জানিয়ে দক্ষিণ সিটির বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন অভিযোগ করেছেন, তার কর্মী সমর্থকদের ওপর হামলা করেছে সরকার দলীয়রা। নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।

গতকাল রোববার পুরনো ঢাকার দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগে এসব কথা বলেন ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল (শনিবার) সন্ধ্যায় আমার গোপীবাগের বাসার সামনে সরকার দলীয় লোকজন গিয়ে আমার কর্মী-সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়েছে, হামলা করেছে। এটা কী সুষ্ঠু নির্বাচনের আচরণ? ’

তার বাসার সামনে থাকা কয়েকটি গাড়ির কাচ ভাঙচুর করা হয়েছে বলে দাবি করেন।

ইশরাকের নিজের প্রচারণায় এখনো কোনো বাঁধা দেয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদিও আমাকে এখনো প্রচারণায় বাঁধা দেওয়া হয়নি। তবে আমার দলের কাউন্সিলর ও সমর্থকদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রচারণায় ওরা বাঁধা দিচ্ছে, প্রচারণা চালাতে দিচ্ছে না। এটা থেকে প্রমাণ হয় যে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। নির্বাচনে অবশ্যই সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’

পেছাচ্ছে না ভোট: সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ পরিবর্তন নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম জানিয়েছেন, আগামী ৩০ জানুয়ারিই এই দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল রোববার কমিশন বৈঠক শেষে তিনি এই তথ্য জানান। কবিতা খানম বলেন, ৩০ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের বিষয়টি আদালতেও গিয়েছে। কিন্তু আদালত নির্বাচন পেছানোর কথা বলেননি। আমরাও আমাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছি না। নির্বাচন ৩০ জানুয়ারিই থাকছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাসেমও জানিয়েছেন, ৩০ জানুয়ারিই তার অঞ্চলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, ৩০ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এরই মধ্যে কমিশনও আমাকে জানিয়েছে, ৩০ তারিখেই (৩০ জানুয়ারি) নির্বাচন হবে। সেভাবেই সব কাজ চলছে।

এর আগে, আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাসহ চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব মো. আলমগীরের উপস্থিতিতে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইসি সূত্রে জানা যায়, পূজা সামনে রেখে ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণের তারিখ পরিবর্তন হবে কি না, সেটিই ছিল অনির্ধারিত এই বৈঠকের আলোচ্যসূচি।

বৈঠকের আগে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তাবনা কমিশনে উত্থাপন করা হয়নি। ফলে নির্বাচন পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। রফিকুল ইসলাম আরো বলেছিলেন, এরই মধ্যে উচ্চ আদালতে বিষয়টি নিয়ে রিট হয়েছে। আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আর আদালতের কোনো নির্দেশনা না এলে নির্বাচন পেছানোর সুযোগ নেই।

এর পরপরই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তার কক্ষে অনির্ধারিত বৈঠকে বসেন চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব। নির্বাচনের তারিখ না পেছানোয় বৈঠক শেষে ইসি’র পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্রিফিং হয়নি। তবে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম ও ইসি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, সিটি নির্বাচন পেছাচ্ছে না।

ইসি সূত্রে জানা যায়, সরস্বতী পূজার সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসি) নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ মিলে যাওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিয়ে ভোটগ্রহণের তারিখ পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। সর্বশেষ ডিএসসি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেনও পূজা উপলক্ষে ভোট পেছানোর সুপারিশ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন ইসিতে।

ইসির অতিরিক্ত সচিব মুখলেছুর রহমান বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন সরস্বতী পূজা উপলক্ষে ভোট পেছানোর সুপারিশ করে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠির বিষয়টি আমরা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি। তবে কমিশন ভোট পেছানোর কোনো চিন্তা করছে না। তাছাড়া সরকারি ক্যালেন্ডারে ২৯ জানুয়ারি সরস্বতী পূজার তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। সে অনুযায়ীই সবকিছু হওয়ার কথা।

এর আগে, গত ৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা এক চিঠিতে পূজার জন্য ভোট পেছাতে ডিএসসিসি’র রিটার্নিং কর্মকর্তাকে চিঠি দেন। তার চিঠি বিবেচনায় নিয়েই রিটার্নিং কর্মকর্তা ১০ জানুয়ারি চিঠি দেন ইসিতে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু ওই দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ওই পূজা লগ্ন বা তিথির মধ্যে সম্পন্ন করতে হয় বলে এর তারিখ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

ডিএসসিসি এলাকায় বিপুলসংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী বাস করেন। এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় পূজা মণ্ডপ রামকৃষ্ণ মিশনে অবস্থিত। ঢাবি জগন্নাথ হলও একই এলাকায় অবস্থিত। এই দুই মণ্ডপ ঘিরে সরস্বতী পূজায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। এছাড়া ডিএসসিসি নির্বাচনের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানকে ভোটকেন্দ্র ঘোষণা করা হয়েছে, তার অনেকগুলোতেই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পুরনো ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরস্বতী পূজা উদযাপন অনেকাংশেই সম্ভব হবে না। এসব বিবেচনায় নিয়েই রিটার্নিং কর্মকর্তা ডিএসসিসি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ পেছানোর আবেদন জানান ইসিকে। এছাড়া, দুই সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন সিটি নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়ে চিঠি দেয় ইসিকে।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads






Loading...